প্রভাষক
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
বাংলাদেশে ডিগ্রিধারী বেকারত্ব: শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যর্থতা দায় কার?
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা এখন আর কেবল অভিজাত শ্রেণির সীমাবদ্ধতা নয়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও ইনস্টিটিউট মিলিয়ে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—এই ডিগ্রিধারীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থানের বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এই চিত্র আমাদের সামনে দাঁড়ায়: সমস্যাটি চাকরির অভাব, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা?
১. একাডেমিক ডিগ্রি বনাম দক্ষতা:
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অধিকাংশ নিয়োগকর্তা ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের বড় অংশ কখনো বাস্তব প্রজেক্ট, ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসাইনমেন্ট বা হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি।
ফলে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল নিয়ে পাশ করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কমিউনিকেশন স্কিল, টিমওয়ার্ক, ডিজিটাল টুল ব্যবহারের দক্ষতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। এই ফাঁকটাই ডিগ্রিধারী বেকারত্বের প্রথম ও সবচেয়ে বড় কারণ।
২. সিলেবাসের সঙ্গে বাস্তব জীবনের দূরত্ব:
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বড় একটি সমস্যা হলো— সিলেবাস আপডেট হয় ধীরগতিতে, অথচ কর্মবাজার বদলায় দ্রুত।
অনেক বিষয়ে এখনো দশ–পনেরো বছর আগের তত্ত্ব পড়ানো হয়
অথচ সেই বিষয়গুলোর বাস্তব প্রয়োগ ইতোমধ্যে প্রযুক্তি ও বাজারের চাপে বদলে গেছে
এর ফলে শিক্ষার্থী এমন জ্ঞান অর্জন করে যা পরীক্ষার খাতায় কার্যকর, কিন্তু অফিস, ফ্যাক্টরি বা ফিল্ডে অপ্রাসঙ্গিক। এটি শিক্ষার্থীর নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার নীতিগত দুর্বলতা—এবং নিঃসন্দেহে একটি শিক্ষার জাতিয় স্বার্থ।
৩. কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:
বাংলাদেশে এখনও একটি গভীর সামাজিক মানসিকতা কাজ করে—
“ভালো ছাত্র মানে জেনারেল লাইনে পড়বে, আর কারিগরি শিক্ষা কম মেধাবীদের জন্য।”
বাস্তবতা ঠিক উল্টো। আজকের বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে— টেকনিক্যাল স্কিল
আইটি, অটোমেশন ম্যানুফ্যাকচারিং ও সার্ভিস সেক্টরে
কিন্তু সামাজিক অবমূল্যায়নের কারণে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী কারিগরি পথে যেতে আগ্রহী হয় না। এই মানসিকতা ভাঙতে না পারলে ডিগ্রিধারী বেকারত্ব কমানো অসম্ভব।
৪. শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থা:
শিক্ষকরা এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক।
অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন একই কনটেন্ট পড়াতে বাধ্য
গবেষণা ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত
প্রশিক্ষণ ও আপডেটেড স্কিল অর্জনের কাঠামো দুর্বল
ফলে শিক্ষক নিজেও বাস্তব কর্মজগতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না। একজন শিক্ষক যদি নিজেই বাজার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীকে কীভাবে প্রস্তুত করবেন? এটি শিক্ষক দোষ নয়; এটি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থান:
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সফলতা মাপে—
i. কতজন ভর্তি হলো
ii. কতজন পাশ করলো
iii. কতটা রেজাল্ট ভালো
কিন্তু খুব কম প্রতিষ্ঠানই হিসাব করে—
কতজন গ্র্যাজুয়েট চাকরি পেল
কতজন উদ্যোক্তা হলো
কতজন বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারছে
ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া সংযোগ দুর্বল থাকার কারণে শিক্ষার্থী বাস্তব কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত না হয়েই শিক্ষা জীবন শেষ করে। এই ব্যবধানই ডিগ্রিধারী বেকারত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
৬. শিক্ষার্থীর ভূমিকা:
এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে শিক্ষার্থীরও দায়িত্ব আছে। বর্তমান সময়ে—
অনলাইন শেখার সুযোগ
ফ্রি ও পেইড স্কিল কোর্স
ওপেন রিসোর্স—সবই আছে
কিন্তু দিকনির্দেশনা ও মোটিভেশনের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী জানেই না কী শিখবে, কেন শিখবে, আর কোথায় কাজে লাগবে। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রয়োজন হলেও, একে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখাও অন্যায়।
৭. সমাধান: নীতিগত ও বাস্তব পদক্ষেপ
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি—
i. একাডেমিক ডিগ্রির সঙ্গে স্কিল-ভিত্তিক সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা।
ii. সিলেবাসে ইন্ডাস্ট্রি-ভিত্তিক প্রজেক্ট ও ইন্টার্নশিপ যুক্ত করা
iii. শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ট্রেনিং ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা
iv. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেল
v. কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে সম্মানজনক অবস্থানে নেওয়া
এসব উদ্যোগ একত্রে বাস্তবায়ন না হলে ডিগ্রিধারী বেকারত্ব কমবে না, বরং বাড়বে।
উপসংহার
বাংলাদেশে ডিগ্রিধারী বেকারত্ব কোনো একক সমস্যার ফল নয়। এটি আমাদের শিক্ষা দর্শন, কাঠামো, সামাজিক মানসিকতা ও কর্মবাজারের সঙ্গে সংযোগহীনতার সম্মিলিত প্রতিফলন। এখন সময় এসেছে প্রশ্ন বদলানোর—
“কোন কর্মমুখী শিক্ষা অর্জন করলে আমি সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারব?”
এই পরিবর্তন আনাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২
২ মন্তব্য