Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৮:৩২ অপরাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ?

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম একটি হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি বিশ্বের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি ও মানুষের চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেও বর্তমানে অন্যান্য খাতেও এর বহুল ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। বেসরকারি খাতে এর ব্যাপক ব্যবহারের পাশাপাশি সরকারি খাতেও অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চিকিৎসাসেবা, অফিস-আদালত, শিল্পকারখানা, সংবাদ সংস্থা বা গণমাধ্যম, ভাষান্তর প্রক্রিয়া, টেলিফোন সেবা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন অপারেটর, ব্যাংক, অনলাইন ও কৃষি খাতসহ অনেক খাতেই এর উপযোগিতায় ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

এছাড়াও শিল্পকারখানায় অপচয়-ব্যয় কমিয়ে মেশিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। কৃষি খাতেও এআই-এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এআই সঠিক উৎপাদন চাষ-পদ্ধতির বিষয়ে যথার্থ সিদ্ধান্ত দিচ্ছে। মাটির গুণাগুণ গবেষণা করে বলে দিচ্ছে কোন ধরনের ফসল ওই মাটিতে চাষ করা উচিত। চিকিৎসাসেবায় এগিয়ে আসছে এআই সফটওয়্যার। এটি চিকিৎসকদের এমআরআই-এর মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্ত করার কাজে সহায়তা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে এমন সব ‘সেল্ফ লার্নিং সফটওয়্যার’ তৈরি করা হচ্ছে, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগ্রতি সাধন করবে। জটিল রোগের সুনির্দিষ্ট লক্ষণগুলো চিহ্নিত করতে চিকিৎসাবিদ্যায় হাইটেক প্রযুক্তির ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিস্তারিত চিত্র ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে, যাতে ডাক্তাররা সেই ছবি বিশ্লেষণে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। কৃত্রিম পদ্ধতিতে ফুসফুসের রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালানোর বড় ঝুঁকি-ক্ষতি এড়াতে নতুন উদ্ভাবিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে এ ধরনের রোগীর বাঁচার সম্ভাবনাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক পরামর্শ প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি ২০২২ সালে এক হাজার কোম্পানির ওপর জরিপ চালায়। এ জরিপ অনুসারে, এসব কোম্পানির মধ্যে কেউ ছয়জনের মধ্যে একজন, আর কেউ চারজনের মধ্যে একজন কর্মীর নিয়োগে এআই ব্যবহার করেছে। এছাড়া অনেক কোম্পানিতে প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়োগে এআই ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু নিয়োগ নয়, চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর একজন কর্মী কেমন কাজ করছে তারও খবর রাখছে এআই। অ্যামাজন, ইউনিলিভারসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মী নিয়োগে কাজ করা মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘হায়ারভিউ’ জানিয়েছে, ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত কর্মী নিয়োগ যথেষ্ট কার্যকর। 

দৈনন্দিন কার্যপ্রণালিতে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দেখানো মেশিনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসাবে বিবেচিত। গবেষকরা এর সংজ্ঞা নিয়ে একমত না হলেও যুক্তরাষ্টের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক ল্যারি বার্নবাউমের মতে, ‘সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো কম্পিউটার বিজ্ঞানের এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে বুদ্ধিদীপ্ত কাজ করতে যন্ত্র তৈরি ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তি, সমস্যার সমাধান, মানুষের ভাষা বোঝার ক্ষমতা, উপলব্ধি, শিক্ষণ-পরিকল্পনা, কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটানো বা কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো স্বয়ংসম্পন্ন মেশিনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেশিন হিসাবে বিবেচ্য। উচ্চক্ষমতার কম্পিউটার, রোবট ও অন্যান্য যন্ত্র এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যামশায়ারের হ্যানোভার শহরস্থ ডার্টমাউথ কলেজে অনুষ্ঠিত একাডেমিক কনফারেন্সে জন ম্যাকার্থি সর্বপ্রথম আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স টার্মটি প্রকাশ করেন। এজন্য তাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক বলা হয়। তার অন্য সহযোগীরা হলেন মার্ভিন মিনস্কি, অ্যালেন নিউয়েল ও হার্বাট এ সায়মন।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের অভাবনীয় সাফল্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার ভবিষ্যৎ বিশ্ববাসীর জন্য স্বস্তি-সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেওয়ার বিপরীতে এক অজানা আশঙ্কারও জন্ম দিচ্ছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদেরও তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৫০টিরও বেশি দেশে বিপুল অর্থ ব্যয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শত্রুকে হত্যা করতে সক্ষম রোবট ও ড্রোন তৈরির সংবাদ জনমনে যারপরনাই আতঙ্ক তৈরি করছে। গত ৮ জুন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এ প্রযুক্তি একদিন মানুষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাবে। মানুষকে হত্যা করবে।  এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কর্নওয়ালভিত্তিক ইঞ্জিনিয়ার্ড আর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৃশ্যপট’ বর্ণনায় অ্যামেকা অত্যন্ত সাবলীলভাবে জানায়, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিক্স নিয়ে সবচেয়ে যে ভীতিকর পরিস্থিতি আমি বিশ্বে কল্পনা করি তা হলো, রোবটরা হয়ে উঠবে অতিমাত্রায় শক্তিশালী। এতটাই শক্তি তারা সঞ্চয় করবে যে, তারা তাদের অজান্তেই মানবজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে অথবা পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এর ফলে একটি নিষ্পেষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেখানে ব্যক্তিবিশেষের অধিকারের প্রতি আর সম্মান দেখানো হবে না।’


মন্তব্য করুন