প্রভাষক
০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৬:৪৪ অপরাহ্ণ
"মানবধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা"
q মানবাধিকার বর্তমান বিশ্বে একটি আলোচিত বিষয়। পৃথিবীতে সব মানুষের কিছু অধিকার রয়েছে। যা ব্যক্তি জীবনে লাভ করা অপরিহার্য। বিশ্বে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্খিত হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের মানবাধিকারকে জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেও ইসলামে মানবাধিকার একটি ঐশি বিধান হিসেবে বহু শতাব্দির পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিটি মানব জন্মগত ভাবে আদম সন্তান। ইসলাম মানব জাতিকে গৌরব, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানুষকে সমান মর্যাদার অধিকার, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। ইসলামি মানবাধিকার বলতে- প্রতিটি মানুষ জন্মের পর থেকে মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রাপ্ত সহজাত অধিকারকে বুঝায়। যেমন-মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার সমান। এছাড়াও মানুষের আরো কিছু মৌনিক মানবাধিকার রয়েছে। যেমনঃ ব্যক্তির জীবন রক্ষার অধিকার, সমতা ও বৈষম্যহীনতার অধিকার, স্বাধীন ও মতামত প্রকাশের অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, শ্রমিক ও দুর্বল শ্রেণীর অধিকার, ধর্মপালনের অধিকার, নারী ও শিশুর অধিকার, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ইত্যাদি। এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলাম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
q বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) জীবনে সংগ্রাম করে, সকল মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। জীবনের নিরাপত্তার অধিকার থেকে শুরু করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা সংস্কৃতি নির্বিশেষে কাউকে বঞ্চিত করেননি। নর-নারীর প্রকৃত মর্যাদ ও অধিকার অর্জনের জন্য মানবধিকারকে সার্বজনীন রূপরেখা দিয়েছেন। যা ছিল ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হযরত সোহাম্মদ (সা) এর যোগ্য নেতৃত্বে বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত মানবাধিকারের' সংবিধান। যার নাম "মদিনার সনদ"।
q মানবধিকার রক্ষাবাচক "মদিনার সনদ" প্রণয়ন করে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) মদিনায় বসবাস রত বহুমাত্রিক ধর্মাবলম্বী ইহুদি, খ্রিষ্ঠান, নাসারা, পৌত্তলিকসহ মুসলমানদের সম্মন্বয়ে মদীনায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সমকালীন বিশ্বের মানুষের সার্বজনীন অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসুল (সাঃ) এর প্রবর্তিত নীতিদর্শন ও দিক নির্দেশনা গ্রহন যোগ্য ও প্রয়োগ উপযোগী হয়ে উঠে। মূলত হযরত সোহাম্মদ (সাঃ) বিশ্ব মানবতাবোধ ও মানবধিকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছেন।
q হযরত মোহাম্মদ (সঃ) পবিত্র আল-কুরআন পেয়ে মৃত্যুর আগ পর্যস্ত মাত্র ২৩ বছরে নিশ্চিত করলেন মানবধিকার। ফলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলো শান্তি, প্রতিষ্ঠিত হলো-মানবাধিকার। তিনি মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই ঘোষণা করেন, সমাজের সবাই সমান। মানুষ হিসেবে কোনো ভেদাভেদ সেই। দৃঢ় ভাবে উচ্চারিত হলো" কোন আরবের উপর অনারবের প্রধান্য নেই। আল্লাহর ভীতি ও মানব কল্যানই হলো-মর্যাদার এক মাত্র মানদন্ড” (সুনান তিরমিজি-৩২৭০)। জাগতিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার সবারই সমান। আল্লাহ বলেছেন, “হে সানব! আমি তোমাদেরকে একজন নর ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, সেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই অধিক সম্মানিত, যে অধিক পরহেজগার”। (সূরা-আল-হুজরাত-১৩)
q ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত সোহাম্মদ (সাঃ) মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিটি মানুষের জীবন পবিত্র, অমূল্য, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ। বিনা কারণে কেউ অন্যের জীবন নষ্ট বা হত্যা করতে পারেনা। এটি ইসলামি মানবধিকারের অন্যতম মৌলিক অধিকার। এজন্যই রাসুল (সাঃ) যুদ্ধ চলকালিন সময়ে নিরীহ নাগরিক, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, সাধু ও অসুস্থ্ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। জীবন রক্ষার অধিকার সর্ম্পকে আল্লাহ বলেছেন “যে ব্যক্তি একটি প্রাণকে হত্যা করে, সে সামগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল, যে একটি প্রাণকে রক্ষা করল, সে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল”।(সূরা-মায়িদা-৩২)। আর রাসুল (সা) বলেছেন, “মুসলিম' সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বাও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ” (সহিহ বুখারী-১০)। এভাবে ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষার সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়।
q ইসলামে অসমতা ও বৈষম্যের কোন স্থান নেই। প্রতিটি মানুষ জন্মগত ভাবে সমান মর্যাদার অধিকারী। কোন ব্যক্তি তার জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা, মতাদর্শকে কোন কারণেই ছোট বা বড়, ভেদাভেদ হিসেবে বিবেচিত হবে না। আল্লাহর কাছে সবাই সমান। আল্লাহ বলেছেন" নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি সে সবচেয়ে বেশী পরহেজগার (সুরা-হুজরাত-১৩)। আর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “কোন শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার” (সুনান তিরমিজি-৩২৭০)। ইসলাম এই শিক্ষা মানব সমাজে প্রকৃত সমতা ও বৈষম্যহীনতার ভিত্তি সস্থাপন করেছে।
q ধর্মপালনে ইসলাম স্বাধীনতা দিয়েছে। ঐতিহাসিক মদিনার সনদের ৪৭টি ধারার মধ্যে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ছিল অন্যতম। মদিনার মুসলিম, ইহুদি, নাসারা, আহলে কিতাব, পৌত্তলিক ও অমুসলিম সকল নাগরিকের ধর্ম চর্চা, ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিকতা ও নিরাপত্তার অধিকারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম লিখিত মানবাধিকার সংবিধান। এই সংবিধান অনুযায়ী জোর করে কোন ব্যক্তিকে ধর্মান্তরিত করা যাবে না। সকল মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালনে স্বাধীন। আল্লাহ বলেছেন “দীন গ্রহনের ক্ষেত্রে কোন জোর-জবরদস্তির সুযোগ নেই”।(সুরা বাকারাহ-২৫৬)। তিনি আরো বলেছেন, “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য” (সূরা-কাফিরুন-৬)। রাসুল (সঃ) বলেছেন, “যে বিধর্মীর উপর জুলুম করে, আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হব”।(আবু দাউদ-৩০৫২)। ইসলামী মানব সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধার সাথে গুরুত্ব দিয়েছে।
q সকল শ্রেণী মানুষের গুরুত্ব সমানভাবে দিয়াছে ইসলাম। সমাজের শ্রমিক, গরিব, মিসকিন, এতিম, অসুস্থ্য ব্যক্তি ও অন্যান্য দুর্বল জনগোস্টির অধিকার কুরআন ও সুন্নাহে সুন্দর ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শ্রমিককে তার শ্রমের প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। সমাজের গরিব-অসহায় ও দুর্বল জনগোষ্ঠিকে সাহায্য করতে হবে। শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকারে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও” (ইবনে মাজাহ-২৪৪৩)। এতিমদের অধিকারে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা এতিমের সম্পদ অন্যায় ভাবে ভক্ষণ করোনা” (সহীহ বুখারী-২৩১৮)। আর দুর্বল অসহায়কে সাহায্য করার জন্য রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা দুর্বলদের সাহায্য করার কারণে রিযিকপ্রাপ্ত হও এবং বিজয় লাভকর” (সহীহ বুখারী-২৮৯৬)। মানব সেবার বিষয়ে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা জমিনবাসীর উপর দয়া কর তাহলে আকাশের অধিবাসী তোমাদেরকে দয়া করবেন”।(আবু দাউদ-৪৯৪১)। আর অসুস্থ্য ব্যক্তির সেবায় হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে যায়, সে জান্নাতের পথে চলতে থাকে” (সহীহ মুসলিম-২৫৬৪)। ইসলাম এতিম, অসহায়, অসুস্থ্য ব্যক্তি ও দুর্বল গোষ্ঠীর অধিকারকে ন্যায়, দয়া, ও দায়িত্বশীলতার সাথে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
q ইসলাম মানব জাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, এতে সমাজের নারী পুরুষ ও শিশু সকলের অধিকার সমান ভাবে নিশ্চিয়তা দিয়েছে। ইসলাম আগমনের পূর্বে শিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। এবং নারী জাতি অবহেলিত, অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নারীদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে হাটে বাজারে বিক্রি করা হতো। ইসলাম আগমনের পর নারীদের, স্ত্রীর মর্যাদা, মায়ের মর্যাদা ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীর মর্যাদায় আল্লাহ বলেন, “তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম ভাবে জীবন যাপন করো” (সূরা নিসা-১৯)। তিনি আরো বলেন, “স্ত্রীদের জন্য স্বামীর উপর যেমন অধিকার রয়েছে, স্বামীর জন্য স্ত্রীদের উপর তেমন অধিকার রয়েছে” (সুরা বাকারাহ-২২৮)। আর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমার মধ্যে সে উত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম” (সুনান তিরমিজি-৩৮৯৫)। রাসুল (সাঃ) আরো বলেন, “তোমার মায়ের পায়ে নিচে জান্নাত” (ইবনে মাজাহ-২৭৮১)। আর শিশুদের প্রতি অবহেলা করা বা হত্যা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করোনা, আমি তোমাদের এবং তাদের রিজিক দেই” (সুর ইসরা-৩১)। আল্লাহ আরো বলেন, কন্যা সন্তানদের জিজ্ঞাস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?” (সুরা তাকভীর-৮,৯)। আর রাসুল (সাঃ) বলেন, যে ছোটদের প্রতি দয়া করেনা, এবং বড়দের সম্মান করেনা, সে আমার দল ভুক্ত নয়” (সুনান তিরমিজি- ১৯২৯)। এভাবে ইসলাম নারী ও শিশুদের অধিকারের নিরাপত্তা ও ন্যায় সঙ্গত লালন পালনের অধিকার সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
q শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ইসলাম নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও দাসমুক্তির প্রতি গভীর গুরুত্ব আরোপ করেছে ইসলাম। কারণ ব্যক্তি স্বাধীনতা একটি মৌনিক মানবধিকার। ইসলাম সকল মানুষকে জন্মগত ভাবে স্বাধীন জীবন-যাপনের অধিকার দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন “যে ইচ্ছা করে ইমান আনুক আর যে ইচ্ছা করে অবিশ্বাস করুক” (সুরা-কাহাফ-২৯)। রাসুল (সাঃ) হজ্জের খুতবায় বলেছেন, “কারও স্বাধীনতা, জীবন, বা সম্পদ লঙ্ঘন করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ”। ইসলাম মানুষকে জিম্মি বা দাস হিসেবে রেখে তাদের অধিকার হরণ করা কঠোর নিষেধ করেছে। দাস মুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যাদের দাস আছে, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া সর্বোত্তম, এতে আল্লাহ খুশি হন”।(সূরা-বাকারাহ-৮৭)। আর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যে আল্লাহর পথে একজন দাসকে মুক্ত করে, আল্লাহ পাক দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি দিবেন” (সহীহ বুখারী-২৫১৭)। ইসলাম মনবের স্বাধীনতা ও দাস মুক্তির মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ স্থাপন করেছে।
q সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা মৌলিক মানবধিকার ও নৈতিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ন্যায়বিচার সমাজে শান্তি শৃংখলা, ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার প্রধান ভিত্তি। সমাজের সকল মানুষ তার অধিকার আদায় ও অত্যাচার, নির্যাতন, জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়া ন্যায় বিচারের উপর নির্ভর করে। ন্যায়বিচার শুধু সামাজিক নীতি নয় বরং আল্লাহর আদেশ। আল্লাহর জমিনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা মুসলমানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। আল্লাহ বলেছেন" যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়বিচার করবে” (সূরা-নিসা-৫৮)। আর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যে বিচারক ন্যায় বিচার করবে, সে একটি সদকা সমতুল্য সওয়াব পাবে” (সহীহ বুখারী-২৭০৭)। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যদি আমার কন্যা ফাতিমা চুরি করতো, আমি তার হাত কেটে দিতাম” (সহীহ বুখারী-৬৭৮৮)। সমাজে বা রাষ্ট্রে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।
q জ্ঞান অর্জন করা ইসলামে মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে অজ্ঞতা, অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায় এবং আল্লাহকে সঠিক ভাবে চেনার সুযোগ করে দেয়। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তার জ্ঞান দ্বারা নিজে উপকৃত হয় এবং সমাজকে সঠিক পথ দেখায়। তাই দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণের জন্য নিয়মিত ও সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য্য। আল্লাহ বলেন, “পড় তোমার প্রতি পালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন” (সুরা আলাক্ব-১)। আল্লাহ বলেন, “হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন” (সুরা ত্বহা-১১৪)। আর রাসুল (সাঃ) বলছেন, প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ” (ইবনে মাজাহ-২২৪)। এভাবে ইসলাম জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব দিয়েছে।
q অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এমন একটি ন্যায়ভিক্তিক মানবধিকার ব্যবস্থা, যা সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন, দারিদ্রের অধিকার রক্ষা, সুদ থেকে বাঁচা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনে সততা, ও সচ্ছতা বজায় রাখার মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় যাকাত, সদকা, ওয়াকফ্, হালাল উপার্জন এবং পরস্পরের সাহায্য-সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যাতে কোনো ব্যক্তি আর্থিক বৈষম্যের শিকার না হয়। আল্লাহ অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছতার জন্য সকল মানুষকে বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জন এবং নিজে পরিশ্রম করতে উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, “যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করো” ( সুরা-জুমআ-১০)। আর ব্যবসা-বানিজ্য করে অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী হওয়া যায়। তবে ব্যবসায় ন্যায় ও সততা থাকতে হবে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “সৎ ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, শহীদ ও সৎকর্মশীন দের সাথে থাকবে” (সুনান তিরমিজি-১২০৯)। একমাত্র ইসলাম সততার মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
q ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছে 'ইসলাস শুধু উপসনাই নয় বরং সামাজিক সর্ম্পকে সুন্দর ও নিরাপদ রাখতে প্রতিবেশীর প্রতি দয়া-মায়া, সহানুভূতি, সম্মান ও সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেশীর ক্ষতি করা, তাকে কষ্ট দেওয়া, এমনকি তার শান্তি নষ্ট করাও ইসলামি মানবধিকারে কঠোর ভাবে নিষেধ। বরং তাদের প্রয়োজনে সাহায্য করা, নিরাপত্তা দেওয়া, এবং আন্তরিক সু-সর্ম্পকে বজায় রাখা মুমিনের পরিচায়ক। আল্লাহ বলেছেন, “আত্মীয় স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকটবর্তী প্রতিবেশি ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করো” (সূরা-নিসা-৩৬)। আর রাসুল(সা) বলেছেন, “হযরত জিব্রাইল (আ) আমাকে বার বার প্রতিবেশী সর্ম্পকে অসিয়ত করছিলেন, যাতে আমার মনে হচ্ছিল, তিনি প্রতিবেশীকে আমার সম্পদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেন কি না” (সহীহ বুখারী-৫৯৩৫)। এভাবে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যান্ত্ মহৎ ও অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
q রাজনৈতিক অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের ভিত্তি। ইসলামি শাসন ব্যবস্থায়কে জনগণের আমানত হিসেবে গণ্য করে এবং ন্যায়পরামর্শ ও জবাবদিহিতাকে রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে নির্দেশ করে। রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত দেওয়া, পরামর্শ করা, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান করা, এবং শাসকের ভুল হলে তার সামনে সত্যকথা বলা। এসবকে ইসলাম উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা নিজেদের কাজ পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যেমে পরিচালনা করো” (সুরা-শুয়ারা-৩৮)। রাজনৈতিক পরামর্শের ও সত্যবাধানের গুরুত্ব বুঝিয়ে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “সর্বোত্তম জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে গিয়ে সত্য কথা বলা “ (আবু দাউদ-৪৩৪৪)। প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি সর্ম্পকে রাসুল (স:) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে দায়িত্ব সর্ম্পকে জবাবদিহী করতে হবে”।(সহীহ বুখারী-৮৯৩)। ইসলাম ন্যায় পরায়নতা ও জবাবদিহিতা মুলক রাজনৈতিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
q আজ পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই গঠিত হচ্ছে সানবধিকার কমিশন। এসব কমিশন নিজ নিজ দেশে মানবধিকার প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু মানবাধিকার যেন ধরা-ছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পৃথিবীর সর্বত্র লঙ্গিত হচ্ছে মানবধিকার। আজ আধুনীক যুগে মানবধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন দেশের সরকার হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে মহানবী (সা) অজ্ঞতা ও অন্ধকার যুগে কুলষিত মানব সমাজে 'হিলফুল ফুযুল' নামে সংগটন গঠন করে জাহেলী যুগে মানবধিকার প্রতিষ্ঠায় শতভাগ সফল হয়েছিলেন।
q পরিশেষে বলা যায়, যে, সমাজে ইসলামি মানবাধিকার বাস্তবায়িত হলে, শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় অনুশাসন পরিপূর্ণরূপে পালিত হবে। মানুষের মৌলিক অধিকার সামগ্রিক ভাবে রক্ষা হবে। আর ইসলাম, মানবধিকার প্রতিষ্ঠায়, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী সফলতা লাভ করেছে। তাই আজও ইসলামী রীতিনীতি অনুস্বরণ ও অনুকরণের মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানবধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
জিয়াউর রহমান মীর
প্রভাষক (ইসলাম শিক্ষ)
আউশকান্দি রশিদিয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।
৭০
১৪৪ মন্তব্য