Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০২:৫১ অপরাহ্ণ

সাধারণ শিক্ষার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষ, ঝুঁকছে মাদ্রাসা শিক্ষায়

সাধারণ শিক্ষার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষ, ঝুঁকছে মাদ্রাসা শিক্ষায়

ভূমিকা

শিক্ষা হলো সমাজের আত্মা, জাতির চরিত্র ও সভ্যতার মেরুদণ্ড। এক সময় সাধারণ শিক্ষা ছিল সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও মানসিক বিকাশের প্রধান পথ। কিন্তু আজ বাস্তবতা অন্যরকম। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে—প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার প্রতি জনগণের আস্থা কমছে, আর মাদ্রাসা শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে। এই পরিবর্তন কেবল শিক্ষার ধারা নয়, বরং সমাজের নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন।

সাধারণ শিক্ষার বর্তমান সংকট

বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার পরিসর গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের গ্রস ভর্তি হার ১১১.৬ % এবং মাধ্যমিক স্তরে ৭১.৪৯ % (CEIC Data, 2023; TheGlobalEconomy, 2023)। কিন্তু এই পরিসংখ্যান পরিমাণে বৃদ্ধি দেখালেও মানে অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বর্তমান সাধারণ শিক্ষা অনেকাংশে পরীক্ষানির্ভর ও মুখস্থভিত্তিক। পাঠ্যক্রমে জ্ঞানের গভীরতা, সৃজনশীলতা ও মূল্যবোধ অনুপস্থিত। শিক্ষকরা প্রশাসনিক ও আর্থিক সংকটে জর্জরিত; অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান এখন কেবল রুটিনগত কার্যক্রমে সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনে বেশি মনোযোগী হচ্ছে।

অন্যদিকে, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পরও অনেকে কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। ফলে সাধারণ শিক্ষা জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এই বাস্তবতায় জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে—“এই শিক্ষা দিয়ে জীবন গঠন সম্ভব কি?”

নৈতিক অবক্ষয় ও সমাজের আস্থা সঙ্কট

আজকের সাধারণ শিক্ষায় নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের শিক্ষা প্রায় অনুপস্থিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনীতি, বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রতিযোগিতার প্রবণতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে বিকৃত করেছে। অভিভাবকেরা সন্তানের নৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শৃঙ্খলা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি দৃশ্যমান।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ব্যুরো (BANBEIS)-এর ২০২৩ সালের জরিপে দেখা যায়, সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৯ সালের ৯.২৩ মিলিয়ন থেকে কমে ৮.১৬ মিলিয়নে নেমেছে। বিপরীতে একই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২.৪ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২.৭৫ মিলিয়নে (Religion Unplugged, 2024)। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে—জনগণের একটি অংশ সাধারণ শিক্ষার প্রতি আস্থা হারিয়ে বিকল্প ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি মানুষের ঝোঁকের কারণ

১. নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তি

সন্তানকে নৈতিক, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা প্রত্যেক অভিভাবকের। মাদ্রাসা শিক্ষা সেই আশ্বাস দেয়। কোরআন শিক্ষা, নামাজ, সততা, পরোপকারিতা—এসব মাদ্রাসা পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। অনেক অভিভাবক মনে করেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সমাজে “খারাপ পথে” যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

২. সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক শিক্ষা ব্যবস্থা

সাধারণ বিদ্যালয়ের তুলনায় মাদ্রাসায় পড়াশোনার খরচ অনেক কম। অনেক মাদ্রাসা আবাসিক—সেখানে বিনামূল্যে খাদ্য ও থাকার ব্যবস্থা থাকে। দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের জন্য এটি বড় স্বস্তি। ফলে নিম্নবিত্ত শ্রেণি ক্রমে মাদ্রাসার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

৩. সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় সম্মান

সমাজে আলেম বা হাফেজদের প্রতি এক বিশেষ সম্মান রয়েছে। ধর্মীয়ভাবে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি সামাজিক নেতৃত্বে মূল্যবান। এই সম্মান ও নিরাপত্তার অনুভূতি অনেক অভিভাবককে মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে টেনে আনছে।

৪. সাধারণ শিক্ষার ফলাফলহীনতা

সাধারণ শিক্ষার ফল বাস্তব জীবনে কম কাজে লাগছে—এই ধারণাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের দৃষ্টান্ত দেখে অনেক পরিবার ধর্মীয় শিক্ষাকে “নিরাপদ বিনিয়োগ” হিসেবে বিবেচনা করছে।

মাদ্রাসা শিক্ষার পরিসংখ্যান ও প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি প্রধান ধারা রয়েছে—আলিয়া মাদ্রাসা (সরকার স্বীকৃত) ও কওমি মাদ্রাসা (স্বাধীন ধারা)।

২০২৩ সালে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আলিয়া মাদ্রাসায় প্রায় ২.৭ মিলিয়ন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যাদের মধ্যে ৫৪ % নারী (Prothom Alo English, 2024)।

২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ১৩,৯০২টি কওমি মাদ্রাসা ও প্রায় ১.৩৯ মিলিয়ন শিক্ষার্থী ছিল (Bonik Barta, 2015)।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ১৯ % শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত (World Bank Report, 2010)।

এই প্রবণতা প্রমাণ করে—মাদ্রাসা আর কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তা এখন জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

আধুনিকায়িত মাদ্রাসা শিক্ষা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বর্তমান সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষায় নতুন ধারা যুক্ত হচ্ছে। আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি কিছু কওমি মাদ্রাসাও আধুনিক বিষয় সংযোজন শুরু করেছে। সরকার কওমি সনদকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ধর্মীয় শিক্ষাকে সমাজে মর্যাদা দিয়েছে।

তবে চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে (2010) বলা হয়েছে—মাদ্রাসাগুলো মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকটে ভুগছে। অনেক মাদ্রাসায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা অনুপস্থিত। তাছাড়া আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে হলে তাদের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান, আইসিটি ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে।

সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজন

শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পেশা নয়; এটি মানুষ গঠন, নৈতিক উন্নয়ন ও নাগরিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। তাই সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষাকে বিরোধী না ভেবে পরিপূরক ধারা হিসেবে দেখা জরুরি।

একদিকে সাধারণ শিক্ষায় যুক্ত করতে হবে ধর্মীয় ও নৈতিক পাঠ, যাতে শিক্ষার্থীরা নৈতিকভাবে দৃঢ় হয়; অন্যদিকে মাদ্রাসায় সংযোজন করতে হবে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাভিত্তিক বিষয়। এতে গড়ে উঠবে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যা ধর্মনিষ্ঠ, মানবিক ও কর্মমুখী।

রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব—দুই ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করা, শিক্ষকদের মর্যাদা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা, এবং শিক্ষার লক্ষ্যকে কেবল চাকরিমুখী না রেখে মানবিক বিকাশমুখী করা।

উপসংহার

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাচিত্র এক গভীর চিন্তার বিষয়। সাধারণ শিক্ষা মান, মূল্যবোধ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মানুষ মাদ্রাসার দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তনকে নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়; বরং এটিকে একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যদি রাষ্ট্র আধুনিক বিজ্ঞান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী, মানবিক ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তবে সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা উভয়ই হবে জাতির সমৃদ্ধির দুটি ডানা।
-মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়
রামু,কক্সবাজার।

তথ্যসূত্র (References):

1. CEIC Data (2023). Bangladesh: School Enrollment, Primary (Gross %).
https://www.ceicdata.com/en/bangladesh/social-education-statistics


2. The Global Economy (2023). Secondary School Enrollment – Bangladesh.
https://www.theglobaleconomy.com/Bangladesh/Secondary_school_enrollment/


3. Religion Unplugged (2024, Dec 2). Why Are Bangladeshi Children Joining Madrasas In Large Numbers?
https://religionunplugged.com/news/2024/12/2/why-are-bangladeshi-children-joining-madrasas-in-large-numbers


4. Prothom Alo English (2024). Aaliya Madrasas: The Role of Girls in Religious Education.
https://en.prothomalo.com/youth/education


5. Bonik Barta (2015). Qawmi Madrasas in Bangladesh.
https://en.bonikbarta.com/bangladesh


6. World Bank (2010). Madrasas in Bangladesh: Education Quality Challenges.
https://www.worldbank.org/en/news/press-release/2010/08/10/madrasas-increase-school-enrollment-but-face-quality-challenges


7. Brookings Institution (2022). Improving the Quality of Girls’ Education in Madrasas in Bangladesh.
https://www.brookings.edu/articles/improving-the-quality-of-girls-education-in-madrasas-in-bangladesh


8. IJO-BS (2021). A Comparative Study Between Schools and Madrasahs in Bangladesh.
https://ijo-bs.com/quality-of-secondary-education-a-comparative-study-between-schools-and-madrasahs-in-bangladesh

মন্তব্য করুন

ব্লগ