সহকারী শিক্ষক
০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৯:২৫ অপরাহ্ণ
"দুর্নীতির শেকড় রাষ্ট্রের অক্ষমতায়"
"দুর্নীতির শেকড় রাষ্ট্রের অক্ষমতায়"
বাংলাদেশে দুর্নীতিকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নৈতিক স্খলন বা অসৎ চরিত্রের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। তবে বাস্তবতার নিরিখে এটির প্রধানতম উৎপত্তি স্থল রাষ্ট্রীয় অকার্যকরতা ও নীতিগত সংকটে। একদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাব, অন্যদিকে নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এই সমস্যার গভীরতর কারণ।
রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের সুশিক্ষা, সুচিকিৎসা, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক মর্যাদার নিরাপত্তা ও নিষ্কণ্টক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা প্রদানে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা নিজ নিজ নিরাপত্তার জন্য বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এই বিকল্পের নাম অর্থ। সম্পদশালীরা এখানে সকল ক্ষেত্রে নিরাপদ। ফলে অর্থ-সম্পদ হয়ে ওঠে সামাজিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মূল বর্ম। আর এই অর্থ-সম্পদ সংগ্রহের চেষ্টাই ধীরে ধীরে দুর্নীতিকে একটি কাঠামোবদ্ধ বাস্তবতায় পরিণত করেছে।
একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো— নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার ও সামাজিক মর্যাদার সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিকদের এই মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র প্রায়শই ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার ফলে নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে বিকল্প উপায়ে নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।
একজন নাগরিক তার সন্তানকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন মানসম্মত ও সন্তোষজনক শিক্ষা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট স্কুল, কলেজ বা কোচিং-এ অধিক অর্থ ব্যয় করার কথা চিন্তা করে। একইভাবে, রাষ্ট্র সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা দিতে না পারলে নাগরিককে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। তদুপরি, যখন ন্যায়বিচার আইনের আশ্রয়ে পাওয়া যায় না, তখন সে প্রভাব, পরিচিতি কিংবা অর্থবলের মাধ্যমে সুবিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা চালায়।
এই সমস্ত পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র নাগরিককে সুশিক্ষা, সুচিকিৎসা, আইনি সুরক্ষা এবং সামাজিক ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। এর বিপরীতে সমাজের ধনী ব্যক্তিরা অর্থবলের মাধ্যমে সব ধরনের নিরাপত্তা ও সুবিধা ভোগ করছে। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প হিসাবে অর্থ-বিত্তকেই প্রধান ভরসা হিসেবে আবিষ্কার করছে।
অতএব, অতিরিক্ত অর্থ-সম্পদ অর্জনের তাগিদে অনেকেই অসৎ ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়াতে দ্বিধা করছে না। এ ক্ষেত্রে দোষ ব্যক্তির নয়; বরং এটি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা প্রদান করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সৃষ্ট এক ধরনের ‘আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া’।
বাংলাদেশে দুর্নীতি যেন এখন একটি প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে— কে কত বেশি সম্পদ তথা ক্ষমতা বা প্রভাব অর্জন করতে পারে। দুর্নীতির উদ্দেশ্য এখন আর কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়; বরং এটি সামাজিক নিরাপত্তা-শৃঙ্খলে ‘উঁচু’ অবস্থানে থাকার প্রতিযোগিতা। একারনেই বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমে না।
বর্তমানে দুর্নীতিই যেন নীতি। যে দুর্নীতি বোঝে না সে আজকাল অচল। মানুষ অর্থ উপার্জনের জন্য যে-কোনো উপায় গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। পাশাপাশি সমাজে যে-সব ব্যক্তি এই বিকল্প পথ অবলম্বন করে সাফল্য পাচ্ছে, তারা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনা নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন করে তুলেছে। এভাবে, দুর্নীতি একটি সামাজিক বাধ্যবাধকতায় রূপ নিয়েছে। ফলে, দুর্নীতি সাধারণের মনে একটি ‘বাস্তবসম্মত বিকল্প’ হিসেবে গেঁথে বসে গেছে। এখন এটি অনেকাংশেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণে পরিণত হয়েছে।
দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সুশাসনের অভাবই দুর্নীতির প্রধান অনুঘটক। সুশাসনের অভাবে যখন আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, তখন জনগণ একটি “বিকল্প নিরাপত্তা অর্থনীতি”-তে প্রবেশ করে, যার মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে অবৈধ অর্থপ্রবাহ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। এটি কেবল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোকেও প্রতিনিয়ত ক্ষয়িষ্ণু করে তুলছে। তাই এ থেকে আশু পরিত্রাণ অত্যাবশ্যক।
দুর্নীতি যদিও একটি নৈতিক ব্যাধি, তবুও এর শেকড় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে প্রোথিত। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়; বরং এটি মূলত রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা ও ব্যর্থতারই ফল। যখন রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই দুর্নীতির দুষ্টচক্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অতএব, দুর্নীতি রোধ করতে হলে কেবল ব্যক্তিকে দায়ী করলেই হবে না; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সেবাখাতের কার্যকর সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের দৃঢ়তা এবং একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি। সর্বোপরি, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার ও সামাজিক মর্যাদাসহ মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্র যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তবে নাগরিকদের দুর্নীতির প্রতি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
তথ্যসূত্রঃ
Rawls, J., 1971. A Theory of Justice. Cambridge, MA: Harvard University Press.
Skarbek, D., 2008. Putting the 'Con' into Constitutions: The Economics of Prison Gangs. Journal of Law, Economics, and Organization, 24(2), pp.406–426.
Siddiquee, N.A., 2003. Human resource management in Bangladesh civil service: constraints and contradictions. International Journal of Public Administration, 26(1), pp.35–55.
Transparency International Bangladesh (TIB), 2023. Corruption in Service Sectors: National Household Survey 2022. Dhaka: TIB.
১৩
১৮ মন্তব্য