সহকারী শিক্ষক
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ইসলাম শিক্ষা। নবম দশম শ্রেণির
অধ্যায়-৩ পাঠ ৪
যাকাত الزكوة
পরিচয়
যাকাত এর শাব্দিক অর্থ
যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা,পরিশুদ্ধতা ও বৃদ্ধি পাওয়া
1️⃣ النماء (আন-নামা') — বৃদ্ধি, উন্নতি (Growth Increase)
2️⃣ البركة (আল-বারাকাহ) — বরকত (Blessing)
3️⃣ الطهارة (আত-তাহারাহ) — পবিত্রতা (Purification)
4️⃣ الصلاح (আস-সালাহ) — কল্যাণ, সৎ হওয়া (Righteousness / Reform
🔎 সারকথা
অর্থাৎ, যাকাত শব্দের মূল অর্থ হলো—
👉 পবিত্রতা অর্জন করা
👉 বৃদ্ধি ও বরকত লাভ করা
👉 কল্যাণময় হওয়া
যাকাতের সংজ্ঞা
১। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় কোনো মুসলিম 'নিসাব' পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে বছরান্তে তার সম্পদের শতকরা ২.৫০ হারে নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করাকে যাকাত বলে।
-নিসাব হলো ন্যূনতম সম্পদ, যা থাকলে যাকাত ফরজ হয়।
২। যাকাত প্রদানে ধনীর সম্পদ পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও বৃদ্ধি পায়। তাই একে যাকাত বলা হয়।
৩। ইমাম আবু হানিফা (রা.)–এর মতে:
“নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করাই যাকাত।”
৪। ফিকহের প্রসিদ্ধ সংজ্ঞা (হানাফি মাযহাব)
“যে সম্পদে নেসাব পরিমাণ বিদ্যমান এবং এক বছর অতিবাহিত হয়েছে, সে সম্পদের নির্ধারিত অংশ শরিয়ত নির্ধারিত খাতে প্রদান করাই যাকাত।”
(উৎস: হিদায়া)
৫। আল-মু‘জামুল ওয়াসিতের সংজ্ঞা
অর্থাৎ, “নির্দিষ্ট সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নির্ধারিত অংশ প্রদান করা।”
-যাকাতকে সেতুবন্ধন বলা হয়
যাকাত আদায় করলে সমাজের অসচ্ছল লোকেরাও আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠবে। ফলে ধনী ও গরিবের মাঝে সেতুবন্ধ তৈরি হবে। এতে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় থাকে। হযরত মুহাম্মদ (স.) যাকাতকে ইসলামের সেতুবন্ধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন-
الزَّكُوةُ قَنطَرَةُ الْإِسْلَامِ
অর্থ: যাকাত হলো ইসলামের সেতুবন্ধ (বায়হাকি)।
সেতুবন্ধন শব্দটি দুটি অংশে গঠিত—
সেতু = Bridge (সংযোগের মাধ্যম)
বন্ধন = Bond/Connection (যুক্ত করা)
অর্থাৎ, সেতুবন্ধন হলো—দুটি বিষয়, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ধারণার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা।
যেমন একটি নদীর দুই তীরকে যুক্ত করতে সেতু তৈরি করা হয়, তেমনি মানুষে-মানুষে, চিন্তায়-চিন্তায় বা প্রজন্মে-প্রজন্মে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়াই হলো সেতুবন্ধন।
যাকাত যেভাবে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে
১️। ধনী–দরিদ্রের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন
২️।সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি
৩️। পারস্পরিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি
৪️। অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা
৫️। হৃদয়ের পরিশুদ্ধি
-ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাত গরিবের প্রতি ধনীর দয়া নয় বরং এটি গরিবের অধিকার।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের ৫০ এর অধিক আয়াতে যাকাতের বিধান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
-আল্লাহ তায়ালা যাকাত আদায় করাকে আবশ্যক করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَآتُوا الزَّكوة
অর্থ: আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর (সূরা আন-নূর, আয়াত ৫৬)।
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া কিতাবের লিখেন,
وَفِيهَا فُرِضَتِ الزَّكَاةُ ذَاتُ النُّصُبِ، وَفُرِضَتْ زَكَاةُ الْفِطْرِ.
অর্থ: "এবং (দ্বিতীয় হিজরীতে) নির্ধারিত সম্পদের উপর বিস্তারিতভাবে যাকাত ফরজ করা হয়, এবং সদকাতুল ফিতরও আবশ্যক করা হয়। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫/৩১২)
আল্লাহ তাআলা সূরা তাওবার ১০৩ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
অর্থ: (হে নবী!) তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও বরকতপূর্ণ করবেন এবং তাদের জন্য দোয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনার দুআ তাদের পক্ষে প্রশান্তিদায়ক। আল্লাহ সব কথা শোনেন, সবকিছু জানেন। (সূরা তাওবাহ: ১০৩)
আল্লাহ তাআলা সূরা মাআরিজের ২৪-২৫ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ } { لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ } অর্থ: এবং যাদের অর্থ-সম্পদে নির্ধারিত হক আছে, ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের। (সূরা মাআরিজ: ২৪-২৫) এই আয়াতে নির্ধারিত হক এর ব্যখ্যায় মুফাসসিরীনে কিরাম লিখেন, وَالْحَقُّ الْمَعْلُومُ هُوَ الزَّكَاةُ অর্থাৎ নির্ধারিত হক মানে হল যাকাত। (বাদায়িউস সানায়ি': ২/২)
হাদিস শরীফ থেকে যাকাত ফরজ হওয়ার দলীল
সহীহ বুখারীর ৮ নং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، رضى الله عنهما . قَالَ قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم بُنِي الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ، وَحَجَّ الْبَيْتِ مَنْ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
অর্থ: হযরত ইবনে 'উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমযানের রোজা রাখা। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮, সহীহ মুসলিম: ৪৫১৪, মুসনাদে আহমাদ ৬০২২, ৬৩০৯)
যাকাতের গুরুত্ব
১। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে অনেক স্থানে সালাতের সাথে যাকাতের কথাও বলেছেন।
২। যাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়।
৩।যাকাতের সামাজিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব অনেক।
৪। সম্পদ পবিত্র করে
৫। গরিবের অধিকার নিশ্চিত করে
৬। দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করে
৭। সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করে
৮। লোভ ও কৃপণতা দূর করে
৯। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম
১০। যাকাত না দিলে শাস্তির ভয় আছে
সামাজিক গুরুত্ব
১। যাকাত সমাজ থেকে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা দূর করে পারস্পরিক সৌহার্দ স্থাপন করে।
২। সামাজিক নিরাপত্তা দানের পাশাপাশি সমাজের মানুষের মাঝে সম্পদের বৈষম্য দূর করে।
যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
অর্থ: যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের অর্থশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয় (সূরা আল-হাশর, আয়াত ৭)।
৩। সমাজে যাকাত ব্যবস্থা চালু থাকলে বৈষম্য দূর করে সাম্যের ভিত্তিতে জীবন গড়ে তোলা যায়।
৪। দারিদ্র্য বিমোচন
৫। ধনী–গরিব বৈষম্য হ্রাস
৬। ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি
৭। অপরাধ প্রবণতা হ্রাস
৮। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
৯। অর্থের সঞ্চালন বৃদ্ধি
১০। সমাজে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা
১১। মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা
১২। সমষ্টিগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা
১৩। ইসলামী সমাজব্যবস্থা শক্তিশালী করা
নৈতিক গুরুত্ব
১। যাকাত মানুষের মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে।
২। যাকাত পবিত্র ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
৩। যাকাত অপচয় রোধ করতে শেখায়।
৪। যাকাত মানুষের আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক উন্নতি, সম্পদের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে। যেমন, মহান আল্লাহ বলেন-
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةٌ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
অর্থ: আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) গ্রহণ করুন। এর মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র এবং পরিশোধিত করবেন (সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১০৩)।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
১। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার উৎসগুলোর মধ্যে যাকাত অন্যতম।
২। যাকাত এর ওপর ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জনকল্যাণমুখী প্রকল্পসমূহের সাফল্য নির্ভরশীল।
৩। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহ গতিশীল হয়। ৪। যাকাতের কারণে ধনীর সম্পদ পুঞ্জীভূক্ত না থেকে দরিদ্র লোকদের হাতেও যায়।
৫। যাকাতের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনীতি সচল হয়। ৬। যাকাতের কারণে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বেকারত্ব হ্রাস পায়।
৬। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বেড়ে যায়।
৭। যাকাত প্রদান করলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত ও শক্তিশালী হয়।
৮।যাকাত দিলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল লোকগুলো ধীরে ধীরে সচ্ছল হতে থাকে।
৯। যাকাত দিলে দিনে দিনে সমাজে সম্পদশালী লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يمحَقُ اللهُ الرَّبُوا وَ يُرْبِي الصَّدَقْتِ .
অর্থ: আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বাড়িয়ে দেন (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৬)।
ধর্মীয় গুরুত্ব
১। কোনো মুসলিম যাকাত না দিলে সে আর পরিপূর্ণ মুসলিম থাকতে পারে না।
আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ لَا يُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كُفِرُونَ .
অর্থ: যারা যাকাত দেয় না এবং তারা পরকালও অস্বীকারকারী (সূরা হা-মীম আস-সাজদা, আয়াত ৭)।
২। যাকাত অস্বীকার করা আল্লাহ ও তার রাসুলকে অস্বীকার করার শামিল।
৩। ইসলামি আইনে যাকাত দানের উপযুক্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে।
৪। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
৫। সালাত ও সাওম শারীরিক ইবাদত। আর যাকাত হলো আর্থিক ইবাদত।
৬। যাকাত আদায় করা একজন মুসলিমের ইমানি দায়িত্ব।
৭। যাকাত অসহায় ও দরিদ্রের অধিকার
যাকাত প্রদান করা দরিদ্রের প্রতি ধনী লোকের কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। বরং যাকাত হলো দরিদ্র লোকের প্রাপ্য বা অধিকার। কেউ ইসলামের অনুসারী হলে তার উচিত স্বেচ্ছায় যাকাত প্রদান করা এবং অসহায় লোকদের নিকট তা পৌঁছে দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন-
ولَى أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ .
অর্থ আর তাদের (ধনীদের) সম্পদে অভাবীর ও বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ১৯)।
তাদের প্রাপ্য অধিকার অবশ্যই দিতে হবে। অন্যথায় সমুদয় সম্পদ তার জন্য অপবিত্র হয়ে যাবে। তাই সম্পদশালী ব্যক্তি তার সম্পদ ভোগ করার পূর্বে চিন্তা করবে যে, এতে অসহায়দের অধিকার পরিণামে তাকে পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেন, 'আর যারা স্বর্ণ ও রূপা (সম্পদ) জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করে না তাদেরকে কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দিন। (সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৩৪)
৮। বেকার ও গরিবদের জন্য অনেক কর্মসংস্থান করা যেতে পারে।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করে বেকার ও গরিবদের জন্য অনেক কর্মসংস্থান করা যেতে পারে। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। দারিদ্র্য দূরীভূত হবে এবং দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। ধনী-দরিদ্রের মাঝে সম্পদের বৈষম্য দূর হবে।
কাদের উপর যাকাত আদায় করা ফরজ?
الزَّكَاةَ وَاجِبَةٌ عَلَى الْحُرِّ الْعَاقِلِ الْبَالِغِ الْمُسْلِمِ إِذَا مَلَكَ نِصَابًا مِلْكًا تَامًا وَحَالَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ
অর্থ: যাকাত স্বাধীন, বিবেকবান, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির ওপর ফরজ, যদি সে সম্পূর্ণ মালিকানা সহ নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় এবং সে সম্পদ এক বছর অতিক্রম হয়।
এই সংজ্ঞায় যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্তারোপ করা হয়েছে, যথা-
১. মুসলমান হওয়া। সুতরাং অমুসলিমের উপর যাকাত ফরজ হবে না।
২. বোধসম্পন্ন হওয়া। সুতরাং পাগলের উপর যাকাত ফরজ হবে না তার যত ধন-সম্পদ থাকুক না কেন।
৩. বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া। সুতরং নাবালেগ বা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের উপর ফরজ নয় যদিও তাদের নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকুক না কেন।
৪. নেসাবের মালিক হওয়া। সুতরাং যে নির্দিষ্ট পরিমাণ নেসাবের মালিক হয়নি সে প্রাপ্ত বয়স্ক ও বোধসম্পন্ন হলেও যাকাত তার উপর ফরজ হবে না। নেসাবের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত সামনে আসছে।
৫. হাওলানে হাওল বা বছর পূর্তি হওয়া। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি নেসাবের মালিক হয়েও থাকে কিন্তু হাওলানে হাওল বা বছরপূর্তি হয়নি তার উপর যাকাত ফরজ নয়।
৬. হাজতে আসলী বা মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া। সুতরাং নিজের বসবাসের ঘর, চলাচলের গাড়ি, পরিধানের বস্ত্র, ঘরের প্রয়োজনীয় সামানাদি ইত্যাদির উপর যাকাত ফরজ হবে না। (হিদায়া: ১/৯৫-৯৬ পৃষ্ঠা।
কী কী সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হয় এবং যাকাতের নেসাব কী?
অর্থ: যে সমস্ত মালের মধ্যে যাকাত ফরজ হয় তা তিন প্রকার: ১। স্বণ-রূপা। ২। ব্যবসার মাল। ৩। চতুস্পদ জন্তু। (বাদায়িউস সানায়ি': ২/১৬)
নোট - যাকাতের ব্যাখ্যা
❗যাকাতের নিসাব হলো 7.5 ভরি সোনা অথবা 52.5 ভরি রূপা বা ঐ পরিমাণ অর্থ যা দিয়ে 52.5 ভরি রূপা কেনা যাবে। এগুলো হিজরি সন মোতাবেক ৩৫৪ দিন থাকলে তখন যাকাত ফরয হয়।
নিসাব পূর্ণ হলে তখন নিসাব সহ অতিরিক্ত যদি সম্পদ থাকে তাহলে সম্পূর্ণ সম্পদের ই যাকাত দিতে হবে। নিসাব বাদ যাবে না।
10 ভরি সোনা থাকলে 10 ভরির ই যাকাত আসবে।
___
___
❗টাকা বা অন্যান্য সম্পদের নিসাব নির্ধারণ করা হয় সোনা বা রূপার ক্রয়মূল্যের উপর।
নবীজী সঃ এর সময় সোনা রূপার পরিমাণের ভারসাম্য ছিলো কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যায় সোনার দাম রুপার থেকে কয়েকগুন বেশি। এজন্য গরীব মানুষের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য করে আলেমগণ রূপার উপর নিসাব ধার্য্য করেছে।
এবছর 2025 সালে 1446 হিজরিতে 52.5 ভরি রূপার হিসাব..
22k রূপার নিসাব ( ক্রয়মূল্য ) হলো 135285.15/=
21k রূপার নিসাব হলো 128551.5/=
18k রূপার নিসাব হলো 110799.15/=
সনাতন রূপার নিসাব হলো 83252.4/=
*( 5 মার্চ 2025 বাজুস থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে )
____
নিসাব হিসাব পদ্ধতি: 1 ভরি = 11.66 গ্রাম
21k রূপা 1 গ্রাম = 210 টাকা
= 210×11.66×52.5 = 128551.5 টাকা
____
হানাফি ফিকহের আলমগণ একটা মধ্যম পর্যায় হিসাব করে 95000/= নিসাব নির্ধারণ করেছেন। এক্ষেত্রে উত্তম হবে উপরের যেটা হিসাব করলে যাকাত দেওয়া যায় সেটাতে দেওয়া। যাকাত একটা ফরয ইবাদাত। এটা আদায় করলে কোন ক্ষতি নেই। সোওয়াব হবে।
যাকাত শব্দের অর্থ শুচিতা ও পবিত্রতা, শুদ্ধি ও বৃদ্ধি। এতে সম্পদ পবিত্র হয় ও বৃদ্ধি পায়। কমে না।
এজন্য চেষ্টা করা কমের ভেতরে যেটাতে নেসাব হয় সেটা দেওয়া। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকেই তার ইবাদাত বেশি বেশি করার তাউফিক দান করুক
____
নিসাব পূর্ণ হলে নিসাবসহ বাড়তি সব সোনা, রুপা, টাকা, এর 2.5% টাকা (1000 টাকায় 25 টাকা) দিতে হয়।
* [ 2.5% = 0.025 ]
______
❗সোনার যাকাতযোগ্য দাম হিসাব প্রতি ভরি:
22k সোনার (13023×11.66)-18% = 124515.51/=
21k সোনার (12431×11.66)-18% = 118855.28/=
18k সোনার (10655×11.66)-18% = 101874.59/=
সনাতন সোনার (8777×11.66)-18% = 83918.66/=
❗রুপার যাকাতযোগ্য দাম হিসাব প্রতি ভরি:
22k রূপার (221×11.66)-18% = 2113.03/=
21k রূপার (210×11.66)-18% = 2007.86/=
18k রূপার (181×11.66)-18% = 1730.58/=
সনাতন রূপার (136×11.66)-18% = 1300.33/
*( 5 মার্চ 2025 বাজুস থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে )
তাহলে 10 ভরি 22k সোনার দামে যাকাত আসবে
124515.51×10 = 1245155.1×2.5% = 31128.88 টাকা
( বাকি হিসাব নিচে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করবো। এরপর কোন জিজ্ঞাসা থাকলে কমেন্ট মেসেজ করবেন প্লিজ।
____
❗কিছু দৃষ্টান্ত
♦1) কারো নিকট শুধুমাত্র স্বর্ণ থাকলে তা 7.5 ভরির কম হলে যাকাত দিতে হবে না ৷
🌹2) কারো নিকট শুধুমাত্র রূপা থাকলে তা 52.5 ভরির কম হলে যাকাত দিতে হবে না ৷
🚫3) কারো নিকট কিছু সোনা ও কিছু রুপা আছে। 354 দিন থাকলে এগুলো হিসাব করে যদি 52.5 ভরি রূপার মূল্যের সমান হয় তাহলে যাকায় দিতে হবে।
একটা উদাহরণ,
কারো কাছে 6.10 ভরি স্বর্ণ আছে ও 18 ভরি রূপা আছে, এই উভয়ের মূল্য একত্র করলে যেহেতু তা 52.5 ভরি রুপার সমমূল্য হয় (এক্ষেত্রে অনেক বেশি হয়েছে) তাই এগুলোর উপর যাকাত ফরজ হবে।
উভয়ের মূল্য ধরে যত আসবে তার 2.5% যাকাত দিতে হবে।
হিসাব
6.10 ভরি 22k সোনার দাম (6.10×124515.51)= 759544.611/=
18 ভরি 22k রূপার দাম (18×1730.58)= 31150.44/=
মোট: 759544.611+31150.44 = 790695.051 টাকা
যাকাত: 790695.051×2.5% = 19767.376275 টাকা = 19768 টাকা
___
🌹4) কারো কাছে সোনা রুপা কিছুই নেই আছে নগদ অর্থ যা 354 দিন আছে আর তা নিসাব (95000 টাকা) টাকা বা এর বেশি তাহলে তাকে যাকাত দিতে হবে।
95000 এর কম থাকলে দিতে হবে না।
এই 95000 হলো নিসাব। এটা ধরেন আজ 01 রমজানে আপনার কাছে আছে। এরপর আগামী এক বছর পর রমজানের 01 তারিখেও যদি ঐ 95000 বা বেশি থাকে তাহলে যাকাত দিতে হবে। যদি এক বছর পর 01 রমজানে 95000 কম থাকে তাহলে যাকাত দিতে হবে না।
♦5) কারো নিকট কিছু সোনা বা কিছু রুপা ও সাথে নগদ কিছু টাকা আছে এক বছর ধরে, হোক তা ১০ টাকা বা যে কোন পরিমাণ টাকা। এগুলো সব হিসাব করে যদি 52.5 ভরি রূপার মূল্যের সমান হয় তাহলে যাকায় দিতে হবে।
আমরা অনেকেই নতুন 10, 20, 200 টাকার নোট যত্ন করে রেখে দেয়। যদি এমন কোন নোট 1 বছর থাকে আর তা ঐ অল্প সোনা রূপার সাথে যোগ করে 95000 টাকার সমান হয় তাহলে যাকাত দিতে হবে।
তবে যদি ঋণ থাকে সেক্ষেত্রে তখন ঐ 10, 20, 200 টাকার নোট থাকলেও আর যাকাত দিতে হবে না। কেননা ঋণ শোধ করতে ঐ 200 টাকা ব্যয় হয়ে যাবে তখন আর অল্প সোনা বা অল্প রূপাতে নিসাব আসবে না।
((যদি নিসাব হয় তাহলে উপরে 3 নং পয়েন্ট ফলো করতে হবে।))
* কিন্তু যদি এই পরিমাণ অর্থ থাকে যা ঋণ পরিশোধ করার পরও অর্থ বেঁচে থাকে তাহলে তখন নিসাব পূর্ণ হলে যাকায় আসবে।
ধরুন সোনা রুপা নগদ অর্থ দিয়ে টাকা আসলো 100000। আর ঋণ আছে 5000 টাকা। তাহলে ঋণ বাদ দিয়েও টাকা থাকে 95000 যা নিসাব পূর্ণ হয়। আর তাই এই টাকার 2.5% যাকাত দিতে হবে।
___
🌹6) সোনা বা রূপা বা নগদ অর্থ যেভাবেই থাকুক না কেন তা নিসাব পূরণ হলে সবটুকুর ই যাকাত আসবে।
অলংকার হোক বা যে কোন কিছু। রিং হোক বা কোন সোনা রূপার শোপিস। যদি জামা কাপড়েও সোনা রুপা ব্যবহার করা হয় তাও হিসাব করতে হবে। ১ আনা হোক বা আরো কম সব ই হিসাব করতে হবে।
ব্যাংক ডিপোজিট বা বাসা বাড়িতে বা কারো কাছে ধার দেওয়া যে ভাবেই অর্থ থাকুক হিসাবে আসবে।
♦7) যাকাত ফরয হবে ব্যক্তি বিশেষে। নিজের সম্পদের যাকাত নিজের হিসাবে করতে হবে। অন্য কারোর তা হিসাবে আসবে না।
স্বামীর সম্পদের হিসাব আলাদা হবে। স্ত্রীর সম্পদের হিসাব আলাদা হবে। মা বাবা সন্তান সবার সম্পদের হিসাব ই আলাদা হবে। যার নিসাব পূর্ণ হবে শুধু তার সম্পদের যাকাত দিতে হবে।
যদি পরিবারের 10 জনের কারো সম্পদই আলাদা ভাবে নিসাব না হয় তবে কাউকে কোন যাকাত দিতে হবে না।
__
♥ একজনের যাকাত অন্য জন চাইলে আদায় করে দিতে পারবে। যার যাকাত আদায় করে দিবে তার অনুমতি নিয়ে আদায় করে দিতে হবে। যেমন স্ত্রীর যাকাত স্বামী আদায় করে দিলো। এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর কাছে অনুমতি নিয়ে যাকাত দিয়ে দিবে।
🔺 ( নারীদের সোনা রুপার যাকাতের নিসাব হলে যদি নগদ অর্থ নাও থাকে তাহলে প্রয়োজনে সোনা বা রূপা বিক্রি করে হলেও যাকাত দিতে হবে। )
____
🌹8 ) নাবালক ছেলে মেয়ের যাকাত দিতে হবে না। যখন বালেগ হবে তখন যদি নিসাব পরিমাণ অর্থ থাকে তখন থেকে 354 দিন পর যদি নিসাব বজায় থাকে তাহলে তখন যাকাত দিতে হবে সম্পূর্ণ সম্পদের।
♦9) আরো কিছু বিষয়ে যাকাত আসে সেগুলো আপাতত লেখা সম্ভব হচ্ছে না। ছবিতে দেখে নিন। পরে সময় সুযোগ পেলে লিখবো ইনশাআল্লাহ।
____
❌ প্রত্যেকটা দায়িত্বশীল মুসলিমের উচিত যখন অর্থ সম্পদ বেশি হয় আর তা সব সময় প্রায় থাকে কম বেশি তখন একজন আলেম থেকে যাকাতে হিসাব করে নিতে হয়। আর যেদিন থেকে নিসাব শুরু হয় পরের বছর ঐ দিন আবার হিসাব করতে হয়। যদি নিসাব পূর্ণ হয় তাহলে যাকাত দিতে হয়। যাকাতের জন্য রমাদান মাস জরুরি না বা নির্দিষ্টও না। যখন যাকাতের নিসাব পূর্ণ হবে তখনই দিয়ে দেওয়া ভালো। আমরা অনেকেই প্রথম দিনটা মনে রাখি না। আর অনেকেই কোন হিসাব ছাড়াই শাড়ি লুঙ্গি দিয়ে যাকাত দিয়ে থাকি। এটা ঠিক না। যাকাত আদায় হবে না।
____
বছর শেষে দৈনন্দিন প্রয়োজন খরচ করার পর যেই টাকা বাঁচবে,সেটিও যাকাতের মধ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যদিও তাহা সামান্যও হোক।
যাকাত 2.5% হিসাব আসবে যদি প্রত্যেক রমজানে মাসে দেওয়া হয়। বা হিজরি ক্যালেণ্ডার মতে 354 দিন পর পর দেওয়া হয়।
আর ইংরেজি ক্যালেণ্ডার মতে দিতে চাইলে 2.6% দিতে হবে।
❌ সোনার দাম পরিবর্তনশীল। এজন্য যেদিন যাকাত আদায় করবেন সেদিন আরো একবার হিসাব করবেন। হতে আরে অল্প কিছু টাকা কম বেশি হতে পারে। এটা উত্তম হবে।
_____
১
১ মন্তব্য