Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ অক্টোবর, ২০২৫ ১২:৫২ অপরাহ্ণ

আমরা জানলাম কীভাবে যে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে?


আমরা আজ জানি যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, কিন্তু এই ধারণা গড়ে উঠতে মানুষের হাজার বছরের পর্যবেক্ষণ, সন্দেহ, বিজ্ঞান ও সাহসী চিন্তার প্রয়োজন হয়েছিল। মানুষের কাছে আকাশ সবসময়ই রহস্যে ভরা ছিল। হাজার বছর আগে যখন সূর্যকে দেখা যেত পূর্ব দিগন্তে উদিত হয়ে পশ্চিমে অস্ত যেতে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হতো— সূর্যই ঘুরছে, পৃথিবী স্থির। এই সহজ ব্যাখ্যাই ছিল মানুষের প্রথম ধারণা। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল এবং টলেমি এই ধারণাকে দার্শনিক ও জ্যামিতিক ভিত্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন। টলেমি তার বিখ্যাত বই Almagest-এ জটিল গাণিতিক মডেল বানিয়েছিলেন যাতে গ্রহগুলোর চলাচল ব্যাখ্যা করা যায়। টলেমি বলেছিলেন, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর সব গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তাঁর বর্ণনা এতটাই সূক্ষ্ম ও পরিপাটি ছিল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই “পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেল” (geocentric model) বিজ্ঞান, ধর্ম এবং রাজনীতির সমর্থন পায়। এই ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রায় ১৪০০ বছর ধরে সত্য হিসেবে গৃহীত ছিল! 

তবে এই মডেলে একটা বড় সমস্যা ছিল— গ্রহগুলোর চলাফেরা সব সময় সোজাসাপ্টা ছিল না। মাঝে মাঝে দেখা যেত, মঙ্গল বা শুক্র হঠাৎ আকাশে উল্টো দিকে চলতে শুরু করেছে, যাকে বলা হয় ‘retrograde motion’। টলেমি ব্যাখ্যা করলেন, প্রতিটি গ্রহ তাদের মূল কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে নিজের ছোট ছোট বৃত্তাকার পথে (epicycle) চলাফেরা করে। এতে পর্যবেক্ষণ ঠিকঠাক ব্যাখ্যা করা গেলেও, এর গাণিতিক কাঠামো ছিল জটিল ও অযৌক্তিকভাবে ভারী। 

১৬ শতকের শুরুতে পোল্যান্ডের এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস এই সমস্ত জটিলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ বিশ বছর পর্যবেক্ষণ ও হিসাবের পর তিনি প্রস্তাব দেন এক বিপ্লবী ধারণা— সূর্য স্থির থাকে, পৃথিবী ও অন্য গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে ঘুরে। তাঁর বই De revolutionibus orbium coelestium (১৫৪৩)-এ তিনি বললেন, যদি সূর্যকে কেন্দ্র ধরা হয়, তাহলে গ্রহগুলোর গতি ব্যাখ্যা করা অনেক সহজ হয় এবং টলেমির মতো জটিল epicycle-এর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এই তত্ত্ব তখন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিপজ্জনক ছিল, কারণ বাইবেল অনুযায়ী পৃথিবীই ছিল সৃষ্টির কেন্দ্র। তাই কোপার্নিকাসের বই প্রকাশিত হলেও জীবদ্দশায় তিনি এর ফলাফল ভোগ করেননি। 

কিন্তু কিছু বছরের মধ্যেই ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি হাতে পেলেন নতুন এক যন্ত্র— দূরবীক্ষণ। ১৬০৯ সালে তিনি যখন দূরবীক্ষণ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু করেন, তখন ইতিহাস বদলে যায়। তিনি দেখলেন চাঁদের গায়ে পাহাড়-গর্ত আছে, মানে সেটিও পৃথিবীর মতোই বস্তুগত। তিনি আরও দেখলেন বৃহস্পতির চারটি চাঁদ (Io, Europa, Ganymede, Callisto) তার চারপাশে ঘুরছে, যা প্রমাণ করে সব কিছু পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল শুক্র গ্রহের “কলা” বা phase পরিবর্তন। শুক্র কখনো পূর্ণ, কখনো আধা, কখনো ক্ষীণ হয়ে দেখা দেয়, যেভাবে চাঁদ হয়। এই পরিবর্তন একমাত্র তখনই সম্ভব, যদি শুক্র সূর্যের চারপাশে ঘোরে এবং আমরা সেটিকে সূর্যের আলোয় বিভিন্ন কোণে দেখি। এই এক পর্যবেক্ষণই টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক তত্ত্বকে ধ্বংস করে দেয়। গ্যালিলিও এই ফলাফল প্রকাশ করলেন এবং এজন্য ধর্মীয় আদালতে তাঁকে বাধ্য করা হয় নিজের মত প্রত্যাহার করতে। গ্যালিলিও  চার্চের বিরোধিতার মুখে পড়েন এবং গৃহবন্দি হন। তবু ইতিহাস তাঁর পক্ষেই দাঁড়ায়।

এরপর জার্মান গণিতবিদ জোহানেস কেপলার, তাঁর গুরু টাইকো ব্রাহের সংগৃহীত গ্রহের অবস্থান সংক্রান্ত নিখুঁত তথ্য ব্যবহার করে আবিষ্কার করলেন তিনটি মৌলিক নিয়ম। তিনি দেখলেন, গ্রহের কক্ষপথ আসলে নিখুঁত বৃত্ত নয় বরং উপবৃত্তাকার, আর সূর্য সেই উপবৃত্তের এক ফোকাসে থাকে। তিনি আরও দেখলেন গ্রহ সূর্যের কাছাকাছি এলে দ্রুত চলে, দূরে গেলে ধীরে চলে। তৃতীয় নিয়মে তিনি প্রমাণ করলেন যে সূর্য থেকে দূরত্বের ঘন ও সূর্যের চারপাশে আবর্তনের সময়ের বর্গের মধ্যে নির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে। এইসব গাণিতিক সম্পর্ক সূর্যকেন্দ্রিক মডেলকে শুধুমাত্র ধারণা নয়, এক কার্যকর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় রূপ দেয়। 

তারও প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর, ১৬৮৭ সালে আইজ্যাক নিউটন তাঁর Principia Mathematica প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, যেই বল আপেলকে মাটিতে ফেলে দেয়, সেই বলই সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে কাজ করে। সূর্যের বিশাল ভর পৃথিবীকে তার কক্ষপথে টেনে রাখে, আর পৃথিবীর জড়তার কারণে সেটি সরাসরি সূর্যের দিকে না গিয়ে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এই ব্যাখ্যা শুধু পৃথিবী নয়, সমগ্র সৌরজগতের গতিবিধি একই সূত্রে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়। এর পর থেকে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব কেবল ধারণা নয়, একটি প্রমাণিত ভৌত সত্য হয়ে ওঠে।

আজ আমরা জানি পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে কারণ আমরা তা সরাসরি পরিমাপ করতে পারি। পৃথিবীর সূর্য-পরিক্রমার কারণে দূরবর্তী নক্ষত্রগুলোর অবস্থান বছরে সামান্য পরিবর্তিত হয়— এই ঘটনাকে বলা হয় “stellar parallax”, যা ১৮৩৮ সালে ফ্রিডরিখ বেসেল প্রথম মাপেন। এখন স্যাটেলাইট, মহাকাশযান ও দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিধি, গতি ও সময় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়। সূর্যগ্রহণ, গ্রহের অবস্থান, এমনকি পৃথিবীর গতি ও সূর্যের তুলনায় আমাদের অক্ষের কৌণিক বিচ্যুতি— সবকিছুই সূর্যকেন্দ্রিক মডেল দিয়েই নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। 



মন্তব্য করুন