সহকারী শিক্ষক
১৪ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:৩০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
২০২৪ সালের ১৮ মে—আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর একটি। সেদিনের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা এক মুহূর্তে আমার জীবনের গতি থামিয়ে দেয়। ডান পা ভেঙে যায়, শরীরের উপর দিয়ে যেন বজ্রপাত নেমে আসে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবকিছু বদলে গেল। আমার চলাফেরা, আমার স্বাভাবিক জীবন, আমার ক্লাস নেওয়ার রুটিন—সবকিছু। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যখন ব্যথায় কুঁকড়ে যেতাম, তখন মনে হতো—এলোমেলো হয়ে যাওয়া এই জীবনে আবার কি আগের মতো ফিরতে পারবো?
কিন্তু সেই দুর্বিষহ সময়েও আমার মনে একটি কথা বারবার ভেসে উঠতো—“আমার শিক্ষার্থীরা কি করছে?”
আমার অনুপস্থিতিতে তারা কীভাবে এগোচ্ছে? আইসিটি—এই বিষয়টি তাদের কাছে কখনো কঠিন মনে না হোক, সেই চেষ্টা তো আমি সবসময় করি। আমার শেখানো প্রত্যেকটি ক্লাস, প্রত্যেকটি টপিক, প্রত্যেকটি প্রাকটিক্যাল—সবই তো আমি তাদের মুখের হাসি দেখে সাজিয়েছি। দুর্ঘটনার পরও সেই দায়বদ্ধতা আমার ভেতর থেকে মুছে যায়নি।
ব্যথা ছিল, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি আরও বড় ছিল
চিকিৎসার সময় ডাক্তাররা বলেছিলেন—লম্বা সময় বিশ্রামে থাকতে হবে। শরীর তখন বিশ্রাম চাইত, কিন্তু মন চাইল ভিন্ন কিছু। আমার মন ব্যথাকে উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের দিকে ছুটতে চাইত। সত্যি বলতে, শারীরিক কষ্ট আমাকে যতটা না দুর্বল করেছিল, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দূরে থাকা আমাকে তার থেকেও বেশি কষ্ট দিত।
হাঁটা তখনো ঠিকমতো পারতাম না। ব্যথা প্রতিদিনই মনে করিয়ে দিত—আমি আহত। কিন্তু শিক্ষার্থীদের চোখে আশা জ্বলে, তাদের মুখে “স্যার, কেমন আছেন?”—এই ভালোবাসা আমাকে বারবার শক্ত করে তুলত।
আমি বুঝতে পারলাম—শিক্ষকের শরীর হয়তো ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু দায়িত্ববোধ কখনো ভাঙে না।
শিক্ষার্থীদের মাঝে ফিরে আসা—এক নতুন জন্ম
হাসপাতাল থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠার পর যতটা সম্ভব ব্যথা সামলে ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। কখনো বসে, কখনো অনলাইনে, কখনো খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতেও। কিন্তু যখন ক্লাসে ঢুকতাম, তখন মনে হতো—আমি যেন নতুন করে জন্ম নিয়েছি।
শিক্ষার্থীরা আমার দিকে তাকিয়ে যেভাবে উঠে দাঁড়ায়, যেভাবে সম্মান দেখায়, যেভাবে মনোযোগ দিয়ে শোনে—তা আমার শরীরের প্রতিটি কোষে শক্তি ঢেলে দেয়।
তারা যখন বলে—
“স্যার, আপনি অসুস্থ তবুও আমাদের জন্য এভাবে আসেন!”
“স্যার, আপনাকে দেখে আমাদেরও অনুপ্রেরণা আসে।”
এগুলো কি কোনো শিক্ষক ভুলতে পারে?
আমার আইসিটি জ্ঞান—আমার শিক্ষার্থীদের জন্য উজাড় করে দেওয়া
আমি যতটুকু আইসিটির জ্ঞান অর্জন করেছি, যতটুকু অভিজ্ঞতা পেয়েছি—সেগুলো আমি শুধু নিজের মধ্যে বন্দি রাখতে চাই না। কারণ একজন শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন তখনই, যখন তার জ্ঞানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আলোকিত হয়।
আজও যখন আমি কোনো কোড শেখাই, কোনো ফর্মুলা বোঝাই, কোনো নতুন প্রযুক্তির ধারণা দিই—মনে হয়, আমি নিজে যেন শিখছি। শিক্ষার্থীদের চোখে যখন ‘বুঝেছি’ ধরনের আলো দেখি, তখন মনে হয়, আমার সমস্ত কষ্ট সার্থক।
আল্লাহর প্রতি তওক্কুল ও কৃতজ্ঞতা
আমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নই। মাঝে মাঝে হাঁটতে কষ্ট হয়, মাঝে মাঝে ব্যথা ফিরে আসে। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি,
আল্লাহ আমাকে শিফা দেবেন।
তিনি আমাকে এমন শক্তি দিয়েছেন—যা আমাকে বিপদের মধ্যেও থামতে দেয় না।
প্রতিদিন সেজদায় গিয়ে বলি—
“হে আল্লাহ, আমাকে আরও শক্তি দিন যেন আমি আমার শিক্ষার্থীদের আরও বেশি দিতে পারি।”
আগামী দিনের স্বপ্ন—আরও শিখবো, আরও শেখাবো
আমি জানি, সামনে আরও পথ আছে।
আরও অনেক কিছু শেখার আছে।
আরও অনেক কিছু শেখানোর আছে।
আইসিটি জগতে প্রতিদিন নতুন কিছু আসে—আমি সেই নতুনত্ব শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। তাদের যেন বিশ্বমানের প্রযুক্তি জ্ঞান থাকে, তারা যেন ভবিষ্যতে বড় কিছু করতে পারে—এই স্বপ্নই আমাকে চালায়।
ইনশাআল্লাহ, সুস্থ হয়ে আরও জোরদারভাবে ফিরে আসব।
আরও বড় পরিসরে শেখাবো।
আরও আধুনিকভাবে শেখাবো।
আরও আন্তরিকতা নিয়ে শেখাবো।
কারণ শিক্ষকতা শুধু আমার চাকরি নয়—
এটি আমার নেশা, আমার দায়িত্ব, আমার ইমানি অঙ্গীকার।
---
শেষ কথা
কঠিন সময় আমাদের থামিয়ে দেয়, সত্যি।
কিন্তু বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি এবং মানুষের ভালোবাসা আমাদের আবার দাঁড় করায়।
আমি আজ দাঁড়িয়ে আছি—
আমার শিক্ষার্থীদের কারণে।
আর দাঁড়িয়ে থাকতে চাই—
তাদের ভবিষ্যতের জন্য।
৩
৩ মন্তব্য