প্রভাষক
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০১ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
ডিজিটাল শিক্ষা: আশীর্বাদ না নতুন বৈষম্য?
একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী পরিবর্তনের নাম- ডিজিটাল শিক্ষা। ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে শিক্ষা এখন আর কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ডিজিটাল শিক্ষাকে ভবিষ্যতের শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ডিজিটাল শিক্ষা কি সত্যিই সবার জন্য আশীর্বাদ, নাকি এটি নতুন এক বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে?
ডিজিটাল শিক্ষার বৈশ্বিক অগ্রযাত্রা:
বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির সময় ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবহার অভূতপূর্বভাবে বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম এবং ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, মহামারির সময় প্রায় ১৬০ কোটির বেশি শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক অবকাঠামো থাকলে ডিজিটাল শিক্ষা শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।
আশীর্বাদ হিসেবে ডিজিটাল শিক্ষা:
ডিজিটাল শিক্ষার সবচেয়ে বড় বল হলো- সহজলভ্যতা। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে একজন শিক্ষার্থী হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড কিংবা এমআইটির কোর্সে অংশ নিতে পারে।
এ ছাড়া—
i. সময় ও স্থানের বাধা কমে যায়
ii. ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সুযোগ তৈরি হয়
iii. জীবনব্যাপী শিক্ষার (Deep rooted Learning) পথ উন্মুক্ত হয়
iv. প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
উন্নত দেশগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নতুন বৈষম্যের বাস্তবতা:
তবে উন্নত বিশ্বের এই সুবিধা কি সমানভাবে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো পাচ্ছে? এখানেই বৈষম্যের প্রশ্নটি সামনে আসে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখনও বিশ্বের প্রায় ৩০% মানুষ নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু অঞ্চলে—
i. ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল
ii. স্মার্ট ডিভাইসের অভাব
iii. ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি
iv. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা
এই বাস্তবতায় ডিজিটাল শিক্ষা অনেক সময় সুবিধাভোগী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষকের ভূমিকা ও প্রশিক্ষণের সংকট:
আন্তর্জাতিক পরিসরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো - শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রস্তুতি। উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক শিক্ষক এখনও ডিজিটাল পেডাগজিতে দক্ষ নন। ফলে প্রযুক্তি থাকলেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সমাধানের পথ ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা:
ডিজিটাল শিক্ষা যেন বৈষম্যের হাতিয়ার না হয়ে সমতার সেতু হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া জরুরি—
i. সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করা
ii. দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ডিভাইস সহায়তা
iii. শিক্ষকদের নিয়মিত ডিজিটাল প্রশিক্ষণ
iv. স্থানীয় ভাষাভিত্তিক কনটেন্ট উন্নয়ন
v. সরকারি-বেসরকারি-আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা।
ইউনেস্কোর “Education for All” ও জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG-4) বাস্তবায়নে ডিজিটাল শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার:
ডিজিটাল শিক্ষা নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর -অসম বণ্টন। সঠিক পরিকল্পনা, নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে ডিজিটাল শিক্ষা হতে পারে মানবজাতির জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। অন্যথায়, এটি শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন এক বৈশ্বিক বৈষম্যের জন্ম দেবে।
অতএব, প্রশ্নটি শুধু “ডিজিটাল শিক্ষা আশীর্বাদ না বৈষম্য?” নয়—প্রশ্নটি হলো, আমরা এটিকে - কীভাবে ব্যবহার করছি এবং কাদের জন্য ব্যবহার করছি।
৭
৭ মন্তব্য