প্রভাষক
২৫ অক্টোবর, ২০২৫ ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ইতোমধ্যে ‘Industry 4.0’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। আঠারো শতকের শেষার্ধে শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় সেটিই হচ্ছে শিল্প বিপ্লব। শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ড বিশ্বের প্রথম শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং দেশটির অর্থনৈতিতে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। তাই কখনও কখনও ইংল্যান্ডকে ‘পৃথিবীর কারখানা’ বলা হয়ে থাকে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শব্দটি সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন একদল বিজ্ঞানী, যারা জার্মান সরকারের জন্য একটি উচ্চ প্রযুক্তিগত কৌশল তৈরি করছিলেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান মি. ক্লাউস শোয়াব ২০১৫ সালে ফরেন এ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের মাধ্যমে ৪র্থ শিল্প বিপ্লব শব্দটিকে বৃহৎ পরিসরে উপস্থাপন করেন। শোয়াব তখন এমন সব প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং বায়োলজিকে (সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস) একত্রিত করে পৃথিবীকে উন্নতির পথে আরও গতিশীল করা যায়। শোয়াব আশা করেন, এই যুগটি রোবটিক্স বুদ্ধিমত্তা, ন্যানোটেকনোলজি, কোয়ান্টামকম্পিউটিং, বায়োটেকনোলজি, ইন্টারনেট অব থিংস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, ডিসেন্ট্রালাইজড কনসেনসাস, পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের এবং সম্পূর্ণ স্বশাসিত যানবাহনের ক্ষেত্রে উদীয়মান প্রযুক্তির যুগান্তকারী যুগ হিসেবে চিহ্নিত হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওই প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন পর্যায়ে বর্তমানে অবশ্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে ঈঙঠওউ-১৯ মহামারী পরবর্তী অর্থনীতি পুনর্গঠনের কৌশলগত টেকসই সমাধান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাষ্প এবং জলশক্তি ব্যবহার করে হস্তসাধিত শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়াকে মেশিন চালিত পদ্ধতিতে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রথম শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব ছিল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা। তৃতীয় শিল্প বিপ্লব হয়েছে ডিজিটাল পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে। এখন যেটি কড়া নাড়ছে তা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। যার গতির দৌড় কল্পনার চেয়েও বেশি। এর ভিত হচ্ছে ‘জ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ভিত্তিক কম্পিউটিং প্রযুক্তি। রোবটিক্স, আইওটি, ন্যানো প্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স ইত্যাদি প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে নিয়ে যাচ্ছে অনন্য উচ্চতায়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে কর্মবাজারে। অটোমেশন প্রযুক্তির ফলে ক্রমশ শিল্প-কারখানা হয়ে পড়বে যন্ত্রনির্ভর। টেক জায়ান্ট কোম্পানি এ্যাপোলের হার্ডওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফক্সকন ইতোমধ্যে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করে তার পরিবর্তে রোবটকে কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে চীনের কারখানাগুলোতে রোবট ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে রোবটের কারণে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে। এসব আশঙ্কার ভেতরেই রয়েছে আগামী দিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের বিশেষ সম্ভাবনা। বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ৩০%-এর বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগামী ৩০ বছরজুড়ে তরুণ বা উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। বাংলাদেশের জন্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার এটাই সব থেকে বড় হাতিয়ার। জ্ঞানভিত্তিক এই শিল্প বিপ্লবে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদই হবে বেশি মূল্যবান। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার নানাবিধ কর্মক্ষেত্র। নতুন যুগের এসব চাকরির জন্য প্রয়োজন উঁচু স্তরের কারিগরি দক্ষতা। ডেটা সায়েন্টিস্ট, আইওটি এক্সপার্ট, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারের মতো আগামী দিনের চাকরিগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী তরুণ জনগোষ্ঠী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির ৪৭% কাজ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমনির্ভর এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতা নির্ভরচাকরি বিলুপ্ত হলেও উচ্চ দক্ষতানির্ভর যে নতুন কর্মবাজার সৃষ্টি হবে সে বিষয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তার জন্য প্রস্তুত করে তোলার এখনই সেরা সময়। দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা সম্ভব হলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশ থেকে অনেক বেশি উপযুক্ত। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ অত্যন্ত নগণ্য এবং আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ মাত্র ১৫%। জাপান সব প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছে তার জনসংখ্যাকে সুদক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তর করার মাধ্যমে। জাপানের এই উদাহরণ আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
৭
৬ মন্তব্য