Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ

মুসলিম পরিকল্পনা যুদ্ধের দিন

মুসলিম পরিকল্পনা

আর স্মরণ করো, আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেন যে দুই দলের এক দল তোমাদের আয়ত্তে আসবে। অথচ তোমরা চাইছিলে যে নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তে আসুক, আর আল্লাহ চাইছিলেন সত্যকে তার বাণী দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং অবিশ্বাসীদেরকে নির্মূল করতে।

কুরআন: সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭

মুসলিমরা মক্কার বাহিনীর অগ্রযাত্রার খবর পায়। মুসলিম বাহিনীটি মূলত কাফেলা আক্রমণের জন্য গঠিত হয়েছিল, ব্যাপক যুদ্ধের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। মুসলিমরা এসময় কুরাইশদের মুখোমুখি না হয়ে ফিরে যেতে পারত কিন্তু এর ফলে কুরাইশদের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেত এবং তারা অগ্রসর হয়ে মদিনা আক্রমণ করতে পারত। অন্যদিকে বাহিনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মদিনার আনসাররা আকাবার বাইয়াত অনুযায়ী মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য ছিল না এবং অভিযানের ব্যয়ভার তাদের উপর বেশি ছিল। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য মুহাম্মাদ যুদ্ধসভার আহ্বান করেন। সভায় মুহাজির, আনসার সকলেই কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে মত দেয়। এরপর মুসলিমরা অগ্রসর হয়ে বদরের নিকটে পৌছায়।[]

এখানে পৌছার পর মুহাম্মাদ ও আবু বকর প্রতিপক্ষের খবর সংগ্রহের জন্য বের হন। এসময় এক বৃদ্ধ লোককে তারা দেখতে পান। মুহাম্মাদ তাকে মুসলিম ও কুরাইশ উভয় বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। ঐ ব্যক্তি দুই বাহিনী সম্পর্কেই সঠিক তথ্য দেয়। সেদিন সন্ধ্যায় আলি ইবনে আবি তালিবযুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করা হয়। তারা বদরের কূয়ায় দুইজন পানি সংগ্রহরত ব্যক্তিকে বন্দী করেন। জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা জানায় যে তারা মক্কার বাহিনীর সদস্য এবং বাহিনীর জন্য পানি সংগ্রহ করছিল। মুহাম্মাদ এসময় নামাজরত ছিলেন। উপস্থিত মুসলিমরা তার কথার সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিল। তাই তারা তাদের মারধর করে পুনরায় একই প্রশ্ন করে। এরপর তারা জবাব দেয় যে তারা কুরাইশ বাহিনীর নয় বরং আবু সুফিয়ানের কাফেলার লোক।[]

একথা জানতে পেরে মুহাম্মাদ ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন যে তারা সত্যই বলছিল অথচ এরপরও তাদের মারধর করা হয়েছে। এরপর তিনি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা উপত্যকার শেষ প্রান্তের টিলা দেখিয়ে বলে যে কুরাইশরা তার পেছনে অবস্থান করছে এবং প্রতিদিন নয় বা দশটি উট তাদের জন্য জবাই করা হয়। একথা শোনার পর মুহাম্মাদ বলেন যে তাদের সংখ্যা ৯০০ থেকে ১,০০০ হবে। এরপর বন্দীরা বাহিনীতে আগত সম্ভ্রান্ত কুরাইশ নেতাদের নাম বলে।[]

মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলিকে তোমাদের পাশে এনে নিক্ষেপ করেছে

মক্কার নেতাদের নাম শোনার পর মুহাম্মাদ এর মন্তব্য[]

প্রতিপক্ষে পূর্বে বদরে পৌছানোর জন্য মুহাম্মাদ দ্রুত বদরের দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তার লক্ষ্য ছিল যাতে কুরাইশরা কূয়ার দখল নিতে না পারে। রাতে মুসলিমরা বদরের নিকট থামে। এসময় হুবাব ইবনে মুনজির বলেন যে এটি যদি আল্লাহর নির্দেশ হয় তবে তা যেন বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু যদি মুহাম্মাদ কৌশল হিসেবে এখানে থেমে থাকেন তবে তার মত হল যাতে এখানে অবস্থান না করে কুরাইশদের সবচেয়ে নিকটের কূয়ার কাছে অবস্থান নিয়ে বাকি সব কূপ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং নিজেদের কূয়ার উপর চৌবাচ্চা তৈরী করে তাতে পানি জমা করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা পানি পেলেও কুরাইশরা পানি থেকে বঞ্চিত হবে। একথা শোনার পর মুহাম্মাদ পরামর্শ মেনে নিয়ে নির্দেশ দেন যাতে রাত অর্ধেক পার হওয়ার পূর্বেই কুরাইশদের সবচেয়ে নিকটের কূয়ার কাছে গিয়ে শিবির স্থাপন করা হয়। এরপর সেখানে পৌছে চৌবাচ্চা তৈরী করে অবশিষ্ট সব কূপ বন্ধ করে দেয়া হয়।

মুসলিমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কূয়া দখল করার পর সাদ ইবনে মুয়াজের পরামর্শক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তরপূর্বের টিলার উপর মুহাম্মাদের জন্য একটি তাবু নির্মিত হয়। এখান থেকে যুদ্ধের পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেত।[]

যুদ্ধের দিন

হে আল্লাহ, তুমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ তা পূর্ণ করো। হে আল্লাহ, আমি তোমার ওয়াদার পূর্ণতা কামনা করছি।

যুদ্ধ শুরুর সময় মুহাম্মাদ এর মুনাজাত[]

যুদ্ধের দিন কুরাইশরা শিবির ভেঙে বদরের দিকে রওয়ানা হয়। বদরে পৌছে তারা উমাইর ইবনে ওয়াহাবকে মুসলিমদের খবর সংগ্রহের জন্য পাঠায়। উমাইর এসে জানান যে মুসলিমদের বাহিনী ছোট এবং সাহায্যের জন্য নতুন সেনাদল আসার সম্ভাবনাও নেই।[][১৩] তবে তিনি একইসাথে বলেন তারা সুবিন্যস্তভাবে যুদ্ধের জন্য তৈরী হয়ে আছে এবং তারা কুরাইশদের বিশেষ লোকদেরকে হত্যা করে ফেলতে পারে। এভাবে তিনি কুরাইশদের পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করেন।[][১৪] আরব যুদ্ধে হতাহতের পরিমাণ বেশি হত না তাই একথা শোনার ফলে কুরাইশদের মনোবল হ্রাস পায়। তারা পুনরায় তর্কে জড়িয়ে পড়ে।

কুরাইশদের অন্যতম নেতা হাকিম ইবনে হিজাম আরেক নেতা উতবা ইবনে রাবিয়াকে ফিরে যেতে অনুরোধ জানায়। জবাবে উতবা বলেন যে তিনি ফিরে যেতে রাজি আছেন এবং নাখলায় নিহত আমর ইবনে হাদরামির রক্তপণ পরিশোধ করতেও তিনি রাজি। কিন্তু আবু জাহল রাজি নয় বলে তিনি হাকিমকে বলেন যাতে তাকে রাজি করানো হয়। এরপর উতবা উপস্থিত কুরাইশদের উদ্দেশ্য বলেন যে এই যুদ্ধে তাদের হাতে হয়ত নিজেদের ভাইয়েরাই নিহত হবে তাই যুদ্ধে বিজয়ী হলেও নিহতদের লাশ দেখতে তারা পছন্দ করবে না এবং তারা আত্মীয় হত্যাকারী হিসেবে পরিচিত হবে। তাই তার পরামর্শ ছিল যাতে কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যায় এবং মুহাম্মাদ কে অন্য আরব গোত্রসমূহের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। যদি তারা তাকে হত্যা করে তবে কুরাইশদের উদ্দেশ্যও সফল হবে এবং এর ফলে মুহাম্মদ এর কাছে তারা নির্দোষ থাকবে।[][]

হাকিম ইবনে হিজাম এসময় আবু জাহলের কাছে গিয়ে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু জাহল কঠোরভাবে বলেন যে যুদ্ধ না করে তিনি ফিরে যাবেন না।[][১৫] সেসাথে উতবার ফিরে যাওয়ার পরামর্শকে ধিক্কার দিয়ে অভিযোগ করেন যে উতবার ছেলে মুসলিমদের দলে রয়েছে বলে উতবা ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। উল্লেখ্য, উতবার ছেলে আবু হুজাইফা ইবনে উতবা ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক যুগে মুসলিম হয়েছিলেন। হাকিমের কাছে এ কথা জানতে পেরে উতবাযুদ্ধের বিব্রত হন এবং বলেন যে তিনি কাপুরুষ নন এবং মুহাম্মাদ এর সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়া না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবেন না ঘোষণা করেন। অন্যদিকে আবু জাহল নাখলায় নিহত আমরের ভাই আমির ইবনে হাদরামির কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে উতবা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যেতে চায় তাই তার ভাইয়ের মৃত্যুর বদলা নেয়া সম্ভব হবে না। একথা শোনার পর আমির সারা শরীরে ধূলো মেখে কাপড় ছিড়তে ছিড়তে নিহত ভাইয়ের জন্য মাতম করতে থাকে। এসবের ফলে যুদ্ধ বন্ধের জন্য হাকিমের সব তৎপরতা ব্যর্থ হয়।[]

250px-Balami_-_Tarikhnama_-_The_Battle_of_Badr_-_The_death_of_Abu_Jahl%2C_and_the_casting_of_the_Meccan_dead_into_dry_wells_%28cropped%29.jpgআবু জাহলের মৃত্যু এবং মক্কার মৃতদের লাশ কূয়ায় নিক্ষেপ। মুহাম্মদ বালামির তারিখনামার চিত্র

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে কুরাইশদের আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখজুমি এগিয়ে এসে মুসলিমদের পানির জলাধার দখল করে নেবে নাহয় এজন্য জীবন দেবে বলে ঘোষণা দেয়। এরপর হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব অগ্রসর হয়ে তার সাথে লড়াই করেন। লড়াইয়ে আসওয়াদের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থা আসওয়াদ চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য চৌবাচ্চার সীমানার ভেতর ঢুকে পড়ে। এরপর হামজা তাকে হত্যা করেন। এটি ছিল বদরের প্রথম মৃত্যু।[][]

এরপর তৎকালীন রীতি অনুযায়ী দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে লড়াই শুরু হয়। কুরাইশদের মধ্য থেকে উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া ও ওয়ালিদ ইবনে উতবা লড়াইয়ের জন্য অগ্রসর হন। তাদের লড়াইয়ের আহ্বান শুনে আনসারদের মধ্য থেকে আউফ ইবনে হারিস, মুয়াবিজ ইবনে হারিস ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে আসেন। কিন্তু কুরাইশ যোদ্ধারা তাদেরকে কটাক্ষ করে বলেন যে তারা তাদের যোগ্য না এবং যেন কুরাইশদের সমশ্রেণীর কাউকে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এরপর তাদের বদলে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবউবাইদা ইবনে হারিস ও আলি ইবনে আবি তালিবকে পাঠানো হয়। হামজার সাথে উতবা, আলির সাথে ওয়ালিদ ও উবাইদার সাথে শাইবা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। কুরাইশ পক্ষের তিনজনই লড়াইয়ে নিহত হয়। লড়াইয়ে উবাইদা আহত হন তাই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। যুদ্ধের কয়েকদিন পর তার মৃত্যু হয়।[] তিনজন নেতৃস্থানীয় যোদ্ধার মৃত্যুর ফলে কুরাইশদের মনোবলে ফাটল ধরে।

দ্বন্দ্বযুদ্ধের পর কুরাইশরা মুসলিমদের উপর আক্রমণ শুরু করে। যুদ্ধের পূর্বে মুহাম্মাদ নির্দেশ দেন শত্রুরা বেশি সংখ্যায় কাছে এলেই যাতে তীর চালানো হয়। মুসলিমরা "ইয়া মানসুর আমিত" স্লোগান দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। যুদ্ধে মক্কার কুরাইশরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুয়াজ ইবনে আমর ও মুয়াজ ইবনে আফরা কুরাইশ পক্ষের সর্বাধিনায়ক আবু জাহলকে হত্যা করেন। বিলালের হাতে তার সাবেক মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ নিহত হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব তার মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে হত্যা করেন।[] বিকেলের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়।[১৬] কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে এই যুদ্ধে হাজারো ফেরেশতা মুসলিমদের সহায়তার জন্য এসেছিল।[][১৭][১৮]

স্মরণ কর,যখন তুমি মু’মিনদেরকে বলছিলে, ‘তোমাদের জন্য কি এটা যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক তিন সহস্র ফেরেশতা অবতরণপূর্বক তোমাদের সাহায্য করবেন?’ -সূরাঃ আলে-ইমরান আয়াতঃ 124 [১৯]

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নিহত মুসলিমদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে দাফন করা হয়। নিহত কুরাইশদের লাশ ময়দানের একটি কূয়ায় নিক্ষেপ করা হয়। এসময় চব্বিশজন প্রধান কুরাইশ নেতার লাশ কূয়ায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আরবের রীতি অনুযায়ী মুসলিমরা তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করার পর মদিনায় ফিরে আসে।[]

মন্তব্য করুন

ব্লগ