Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৯:৫৩ অপরাহ্ণ

উত্তরপত্র মূল্যায়ন: একজন শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি

উত্তরপত্র মূল্যায়ন: একজন শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি


মোঃ মাইনুল ইসলাম সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি)

একজন শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উত্তরপত্র মূল্যায়নের দক্ষতা সঠিক ন্যায়সংগত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা অগ্রগতি নিরূপণ করা যায়। তাই উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় শিক্ষককে কিছু নির্দিষ্ট দিক অনুসরণ করতে হয় এবং কিছু দিক অবশ্যই পরিহার করতে হয়।

 

প্রথমত, উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় শিক্ষককে নিরপেক্ষতা ন্যায্যতা বজায় রাখতে হবে। শিক্ষার্থীর নাম, পরিচয়, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান বা পূর্ববর্তী ফলাফলের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে শুধুমাত্র উত্তরের মানের ভিত্তিতে নম্বর দিতে হবে। প্রশ্নের উদ্দেশ্য পাঠ্যক্রম অনুযায়ী উত্তর দেওয়া হয়েছে কি না তা বিচার করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নির্ধারিত মার্কিং স্কিম বা রুব্রিক অনুসরণ করে মূল্যায়ন করলে একাধিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সমতা বজায় থাকে।

 

দ্বিতীয়ত, শিক্ষককে ইতিবাচক মূল্যায়ন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ভুল খোঁজার প্রবণতা নয়, বরং শিক্ষার্থীর সঠিক ধারণা, যুক্তি বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আংশিকভাবে সঠিক উত্তরের জন্য আংশিক নম্বর দেওয়া উচিত। ভাষা বা বানানের ছোটখাটো ত্রুটির জন্য অযথা নম্বর কাটা উচিত নয়, বিশেষত যখন বিষয়বস্তুর ধারণা স্পষ্ট থাকে। সম্ভব হলে উত্তরপত্রে সংক্ষিপ্ত গঠনমূলক মন্তব্য দিলে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ পায়।

 

উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে   ইতিবাচক দিক

·         নিরপেক্ষভাবে খাতা মূল্যায়ন করা

·         ন্যায়সংগতভাবে নম্বর প্রদান

·         পাঠ্যক্রম সিলেবাস অনুযায়ী মূল্যায়ন

·         প্রশ্নের উদ্দেশ্য অনুযায়ী উত্তর বিচার

·         নির্ধারিত মার্কিং স্কিম অনুসরণ

·         সকল খাতায় একই মানদণ্ড প্রয়োগ

·         ইতিবাচক মূল্যায়ন পদ্ধতি অবলম্বন

·         আংশিক সঠিক উত্তরের জন্য আংশিক নম্বর প্রদান

·         শিক্ষার্থীর বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দেওয়া

·         বিশ্লেষণ যুক্তিভিত্তিক উত্তরের মূল্যায়ন

·         সৃজনশীল চিন্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া

·         উপস্থাপনার গঠন ধারাবাহিকতা দেখা

·         পরিষ্কার ভাব প্রকাশকে গুরুত্ব দেওয়া

·         বিষয়বস্তুর যথার্থতা যাচাই

·         প্রাসঙ্গিক উদাহরণ ব্যবহারে নম্বর প্রদান

·         ভাষাগত দুর্বলতায় সহনশীলতা

·         বানানের ছোট ভুলে অতিরিক্ত নম্বর না কাটা

·         গঠনমূলক মন্তব্য প্রদান

·         শিক্ষার্থীর উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি

·         সময় নিয়ে মনোযোগসহ মূল্যায়ন

·         খাতা মূল্যায়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা

·         পক্ষপাতমুক্ত মনোভাব

·         আত্মসংযম পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা

·         শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়তা

·         মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন

 

উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে  নেতিবাচক দিক (পরিহারযোগ্য)

·         ব্যক্তিগত পক্ষপাত দেখানো

·         শিক্ষার্থীর নাম বা পরিচয়ে প্রভাবিত হওয়া

·         পূর্বধারণার ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া

·         অতিরিক্ত কঠোরভাবে খাতা দেখা

·         অতিরিক্ত নমনীয় হয়ে নম্বর দেওয়া

·         হ্যালো এফেক্টে আক্রান্ত হওয়া

·         প্রথম উত্তরের ভিত্তিতে পুরো খাতা বিচার

·         তাড়াহুড়ো করে খাতা মূল্যায়ন

·         মনোযোগহীনভাবে উত্তর পড়া

·         মার্কিং স্কিম অনুসরণ না করা

·         একই উত্তরে ভিন্ন নম্বর প্রদান

·         শুধু ভুল খোঁজার প্রবণতা

·         আংশিক সঠিক উত্তরে নম্বর না দেওয়া

·         ভাষা বা হাতের লেখার প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা

·         বানানের ছোট ভুলে বেশি নম্বর কাটা

·         ব্যক্তিগত রাগ বা বিরক্তির প্রভাব

·         অস্পষ্ট যুক্তিহীন নম্বর প্রদান

·         গঠনমূলক মন্তব্য না করা

·         শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা উপেক্ষা করা

·         সময়ের চাপকে প্রাধান্য দেওয়া

·         দায়িত্বহীনভাবে খাতা দেখা

·         বিষয়বস্তুর পরিবর্তে উপস্থাপনার উপর অতিরিক্ত জোর

·         শিক্ষার্থীর মনোবল ভেঙে দেয় এমন মন্তব্য

·         মূল্যায়নে অসামঞ্জস্যতা

·         পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন

 

উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় যে দিকগুলো অনুসরণ করা উচিত

·         নিরপেক্ষতা ন্যায্যতা

·         শিক্ষার্থীর নাম, লিঙ্গ, ব্যক্তিগত পরিচয় প্রভাব ফেলবে না।

·         শুধুমাত্র উত্তরের মানের ভিত্তিতে নম্বর দিতে হবে।

·         পাঠ্যক্রম প্রশ্নের লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যায়ন

·         উত্তরটি প্রশ্নের চাহিদা পূরণ করেছে কি না তা দেখতে হবে।

·         মুখস্থ নয়, বোঝাপড়া বিশ্লেষণ ক্ষমতা মূল্যায়ন করা জরুরি।

·         নির্ধারিত মার্কিং স্কিম/রুব্রিক অনুসরণ

·         আগে থেকে নির্ধারিত উত্তর কাঠামো নম্বর বণ্টন মেনে চলা।

·         সব খাতায় একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা।

·         ইতিবাচক মূল্যায়ন (Positive marking)

·         ভুল খোঁজার চেয়ে সঠিক অংশকে গুরুত্ব দেওয়া।

·         আংশিক সঠিক উত্তরের জন্য আংশিক নম্বর দেওয়া।

·         ভাষা উপস্থাপনার প্রতি সহনশীলতা

·         বানান বা ভাষাগত দুর্বলতার জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে নম্বর কাটা নয় (যদি বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষায় হয়)

·         ভাব প্রকাশ পরিষ্কার হলে সেটাকে মূল্য দিতে হবে।

·         গঠনমূলক মন্তব্য

·         সম্ভব হলে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য বা দিকনির্দেশনা দেওয়া।

·         যাতে শিক্ষার্থী নিজের ভুল বুঝতে পারে।

 

অন্যদিকে, উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় কিছু দিক অবশ্যই পরিহার করতে হবে। ব্যক্তিগত পক্ষপাত, অতিরিক্ত কঠোরতা বা অতিরিক্ত নমনীয়তা মূল্যায়নের গুণমান নষ্ট করে। অনেক সময় প্রথম দিকের উত্তর ভালো বা খারাপ হওয়ার কারণে পুরো খাতাকে একই চোখে দেখা হয়একে হ্যালো এফেক্ট বলা হয়, যা পরিহার করা জরুরি। তাড়াহুড়ো করে বা মনোযোগ না দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করলে ভুল নম্বর প্রদানের সম্ভাবনা থাকে। একই ধরনের উত্তরে ভিন্ন ভিন্ন নম্বর দেওয়াও অনুচিত।

·         উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় যে দিকগুলো পরিহার করা উচিত

·         ব্যক্তিগত পক্ষপাত

·         পছন্দঅপছন্দ, পূর্বধারণা বা ছাত্রের পূর্ব ফলাফলের প্রভাব।

·         হ্যালো এফেক্ট

·         প্রথম দিকের উত্তর ভালো/খারাপ হওয়ায় পুরো খাতাকে সেইভাবে দেখা।

 

অতিরিক্ত কঠোরতা বা অতিরিক্ত নমনীয়তা

·         সবাইকে খুব কম বা খুব বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা।

·         তাড়াহুড়ো করে মূল্যায়ন

·         সময়ের অভাবে খাতা ঠিকভাবে না পড়ে নম্বর দেওয়া।

·         অস্পষ্ট বা অসংগত নম্বর প্রদান

·         একই ধরনের উত্তরে ভিন্ন ভিন্ন নম্বর দেওয়া।

·         ভাষা বা হাতের লেখার প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা

·         খারাপ হাতের লেখা মানেই খারাপ উত্তরএই ধারণা ভুল।

           সবশেষে বলা যায়, একজন দক্ষ শিক্ষক ন্যায়সংগত, উদ্দেশ্যভিত্তিক শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার অগ্রগতি নিরূপণ করা সম্ভব হয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নত হয়।


 

মন্তব্য করুন