সহকারী অধ্যাপক
২১ নভেম্বর, ২০২৫ ০৬:০৭ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ভূমিকা : আমরা শিক্ষক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, উত্তম শিক্ষক হবেন উত্তম ছাত্র; শিক্ষকের ছাত্রত্ত্ব গ্রহনে তার মনের তারুণ্য নষ্ট হতে পারেনা। বরং তিনি সবসময় ছাত্রদের সুবিধা অসুবিধা ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন। স্যার জন এড্যামস এর মতে শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। পার্সিভেল রেন এর মতে শিক্ষক শিশুর বন্ধু, পরিচালক ও যোগ্য উপদেষ্টা এবং চরিত্র গঠনের নিয়ামক।
শিক্ষক হিসেবে আমাদের প্রতিষ্ঠান, ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক, আমার পরিবারে ও সামাজিকভাবে কিছু নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। নৈতিকতা হলো এমন কিছু নীতি, যা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্ব স্ব পরিবেশ বা কর্মক্ষেত্রে অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। তবে নৈতিকতার মানদণ্ডে মৌলিক কিছু নীতিমালা থাকে, যেগুলো সব পেশাতেই সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয়। সময়মতো কর্মস্থলে হাজির হওয়া, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কাজ সম্পন্ন করা, সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য পোষণ করা, কমিটমেন্ট ঠিক রাখা, কাজেকর্মে ফাঁকিবাজি না করা ইত্যাদি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে মানুষ গড়ার আদর্শ কারখানা, সেখানে শিক্ষকদের পেশাগত নৈতিকতা অবলম্বন অন্য পেশা থেকে একটু ভিন্ন ও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
একজন শিক্ষক হিসাবে আমাদের নৈতিক দিকগুলো কেমন হওয়া উচিত বা উচিত নয় তা আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার চেষ্ঠা করলাম:
ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষককে অনুকরণ করে, শিক্ষকের পোশাক, শিক্ষকের আদব-কায়দা, কথা বলার ভঙ্গি, তার চুলের স্টাইল ইত্যাদি। সুতরাং একজন শিক্ষককে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসার সময় তাকে চিন্তা করা উচিত সে কোন ধরনের পোশাক পরবে। একজন শিক্ষক যদি কলেজে টিশার্ট পরে এসে ক্লাসে যায় তাহলে শিক্ষার্থীরা তা মেনে নাও নিতে পারে। ক্লাসে প্রবেশ করেই যদি শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কুশল বিনিময় না করে পড়াতে শুরু করে তাহলে তা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না।
ক্লাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের সাথে কিছু সময় তাদের খোজ খবর নেওয়া একজন শিক্ষকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোন শিক্ষার্থী যদি কোন পড়া ধরলে তা না পারে তবে শিক্ষকরা অনেক সময় তাদেরকে গরু, গাঁধা, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীর সাথে তুলনা করে। এটা কোন শিক্ষকের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। কোন শিক্ষার্থী যদি পড়া ঠিকমতো না পারে তাহলে তার কারণ অনুসন্ধান করা একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব।
অটিজম শিশুদের জন্য শিক্ষকদের দায়িত্ব আরো অনেক বেশি। তাদেরকে বেশি সময় দেওয়া শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
আমরা অনেক শিক্ষক শুধুমাত্র লেকচার ম্যথোডে পড়াতে অভ্যস্ত। একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক যদি শুধুমাত্র কোন বিষয় সম্পর্কে শুধু লেকচার দিয়ে গেলেন। এক্ষে্ত্রে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখতে পারবে? কিন্তু শিক্ষক যদি বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন উপকরণ, কোন ভিডিও ক্লাসে উপস্থাপন করেন তাহলে শিক্ষার্থীরা ঐ লেকচার ম্যাথোডে যতটুকু বুঝতো তার থেকে অন্তত: ৯০ ভাগ বেশি ভালো ঐ বিষয় সম্পর্কে বুঝবে। সুতরাং একজন শিক্ষককে ক্লাসে স্মার্ট হতে হবে যা শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব।
পড়ালেখায় ক্লাসে সব শিক্ষার্থীকে কিভাবে সম্পৃক্ত করা যায় তা একজন শিক্ষককে সব সময় মাথায় রাখতে হবে। এজন্য শিক্ষককে তার বিষয় সম্পর্কে সর্বোচ্চ জ্ঞান থাকতে হবে। প্রথম বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের যেমন গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি পিছনের শিক্ষার্থীদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ একজন শিক্ষক যখন ক্লাস নিবেন তখন তাকে সামনে পিছনে সব জায়গায়তেই যেতে হবে।
কোন শিক্ষার্থী যদি পরপর বেশ কয়েকদিন প্রতিষ্ঠানে না আসে তবে ঐ শিক্ষার্থী কেন আসছে না তার খোঁজ নেওয়া একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানাতে হবে অথবা বাড়িতে যেয়ে বা ফোন করে ঐ শিক্ষার্থীর খোঁজ নিতে হবে।
ক্লাস পরিচালনা করার জন্য একজন শিক্ষকের মস্তিষ্ক সব সময় প্রসন্ন থাকতে হবে। একজন শিক্ষকের ক্লাস যদি সকাল ১০ টায় থাকে আর তিনি যদি ঠিক ১০ টায় কলেজে পৌছান তাহলে তিনি ক্লাসে অবশ্যই অমনোযোগী হবেন। এতে কোমলমতী শিক্ষার্থীরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই একজন শিক্ষককে অবশ্যই তার ক্লাস পরিচালনার জন্য তাকে শারিরীক ও মানসিকভাবে ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। এজন্য তাকে সময় সম্পর্কে যথেষ্ঠ সচেতন হতে হবে।
ক্লাস চলাকালীন সময়ে একজন শিক্ষককে অবশ্যই মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে হবে বা শব্দহীন অবস্থায় রাখতে হবে, তা নাহলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই পাঠে মনোনিবেশ কঠিন হয়ে পড়বে।
শিক্ষকের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা ঠিক রাখার জন্য তাকে অবশ্যই নিজ নিজ ধর্ম অনুসারে প্রার্থনা ও ব্যায়াম করা অত্যন্ত জরুরী এবং শিক্ষার্থীরাও যেন এ অভ্যাস গড়ে তোলে সে বিষয়ে তাদের জ্ঞান দান করা একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব।
অনেক শিক্ষক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকেন। বেসরকারী শিক্ষা ব্যবস্থায় বদলী ব্যবস্থা না থাকায় এ সব শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় বেশি দেখা যায়। এ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক শিক্ষক কলেজে অনুপস্থিত থাকেন। এমনকি পাঠদান থেকেও বিরত থাকেন। এ সব বিষয়ে অধ্যক্ষ কথা বললেও অনেক সময় কাজ হয় না। একজন শিক্ষকের কাছে এমন অনৈতিক কাজ কখনই কাম্য নয়।
আজকাল পত্রিকা খুললেই দেখা যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনৈতিক সম্পর্ক। বিভিন্ন প্রলোভন যেমন: খাতায় নাম্বার বাড়িয়ে দেওয়া, পাশ করিয়ে দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সাথে অনৈতিক কর্মকান্ড করে থাকে। শুধু তাই নয়, শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যেও এমন ঘটনা পত্রিকার পাতায় পাওয়া যায়। এমন কাজ একজন শিক্ষকের নৈতিকতার অবক্ষয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
একজন শিক্ষক যদি মাদকাসক্ত হয়, সে যদি কোন দোকানে বসে বা রাস্তার দাড়িয়ে সিগারেট/বিড়ি পান করে এবং তা যদি একজন শিক্ষার্থী দেখে তাহলে তার মধ্যেও এমন কুঅভ্যাস গড়ে উঠার সম্ভবনা থেকে যায়। এজন্য এমন কুঅভ্যাস ত্যাগ করা একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
একজন ভালো শিক্ষক হতে হলে শিক্ষককে অবশ্যই ডিজিটাল হতে হবে। তাকে আইসিটি বিষয়ক জ্ঞান লাভ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শেখানোর জন্য তাকে ল্যাপটপ, মোবাইল চালনায় পারদর্শী হতে হবে। গুগল, ইউটিউব সহ বিভিন্ন শিক্ষামুলক ওয়েভসাইট চালনায় অবশ্যই দক্ষ হতে হবে তা না হলে শিক্ষার্থীর শিখন অবশ্যই অপুর্ণ থাকবে। যা আধুনিক বা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ায় অন্তরায় হিসাবে কাজ করবে।
সরকার শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় এসব প্রশিক্ষণ অনেক সময় শিক্ষকরা (বিশেষ করে বেসরকারী শিক্ষকরা) করতে চান না। তারা তাদের গতানুগতিক শিখন ব্যবস্থার বাইরে আসতে চান না। ফলে তাদের শিখন ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্খিত শিক্ষা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এজন্য প্রত্যেক শিক্ষকের অবশ্যই সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রশিক্ষন গ্রহণ করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
প্রাইভেট কোচিং সরকার কর্তৃক বন্ধ করলেও অনেক শিক্ষক এই কোচিং এর সাথে জড়িত। অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করান। কোচিং না করলে পরীক্ষায় নাম্বার কম দেওয়া, বোর্ড পরীক্ষায় ব্যবহারিকে নাম্বার কম সহ বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো জঘন্য কাজ অনেক সময় শিক্ষকরা করে থাকেন। একজন শিক্ষককের নৈতিকতা এমন কখনই কাম্য নয়।
একজন শিক্ষকের কাজ থেকে শুধু তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই শিক্ষা গ্রহণ করে না। তার কাছ থেকে তার সমাজের, তার চারপাশের ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তাই একজন শিক্ষককে অবশ্যই পারিবারিকভাবেও ভালো হতে হবে। তার মা-বাবা, ভাই-বোনদের যত্ন নিতে হবে। উচ্চস্বরে কথা বলা, প্রতিবেশির সাথে বিবাদ করা এগুলো একজন শিক্ষকের কাছ থেকে কাম্য নয়।
উপসংহার : বৃক্ষ তোমার নাম কি ফলে পরিচয়। একটি ভালো বীজ থেকে যেমন একটি ভালো গাছ জন্মাতে পারে, ঠিক তেমনি একজন ভালো শিক্ষকই পারে একটি ভালো দেশ গড়তে। তাই একজন ভালো শিক্ষকের নৈতিকতা অবশ্যই ভালো হতে হবে। পরিশেষে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে চাই-
যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,
কেঁদেছিলে তুমি, হেসেছিল সবে।
এমন প্রকৃতি করিবে গঠন,
মরণে হাঁসিবে তুমি, কাঁদিবে ভূবন।
১৪
২৩ মন্তব্য