সহকারী শিক্ষক
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ণ
নতুন মূল্যায়ন ও শিখন কৌশল: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা - বাজেট কি প্রস্তুত?
নতুন মূল্যায়ন ও শিখন কৌশল: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা - বাজেট কি প্রস্তুত?
প্রাথমিক শিক্ষার নতুন দিগন্ত: মূল্যায়ন ও শিখন কৌশলের ব্যয়ভার কাঁধে নেবে কে?
২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে। শুধু পরীক্ষা পদ্ধতি নয়, বরং শিখন-শেখানো দর্শনের মূলে পরিবর্তন এনে সরকার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে গ্র্যাজুয়াল রিলিজ অফ রেস্পন্সিবিলিটি (GRR) বা "ধীরে ধীরে দায়িত্ব অর্পণ" নামক বিশ্বমানের শিখন কৌশল। কিন্তু এই মহৎ স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন যে এক বিশাল আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
শিখন দর্শন: GRR এবং নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি
নতুন এই ব্যবস্থার আত্মা হলো GRR কৌশল, যা "আমি করি (I do), আমরা করি (We do), তোমরা করো (You do)"—এই তিন ধাপে কাজ করে। শিক্ষক প্রথমে নিজে করে দেখান, তারপর শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুশীলন করেন এবং শেষে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে কাজটি সম্পন্ন করে।
এই দর্শনেরই প্রায়োগিক রূপ হলো নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি। এখানে ৩০% নম্বর ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য বরাদ্দ, যা মূলত GRR-এর "আমরা করি" ও "তোমরা করো" ধাপগুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত হবে। বাকি ৭০% আসবে সামষ্টিক বা লিখিত পরীক্ষা থেকে, যা শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত দক্ষতা যাচাই করবে। এর লক্ষ্য হলো মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রায়োগিক ও দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা।
ব্যয়ের বাস্তব চিত্র: সংখ্যা কী বলছে?
যেকোনো আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত রসদ। GRR এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন—উভয়ের জন্যই নিয়মিত উপকরণ (যেমন: ওয়ার্কশিট, অ্যাক্টিভিটি শিট, প্রায়োগিক পরীক্ষার সরঞ্জাম) অপরিহার্য। প্রদত্ত ব্যয় বিবরণীটি আমাদের এই খরচের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেয়।
চলুন, এই সারণী থেকে একটি বাস্তব উদাহরণ দেখি:
বিষয়ভিত্তিক খরচের হিসাব: প্রথম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বছরব্যাপী ১৩টি ধারাবাহিক মূল্যায়ন পরিচালনা করতে হবে। প্রতিটি মূল্যায়নের জন্য (যেমন একটি ওয়ার্কশিট বা ছোট কার্যক্রম) জনপ্রতি ৫ টাকা খরচ হলে, শুধু বাংলা বিষয়েই মোট খরচ দাঁড়ায়:
(১৩টি মূল্যায়ন x ৪০ জন শিক্ষার্থী x জনপ্রতি ৫ টাকা) = ২,৬০০ টাকা।শ্রেণিভিত্তিক মোট খরচ: একইভাবে, প্রথম শ্রেণির গণিত বিষয়ে ১৮টি মূল্যায়নের জন্য খরচ ৩,৬০০ টাকা, ইংরেজি বিষয়ে ৯টি মূল্যায়নের জন্য ১,৮০০ টাকা এবং শিল্পকলা বিষয়ে ১৬টি মূল্যায়নের জন্য ৩,২০০ টাকা। সব বিষয় মিলিয়ে শুধু প্রথম শ্রেণির জন্যই একটি শিক্ষাবর্ষে মোট খরচ দাঁড়ায় ১৭,২০০ টাকা।
এই হিসাবটি মাত্র একটি শ্রেণির, একটি স্কুলের। যখন এই খরচ দেশের ৬৫,০০০-এর বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণির লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য হিসাব করা হবে, তখন মোট বাজেটের পরিমাণ দাঁড়াবে শত শত কোটি টাকা।
অর্থায়নের উভয় সংকট: কে দেবে এই টাকা?
এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। এর অর্থ, এই মূল্যায়ন বা শিখন উপকরণের খরচ কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না।
কিছু সচ্ছল অভিভাবক হয়তো সন্তানের শিক্ষার জন্য এই ব্যয়ভার বহন করতে ইচ্ছুক হতে পারেন, কিন্তু এটি কোনো সার্বজনীন সমাধান নয়। বরং এটি ধনী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষার এক বিশাল বৈষম্য তৈরি করবে। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা উপকরণ পাবে, আর যাদের নেই, তারা পিছিয়ে পড়বে। এটি সার্বজনীন শিক্ষার মূল আদর্শকেই ধ্বংস করে দেবে।
পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ না থাকলে যা ঘটবে
যদি সরকার এই নতুন পদ্ধতির জন্য সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত না করে, তবে এই মহৎ উদ্যোগটির অপমৃত্যু ঘটতে পারে:
১. GRR কৌশল অকার্যকর হবে: প্রয়োজনীয় ওয়ার্কশিট বা উপকরণ ছাড়া শিক্ষকরা শুধু "আমি করি" (বক্তৃতা) ধাপেই আটকে থাকবেন। "আমরা করি" বা "তোমরা করো" ধাপ আর বাস্তবায়িত হবে না।
২. ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা: শিক্ষকরা উপকরণের অভাবে কিসের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন? তখন এটি নম্বর দেওয়ার একটি লোকদেখানো প্রক্রিয়া হয়ে থাকবে।
৩. ব্যর্থ হবে মূল উদ্দেশ্য: একটি কার্যকর ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর যে মূল লক্ষ্য, তা অপর্যাপ্ত অর্থায়নের কারণে শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়বে।
শেষ কথা
প্রাথমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু একটি সুন্দর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আবেগ বা সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন નક્কার আর্থিক ভিত্তি। যেহেতু এই ব্যয়ভার শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ওপর চাপানো আইনত ও নৈতিকভাবে অসম্ভব, তাই এর একমাত্র সমাধান হলো সরাসরি সরকারি বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
সরকারকে অবশ্যই প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন সংখ্যা ও তার আনুমানিক খরচ হিসাব করে একটি বাস্তবসম্মত ও পৃথক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। নইলে, একটি অসাধারণ শিক্ষাদর্শন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক বিরাট সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
৬৪
১০০ মন্তব্য