Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৭:৪৮ অপরাহ্ণ

উহুদ যুদ্ধে হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)-এর অসাধারণ বীরত্ব ও ত্যাগ

উহুদ যুদ্ধে হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)-এর অসাধারণ বীরত্ব ও ত্যাগ


হিজরী তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) মদিনার উত্তরে উহুদ পর্বতের পাদদেশে সংঘটিত হয় ইসলামের দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ—উহুদের যুদ্ধ। বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে কুরাইশরা তিন হাজার সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করে। মুসলিম বাহিনী ছিল মাত্র সাতশ’ থেকে এক হাজারের মতো। যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানরা বিজয়ের দিকে এগোচ্ছিলেন। কুরাইশদের পতাকাবাহী একের পর এক নিহত হয়। কিন্তু ধনুকধারীদের একাংশ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করে পাহাড়ের পাদদেশ ছেড়ে চলে আসে। এ সুযোগে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে কুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনী পেছন থেকে আক্রমণ করে। মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। অনেকে পালিয়ে যান। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) চরম বিপদে পড়েন। শত্রুরা তাঁকে ঘিরে ফেলে তীর, পাথর ও তলোয়ারের আঘাত করে। তাঁর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়, দাঁত শহীদ হয়।


এই সংকটময় মুহূর্তে অল্প কয়েকজন সাহাবী রাসূল (সা.)-এর পাশে অটল থাকেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)। তিনি পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.)-কে রক্ষা করেন। শত্রুদের ছোঁড়া তীর, বর্শা ও তলোয়ারের আঘাত নিজের শরীরে গ্রহণ করেন। একবার একটি তীর রাসূল (সা.)-এর দিকে আসলে তিনি নিজের হাত দিয়ে তা রোধ করেন, ফলে তাঁর আঙ্গুল কেটে যায় এবং হাত স্থায়ীভাবে অকেজো (পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হয়ে যায়। বর্ণিত আছে, সেদিন তাঁর শরীরে ৭০ থেকে ৭৫টিরও বেশি আঘাত লাগে—তলোয়ারের কোপ, বর্শার খোঁচা এবং তীরের আঘাত। রক্তে তাঁর সারা শরীর ভেসে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।


হযরত তালহা (রা.) শুধু প্রতিরক্ষাই করেননি, আক্রমণও করেছেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাসূল (সা.) উহুদ পর্বতে উঠতে অক্ষম হলে (দুটি বর্ম পরিহিত থাকায় ভারী হয়ে যান) তিনি নিজের পিঠে রাসূল (সা.)-কে তুলে পাহাড়ে উঠিয়ে দেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “তালহার উপর জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে।”


যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত তালহা (রা.)-এর এই ত্যাগ দেখে বলেন:  

“যে ব্যক্তি পৃথিবীতে একজন জীবন্ত শহীদকে হাঁটতে দেখতে চায়, সে যেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহকে দেখে।”  

(তিরমিযী, হাদিস: ৩৭৩৯; অনুরূপ বর্ণনা বুখারীতে আছে)


হযরত আবু বকর (রা.) উহুদের প্রসঙ্গ উঠলে বলতেন: “সেদিন পুরোটা তালহার দিন ছিল।” (অর্থাৎ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব তালহার)। হযরত ক্বায়স ইবনে আবী হাযিম (রা.) বলেন: “আমি তালহার হাত দেখেছি, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। উহুদের দিন তিনি সেই হাত দিয়েই নবী (সা.)-কে রক্ষা করেছিলেন।” (বুখারী)


হযরত তালহা (রা.)-এর এই অসাধারণ বীরত্বের কারণে তিনি “জীবন্ত শহীদ” (শহীদে হায়্য) উপাধি লাভ করেন। তিনি ছিলেন আশারায়ে মুবাশশারা—যাঁদের জীবদ্দশায়ই জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন, রাসূল (সা.) তাঁকে “তালহাতুল খায়র” (কল্যাণের তালহা) ও “তালহাতুল ফায়্যায” (উদার তালহা) বলে সম্বোধন করতেন।


উহুদের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রকৃত ঈমান ও নবীপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়, বরং প্রয়োজনে জীবন, শরীর ও সবকিছু উৎসর্গ করার নাম। হযরত তালহা (রা.) সেই আদর্শের জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁর ত্যাগ আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুপ্রেরণা। (সূত্র: বুখারী, তিরমিযী, সীরাত গ্রন্থসমূহ যেমন ইবনে হিশাম, তাবাকাত ইবনে সা’দ প্রভৃতি)


#পৃষ্ঠা_৪৯৬৬+

মন্তব্য করুন