#জনস্বার্থে_প্রচার
#এক_অদৃশ্য_ডিজিটাল_উপেনিবেশ_বাংলাদেশ
#25_10_2025
এক অদৃশ্য ডিজিটাল উপেনিবেশের কবলে বাংলাদেশ
দেশের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নিরাপত্তা বেহাত হবার উপক্রম
প্রতিবেদনে টি লিখেছেন
মো: সামছুল হোসেন
সিনিয়র শিক্ষক,
মোহাম্মদ মকন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট।
২৫ অক্টোবর ২০২৫ খ্রি:
প্রযুক্তির যুগে, যেখানে তথ্যপ্রবাহ প্রাণের মতা সেখানে আমাদের দেশের ইন্টারনেট-ব্যান্ডউইথ ব্যবস্থা যেন এক ভয়ানক অন্তরায়ের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আজ আমি খোলস ছাড়িয়ে বলব— কি ভাবে এই সংকট শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ডিজিটাল স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
১. বিপুল নির্ভরতা— বিদেশি হাতে
আমাদের দেশের প্রায় ৫০ % ব্যান্ডউইথ আমদানি করতে হয়, বড় অংশই আসছে প্রতিবেশী দেশের ভূ‐ভূমি দিয়ে—বিশেষত India-র মাধ্যমে। বিষয়টি একান্তই নজর দেয়া প্রাসঙ্গিক। অন্য দেশের ভূখণ্ডের ডিভাইস থেকে আমাদের ইন্টারনেট প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে নেয়া হচ্ছে—দক্ষতার সাথে নয়, সাম্রাজ্য-বুদ্ধিতে।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের সেই অর্থ দিয়ে নিজস্ব অবকাঠামো গড়া সম্ভব ছিল—বাজেট ছিল, সক্ষমতাও। কিন্তু সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
২. জীবন্ত হুমকি— সাবমেরিন কেবলের অবস্থা
বিশেষায়িত দুইটি সাবমেরিন ক্যাবলের সম্মিলিত সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার জিবিপিএস। অথচ আগামী ২০২৭ সালের জন্য আমাদের চাহিদা হতে চলেছে প্রায় ২৫ হাজার জিবিপিএস। সেই সাথে, প্রথম ক্যাবলের জীবনকাল প্রায় শেষ পর্যায়ে। অর্থাৎ যেকোনো মুহূর্তে ৪২০০ জিবিপিএস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে কোন নোটিশ ছাড়াই।
এই ঘাটতি পূরণে যদি বিদেশি ব্যান্ডউইথ আমদানি না করা হয়, তাহলে এক বিশাল শূন্যতা—প্রায় ১৮ হাজার জিবিপিএস—উপেক্ষা করা যাবে না। এর জন্য আমাদের দিতে হবে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! অথচ সেই অর্থ দিয়ে যদি নিজস্ব একটি ক্যাবল নির্মাণ করা হতো—চার-পাঁচ বছরের সময়ের মধ্যে আমরা স্বনির্ভর হয়ে ওঠতে পারতাম।
৩. নিরাপত্তার অভাবে: তথ্য ও সার্বভৌমত্ব
এখানে সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো—তথ্য নিরাপত্তার অভাব। বিদেশি ভূখণ্ডের এক প্রান্তে অবকাঠামো-এর উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে অন্য প্রান্তে আমরা হাত ধুয়ে বসতে পারি না। ভারতের আইন অনুযায়ী, তারা এমন ব্যান্ডউইথ রুটিং-এর ক্ষেত্রে ১০০ % ইন্টারসেপ্ট ক্ষমতা রাখে। আমাদের দেশের তথ্যপ্রবাহে কোনো নিরাপত্তা নেই—যেমন ই-মেইল হেডার, বডি, প্রশাসনিক যোগাযোগ সবই তৃতীয় পক্ষের কাছে উন্মুক্ত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইন্টারনেট শুধু সেবা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় হুমকি। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব না থাকলে, পরবর্তী সময়ে আমরা ‘তথ্যবিহীন দেশ’ হয়ে পড়ব।
৪. নৈতিক ও অর্থনৈতিক মামলায় সঙ্কট
আমাদের দেশের কোটি কোটি ডলার বিদেশি কোম্পানির হাতেই যাচ্ছে। এই অর্থ দেশের ইনোভেশন, স্টার্টআপ, শিক্ষাক্ষেত্রে খরচ হতেই পারত!
পরিবর্তে আমরা খরচ করছি এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় যা অন্যের হাতের খেলো হয়।
এটি একদৃষ্টে ‘ডিজিটাল উপনিবেশবাদ’ বলেও আখ্যায়িত করা যায়—যেখানে প্রযুক্তিতে স্বাধীন না হয়ে অন্য দেশের নিয়ন্ত্রণে পড়ে থাকা হচ্ছে। আমাদের সংবিধান বা জাতীয় নীতিতে কি প্রচলিত আছে এমন ‘ডিজিটাল স্বাধীনতা’ নীতি?
যদি না থাকে, এখনই সময়:
নিজস্ব সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণ দ্রুত এগিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা।
শুধুমাত্র কেবলের কথা নয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি রাখা যাবে।
আমদানি নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে আনা—যেমন কেবল, রাউটিং, নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিক সবই ‘দেশীয়’ হতে হবে।
তথ্য-নিরাপত্তা আইন শক্ত করা—যাতে তথ্যপ্রবাহে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ হয় এবং দেশীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়।
দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া—তাতে আমরা শুধু ব্যান্ডউইথ না, বরং ‘ডিজিটাল ক্ষমতা’ গড়ে তুলবো।
৫. প্রতিবাদ ও আহ্বান
এই মুহূর্তে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিলে, আমরা শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ঠেকাব না, বরং দেশীয় সার্বভৌমত্ব, তথ্য স্বাধীনতা ও ডিজিটাল ভবিষ্যত নিশ্চিত করব। আমি শুধু একজন একাডেমিক বা প্রযুক্তিবিদ নয়—আমি একজন দেশের সাধারণ নাগরিক, আমি দেখছি আমরা কতটা দীর্ঘশ্বাসের ঝুকিতে আছি। আমাদের ‘সংযোগ’ নিয়ে আমরা কতটা ভাবি আর কতটা উদাস হয়ে আমাদের স্বাধীন যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প ভাবনার উপর ভরসা করে আছি?
এই প্রবন্ধ শুধু তথ্যচিত্র নয়—এটি একটি আহ্বান। আহ্বান রাষ্ট্রপ্রধান, নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি সংস্থাকে। আপনারা নিশ্চয় জানেন—একটি দেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতা তার সামগ্রিক স্বাধীনতার অংশ। ঝুঁকি ধীরে ধীরে বাড়ছে, সময় হ্রাস পাচ্ছে।
আমরা চাই:
তথ্য-স্বাধীন দেশ, ডিজিটাল সার্বভৌম বাংলাদেশ।
ধন্যবাদ
মো: সামছুল হোসেন
সিনিয়র শিক্ষক,
মোহাম্মদ মকন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট।
৩
৩ মন্তব্য