প্রভাষক
১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
শ্রমের মর্যাদা-কোন কাজকে ছোট করে না দেখার মানসিকতা।।
ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং জাতীয় জীবনের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষ সাধনের মূলে যে মূলমন্ত্রটি চিরকাল কাজ করে আসছে, তা হলো শ্রম। মানুষের শারীরিক বা মানসিক প্রচেষ্টাকেই সাধারণ অর্থে শ্রম হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই শ্রমই সভ্যতার চাকা সচল রাখে এবং মানুষকে পশুর স্তর থেকে উন্নততর স্তরে উন্নীত করে। "শ্রমের মর্যাদা" কথাটি দিয়ে মূলত যেকোনো ধরনের সৎ ও ন্যায়সংগত পরিশ্রমকে সম্মান প্রদর্শন করা এবং কোনো কাজকেই ছোট করে না দেখার মানসিকতাকে বোঝানো হয়। মানুষের জীবনের প্রতিটি অর্জনের নেপথ্যে রয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি আর মেধার প্রয়োগ, আর এই সত্যটিকে স্বীকার করে নেওয়া এবং শ্রমজীবীকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়াই হলো শ্রমের মর্যাদার মূল শিক্ষা।
শ্রমের গুরুত্বকে আমরা মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি: শারীরিক শ্রম এবং মানসিক শ্রম। আমাদের সমাজে অনেক সময় একদল মানুষ ভাবেন যে কেবল অফিসের ডেস্কে বসে কাজ করাই বুঝি সম্মানের, আর যারা মাঠে-ঘাটে কাজ করেন বা রাস্তা পরিষ্কার করেন, তাদের কাজ বুঝি নিচু স্তরের। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একজন কৃষক যদি রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে ফসল না ফলান, তবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের টেবিলে অন্ন জুটবে না। আবার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যদি তাদের শ্রম না দিতেন, তবে আমাদের সুন্দর শহরগুলো কিছুদিনের মধ্যেই বসবাসের অযোগ্য ভাগাড়ে পরিণত হতো। তাই প্রতিটি পেশার মানুষই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কোনো কাজকেই তুচ্ছজ্ঞান করা উচিত নয়, কারণ প্রতিটি কাজের মাধ্যমেই দেশ ও জাতির উন্নতি সাধিত হয়।
ঐতিহাসিকভাবে এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে শ্রমের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের সকল মহান ধর্মই মানুষকে পরিশ্রমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং অলসতাকে পাপ বা অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইসলাম ধর্মে মহানবী (সা.) শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিজে হাতে কাজ করাকে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে অন্যান্য ধর্মেও বলা হয়েছে যে, কর্মই হলো আসল ধর্ম। পৃথিবীর যে রাষ্ট্রগুলো আজ উন্নতির শিখরে অবস্থান করছে, যেমন— জাপান, জার্মানি বা আমেরিকা, তাদের সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হলো তারা শারীরিক শ্রমকে ঘৃণা করে না। সেসব দেশে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অবসরে নিজের বাগানে কাজ করেন কিংবা নিজের গাড়ি নিজেই ধুয়ে থাকেন, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য একটি বড় শিক্ষা।
শ্রমের মর্যাদা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নয়, বরং ব্যক্তির চরিত্র গঠনের জন্যও অপরিহার্য। কঠোর পরিশ্রম মানুষের ভেতরে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। যারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকতে চায়, তাদের আত্মসম্মানবোধ কখনো জাগ্রত হয় না। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি নিজের শ্রমে উপার্জিত অর্থে জীবিকা নির্বাহ করে, তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি থাকে। অলস মস্তিষ্ককে শয়তানের কারখানা বলা হয়, কারণ অলসতা মানুষকে অসৎ পথে ধাবিত করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। শ্রম মানুষকে অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখে এবং সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি জাতি বা রাষ্ট্র কতটুকু উন্নত হবে তা নির্ভর করে সেই জাতির মানুষ শ্রমকে কতটা শ্রদ্ধা করে তার ওপর। আমরা যদি মেথর, কৃষক, মুচি কিংবা দিনমজুরকে নিচু চোখে দেখি, তবে আমরা মানসিকভাবে সংকীর্ণ থেকে যাব। শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আজকের আধুনিক বিশ্বে কোনো কাজই ছোট নয়, বরং অলস বসে থাকাই হলো লজ্জার বিষয়।
৫৩
৯১ মন্তব্য