প্রভাষক
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ
সৃজনশীল - নিজস্ব মেধা ও চিন্তাশক্তির প্রয়োগ করতে সাহায্য করে।।
সৃজনশীল প্রশ্ন" বা Creative Questions আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার এমন একটি অনন্য পদ্ধতি, যা শিক্ষার্থীর মুখস্থ করার প্রবণতাকে কমিয়ে তার নিজস্ব মেধা, চিন্তাশক্তি এবং প্রয়োগ ক্ষমতাকে যাচাই করতে সাহায্য করে। আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী হন যিনি এই পদ্ধতিতে ভালো নম্বর পেতে চান, অথবা একজন শিক্ষক হন যিনি মানসম্মত প্রশ্ন তৈরি করতে আগ্রহী, তবে সৃজনশীল পদ্ধতির গভীরে প্রবেশ করা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে দেখার সক্ষমতা অর্জন করা।
নিচে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির গঠন, এর বিভিন্ন স্তর এবং এই পদ্ধতিতে ভালো করার কৌশলগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. সৃজনশীল প্রশ্নের গঠন কাঠামো
একটি পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল প্রশ্ন সাধারণত একটি উদ্দীপক (Stem) এবং চারটি উপ-প্রশ্নের সমন্বয়ে গঠিত হয়। উদ্দীপকটি হতে পারে কোনো অনুচ্ছেদ, কবিতাংশ, ছবি, ছক বা চিত্র যা পাঠ্যবইয়ের কোনো বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিন্তু হুবহু বই থেকে তুলে দেওয়া নয়। এই উদ্দীপকের ওপর ভিত্তি করেই নিচের চারটি প্রশ্ন সাজানো হয়:
ক) জ্ঞানমূলক প্রশ্ন (Knowledge-based): এটি সরাসরি স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই প্রশ্নের উত্তর পাঠ্যবইয়ের কোনো তথ্য বা সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এর জন্য বরাদ্দ থাকে ১ নম্বর। যেমন: "মুক্তিযুদ্ধ কত সালে হয়েছিল?" বা "কোষ কাকে বলে?" এর উত্তর সাধারণত এক কথায় বা এক বাক্যে দিতে হয়।
খ) অনুধাবনমূলক প্রশ্ন (Comprehension-based): এখানে শিক্ষার্থীকে কোনো একটি বিষয় বুঝতে পারার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে হয়। এটি সাধারণত "কেন" বা "কী বোঝায়" জাতীয় প্রশ্ন হয়ে থাকে। এর মান ২ নম্বর। উত্তরের প্রথম অংশে জ্ঞানমূলক তথ্য এবং দ্বিতীয় অংশে সেটির ব্যাখ্যা প্রদান করতে হয়।
গ) প্রয়োগমূলক প্রশ্ন (Application-based): এটি সৃজনশীল পদ্ধতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে উদ্দীপকের পরিস্থিতির সাথে পাঠ্যবইয়ের অর্জিত জ্ঞানের তুলনা বা মিল খুঁজে বের করতে হয়। এর মান ৩ নম্বর। উত্তরটি তিনটি প্যারায় লেখা আদর্শ—প্রথম প্যারায় জ্ঞান, দ্বিতীয় প্যারায় অনুধাবন বা বইয়ের তথ্য এবং তৃতীয় প্যারায় উদ্দীপকের সাথে তার সমন্বয়।
ঘ) উচ্চতর চিন্তনদক্ষতা (Higher Order Thinking): এটি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ যেখানে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণ ক্ষমতা, মূল্যায়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা যাচাই করা হয়। এর মান ৪ নম্বর। এখানে কোনো একটি মন্তব্য বা পরিস্থিতির যৌক্তিকতা যাচাই করতে বলা হয়। উত্তরটি চারটি প্যারায় লিখলে ভালো নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
২. সৃজনশীল পদ্ধতিতে ভালো করার কার্যকর কৌশল
সৃজনশীল পদ্ধতিতে মুখস্থ বিদ্যার সুযোগ কম থাকায় কিছু বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন:
মূল পাঠ্যবই (Textbook) আয়ত্ত করা: উদ্দীপক যাই হোক না কেন, তার মূল ভিত্তি কিন্তু পাঠ্যবই। তাই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় খুব গভীরভাবে পড়তে হবে যাতে যেকোনো উদ্দীপক পড়েই আপনি বুঝতে পারেন এটি কোন অধ্যায় বা কোন বিষয় থেকে নেওয়া হয়েছে।
উদ্দীপকটি মনোযোগ দিয়ে পড়া: তাড়াহুড়ো করে প্রশ্ন পড়া শুরু করবেন না। উদ্দীপকের প্রতিটি লাইন বিশ্লেষণ করুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন সেখানে কোন সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্যারা করে উত্তর লেখা: উত্তরের মানোন্নয়নের জন্য প্রতিটি প্রশ্নের চাহিদামতো প্যারা ব্যবহার করুন। বিশেষ করে গ এবং ঘ নম্বর প্রশ্নের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্যারা আপনার উত্তরকে স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন করে তোলে।
সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা: একটি সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য সাধারণত ২০-২২ মিনিট সময় পাওয়া যায়। ঘড়ি ধরে প্রতিটি অংশের জন্য সময় বণ্টন করে নিন যাতে শেষ পর্যন্ত কোনো প্রশ্ন বাদ না পড়ে।
৩. শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও মজার তথ্য
সৃজনশীল পদ্ধতি প্রথম প্রবর্তিত হয়েছিল বিখ্যাত শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুমের (Benjamin Bloom) 'Taxonomy of Educational Objectives' বা শিখনফল তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে। এটি শিক্ষার্থীকে কেবল তথ্য জমা রাখার "ব্যাংক" হিসেবে বিবেচনা না করে তাকে একজন "চিন্তাবিদ" হিসেবে গড়ে তোলে। মজার বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে কোনো উত্তরই প্রয়োগমূলক স্তর (Application-based): এই অংশটি উদ্দীপকের সাথে সম্পর্কিত। এখানে শিক্ষার্থী তার পাঠ্যবই থেকে অর্জিত জ্ঞানকে উদ্দীপকে বর্ণিত কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে দেখে বা প্রয়োগ করে। এটি শিক্ষার্থীকে শেখায় কীভাবে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব বা কাল্পনিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করতে হয়। এখানে শিক্ষার্থীকে উদ্দীপক এবং পাঠ্যবইয়ের মেলবন্ধন ঘটাতে হয়।
৪. উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা (Higher Order Thinking/Evaluation): এটি সৃজনশীল প্রশ্নের সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে শিক্ষার্থীকে প্রদত্ত উদ্দীপকটি বিশ্লেষণ করতে হয়, বিচার-বিবেচনা করতে হয় এবং কোনো বিষয়ে নিজস্ব মতামত বা সিদ্ধান্ত দিতে হয়। এটি শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করার ক্ষমতা এবং সৃজনশীলভাবে কোনো বিষয়ের ভবিষ্যৎ ফলাফল বা গুরুত্ব অনুধাবন করার ক্ষমতা যাচাই করে।
সৃজনশীল পদ্ধতিতে ভালো করার জন্য কেবল পাঠ্যবইয়ের লাইন মুখস্থ করা যথেষ্ট নয়, বরং মূল বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের উচিত নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গভীর পড়াশোনা করা এবং উদ্দীপক পড়ে দ্রুত তার মূলভাব বোঝার চর্চা করা। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এই পদ্ধতি চালুর মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যারা কেবল তথ্য জানবে না বরং তথ্যের ব্যবহার জানবে।
৫৩
৯১ মন্তব্য