সহকারী শিক্ষক
২৭ অক্টোবর, ২০২৫ ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বিশ্ব আজ প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে যেমন অগ্রসর, তেমনি যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সমস্যারও সম্মুখীন। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন এমন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, যা জাতি, ধর্ম, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমার ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণে কাজ করবে। এই প্রয়োজন থেকেই ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ (United Nations)। এই দিনটিকে প্রতি বছর সারা বিশ্বে “বিশ্ব জাতিসংঘ দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।
এই দিনটি জাতিসংঘের অবদান, লক্ষ্য ও আদর্শকে স্মরণ করার পাশাপাশি মানবজাতির ঐক্য ও শান্তির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, টেকসই শান্তি ও উন্নয়ন কেবল সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫) মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে কোটি কোটি প্রাণহানি ঘটে, অগণিত মানুষ গৃহহীন ও দারিদ্র্যের শিকার হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের নেতারা নতুন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের চিন্তা করেন, যা ভবিষ্যতে এমন যুদ্ধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ। প্রতিষ্ঠাকালে সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ৫১টি। বর্তমানে (২০২৫ সাল পর্যন্ত) জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯৩। জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত।
জাতিসংঘ গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল—
1. আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।
2. বিভিন্ন জাতির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
3.মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
4. সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করা।
5. আন্তর্জাতিক সমস্যা ও বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা।
6.টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা গড়ে তোলা।
জাতিসংঘের অন্যতম শক্তি হলো তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, যেমন—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), ইউনেস্কো (UNESCO), বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ইত্যাদি। এসব সংস্থা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিশুর অধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অসামান্য ভূমিকা পালন করছে।
প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করে। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো— জাতিসংঘের আদর্শ, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করা এবং বৈশ্বিক ঐক্যকে সুদৃঢ় করা।
এই দিনে বিভিন্ন দেশে সেমিনার, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শান্তি, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে বিশেষ প্রবন্ধ ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ব জাতিসংঘ দিবস আমাদের শেখায়—
“একটি জাতি একা টিকে থাকতে পারে না; পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই পৃথিবীতে শান্তি ও অগ্রগতি সম্ভব।”
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন করে। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও পুলিশ সদস্যরা জাতিসংঘের পতাকার নিচে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
৬৫
১০০ মন্তব্য