মেয়েটা কেমন যেন। একাকী, স্বাধীনচেতা। পৃথিবীর বুকে একা একা ঘুরে বেড়াতেই তার যত আনন্দ। অপরূপ সুন্দরী মেয়েটা রাত-বিরাতে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে
সমুদ্রে ডুব মেরে ঝিনুক কুড়িয়ে মুক্তো বের করে, খাড়া পাহাড় বেয়ে চূড়ায় উঠে মুক্ত বাতাসের ঘ্রাণ নেয়। অন্ধকার রাতে বাতাসে রিনিঝিনি করে ভেসে বেড়ায় তার পাগল করা হাঁসি। সে হাঁসি শুনে ভয়ে কেঁপে উঠে বনের মাঝ দিয়ে চলা কোন কাফেলা। ভাবে, এ বুঝি কোন ডাকিনী’র মায়াজাল।
আসলে সে কিন্তু এরকম কোন মায়াজালে ঘেরা মেয়ে নয়। জিনা চাঁদের বুড়ি’র একমাত্র মেয়ে। পৃথিবী’র রুপকথার সেই চাঁদের বুড়ি যে কিনা চড়কা কাটে সারা রাত ধরে। পৃথিবী’র মানুষের রূপকথা আর উপকথায় তো সেই রকমই লেখা আছে। বুড়ি চড়কা কাটে না ছাই, সে আসলে চাঁদের রাজার বোন। বিপদে-আপদে চাঁদের রাজা তারই শরণাপন্ন হোন। তখন তারা গুনে আর নক্ষত্ররাজির অবস্থান বুঝে রাজ্যের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেন জিনার মা- চাঁদের বুড়ি। আর, এই অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানবীকেই কিনা পৃথিবী’র মানুষ চড়কা কাটে বলে হেয় করে! সত্যিই এন্ড্রোমিডা, কি বিচিত্র এই পৃথিবী’র মানুষ!
চাঁদবাসীরাও কম যায় না। পৃথিবী’র মানুষকে নিয়ে প্রায়ই হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠে চাঁদবাসীরা। এ নিয়ে মজা করে ছড়া কাটে-
ওগো পৃথিবীর মানুষ,
উড়াচ্ছো কত ফানুশ।
বলছে চাঁদের বুড়ি,
‘ছাড়ো কথার ঝুড়ি।‘
চাঁদের বুড়ির অবশ্য এ নিয়ে কোন কষ্ট নেই। তার যত চিন্তা মেয়েকে ঘিরে। মেয়ের দস্যিপনায় অতিষ্ঠ তিনি। সারাদিনের বেশ খানিকটা সময় তাকে ব্যয় করতে হয় মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে। তার মৃত্যুর পরে জিনাকেই তো তার জায়গায় বসতে হবে। সেজন্যে শিখতে হবে অনেক কিছু। কোন নক্ষত্রের কোথায় অবস্থান, কোনটার প্রভাবে কি হয়, কোন ঔষধি গাছের কি গুণ, এসবই তো শেখা চাই। নাহলে চাঁদের মানুষ তাকে মানবে কেন। অথচ, সেই দিকে মেয়েটার কোন খেয়াল নেই। খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, শুধুই ঘুরাঘুরি!
তাই একদিন, গোপনে মেয়ের খবর নেওয়ার জন্যে পৃথিবীতে ঝিঁঝিঁপোকা আর জোনাকি পাঠালেন চাঁদের বুড়ি। সেই ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো সারা রাত ঘুরে বেড়ায় জিনার পিছু পিছু। যখনই পৃথিবী’র বুকে নেমে এসে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় মেয়েটি, পোকাগুলো তার উপর গোয়েন্দাগিরি করে, নিঃশব্দে অনুসরণ করে বেড়ায় সব জায়গায়। বন ছেড়ে জিনা অন্য কোথাও চলে গেলে, বুনো ঝোপ-ঝাড়ে লুকিয়ে থাকা ঝিঁঝিঁপোকাগুলো একসাথে ডেকে উঠে। ঝিঁঝিঁ শব্দ করে চাঁদের বুড়িকে জানিয়ে দেয়-
‘তোমার চঞ্চল মেয়ে এখন আর এখানে নেই, চলে গেছে অন্য কোথাও’।
তখন জিনার পিছু নেয় জোনাকিগুলো। নদী-সাগর কি পাহাড়, যেখানেই সে যাক না কেন, জোনাকিগুলো তার পিছু নিবেই। মেয়েটাও কম যায় না। এই একুশ বছর বয়সেই মায়ের কাছ থেকে অদৃশ্যবিদ্যা শিখে নেওয়া জিনা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়। তখন তাকে খুঁজে পেতে নিজের গায়ের আলো জ্বালিয়ে দিতে হয় জোনাকিগুলোকে। সেই আলো জ্বালিয়ে অন্ধকারে ইতি-উতি খুঁজে বেড়ায় তারা দস্যি মেয়েটিকে।
এভাবেই লুকোচুরি চলছিলো অনেক দিন ধরেই,। শেষে বিরক্ত হয়ে জিনা সিদ্ধান্ত নিলো একদিন, পালিয়ে যাবে। পালিয়ে এমন জায়গায় যাবে যেখানে তাকে খুঁজে পাওয়া কষ্ট হবে। কোথায় যাওয়া যায়? অনেক ভেবে বের করলো, বাংলাদেশে যাবে। শুনেছে দেশটি মানুষে ভর্তি। এতো মানুষের ভিড়ে তাকে খুঁজে পেতে নিশ্চয় কষ্ট হবে মায়ের গোয়েন্দাবাহিনীর। আর, তাছাড়া, ঐ দেশটির মানুষগুলোও খুব সহজ-সরল। অপরূপ প্রাকৃতিক শোভার দেশটিতে নদী-নালা, পাহাড়-জঙ্গল সবই আছে। সেখানে গিয়ে তাই মজাই পাবে সে।
যেই ভাবা সেই কাজ। কোন এক অমাবস্যার রাতে বুড়ি মা যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, জিনা তখন পালিয়ে রওনা হয় বাংলাদেশের পথে। সাত সমুদ্র আর তেরো নদী’র উপর দিয়ে রথের ঘোড়াগুলোকে দাপিয়ে উড়ে যেতে থাকে দেশটির দিকে।
১৩
১৮ মন্তব্য