প্রভাষক
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:২৩ অপরাহ্ণ
দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা।।
যেকোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হলো তার জনশক্তি। তবে কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যদি সেই জনসংখ্যাকে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা না হয়। বর্তমানের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে, যেখানে প্রযুক্তি এবং শিল্পায়ন প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে প্রথাগত পুথিগত বিদ্যার চেয়ে "কর্মমুখী শিক্ষা" বা কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কেন কর্মমুখী শিক্ষা অপরিহার্য, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।
১. তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়:
সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা মূলত বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করে, যা অনেক সময় বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মমুখী শিক্ষা এই সীমাবদ্ধতা দূর করে। এটি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ শেখানো হয়। যখন একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে যেমন—ইলেক্ট্রনিক্স, গ্রাফিক ডিজাইন, বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পায়, তখন সে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে। এটি তাকে কেবল একজন সনদধারী বেকার হিসেবে নয়, বরং একজন দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলে।
২. বেকারত্ব নিরসন ও স্বনির্ভরতা:
আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। প্রতি বছর হাজার হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভোগেন। এর প্রধান কারণ হলো বাজারে যে ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা সেই চাহিদা মেটাতে পারছে না। কর্মমুখী শিক্ষা গ্রহণ করলে একজন ব্যক্তি কেবল অন্যের অধীনে চাকরির ওপর নির্ভর না করে নিজেই ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন দক্ষ ওয়েল্ডার, দর্জি বা কম্পিউটার প্রোগ্রামার ফ্রিল্যান্সিং বা নিজস্ব উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলা:
বর্তমান বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (Fourth Industrial Revolution) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং অটোমেশনের এই যুগে সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। বিদেশের শ্রমবাজারেও এখন অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ টেকনিশিয়ানদের উচ্চমূল্য দেওয়া হয়। কর্মমুখী শিক্ষা আমাদের তরুণ সমাজকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে, যার ফলে তারা বিদেশে গিয়ে উচ্চ বেতনে কাজ করতে পারে এবং দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স অর্জন করতে সক্ষম হয়।
৪. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিল্পায়ন:
একটি দেশের শিল্পায়নের জন্য প্রচুর পরিমাণে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কল-কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য যদি দক্ষ লোক না থাকে, তবে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন এক শ্রমশক্তি তৈরি করতে পারি যারা দেশীয় শিল্পের চাকা সচল রাখবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, কারণ তারা জানেন যে এখানে কাজ করার জন্য দক্ষ জনবল সহজলভ্য।
৫. জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন:
দক্ষ মানবসম্পদ মানেই উচ্চতর আয়ের সুযোগ। যখন একজন ব্যক্তি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো কাজ পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার আয়ের উৎস বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তার পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়ে। এটি সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
উপসংহার ও কিছু পরামর্শ:
পরিশেষে বলা যায়, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই এবং সেই দক্ষতার ভিত্তি হতে হবে কর্মমুখী শিক্ষা। আমাদের উচিত কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা এবং একে হেয় প্রতিপন্ন না করে বরং মূলধারার শিক্ষার সমান গুরুত্ব দেওয়া।
১
১ মন্তব্য