সহকারী শিক্ষক
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৩:৫৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ইসলাম শিক্ষা। নবম দশম শ্রেণির
অধ্যায়-৩ পাঠ ৫
হজ الحج
পরিচয়
হজ ইসলামের পঞ্চম ভিত্তি। 'হজ' এর আভিধানিক অর্থ হলো-
🔹 القَصْدُ — ইচ্ছা করা, সংকল্প করা।
🔹 القَصْدُ إلى مُعَظَّمٍ — কোনো মহান বা মর্যাদাসম্পন্ন বস্তুর দিকে উদ্দেশ্য করে গমন করা।
🔹 كَثْرَةُ القَصْدِ إلى الشَّيءِ — বারবার কোনো কিছুর দিকে যাওয়া বা মনোযোগ দেওয়া।
Pilgrimage – সর্বাধিক প্রচলিত, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পবিত্র স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা।
Religious journey – ইবাদতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ।
Sacred journey – পবিত্র বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে যাত্রা।
Hajj – আরবি শব্দ 그대로 ব্যবহার, ইসলামী প্রেক্ষাপটে প্রামাণ্য।
Devotional journey – আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত ইবাদতপূর্ণ যাত্রা।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, “A journey to a sacred place for religious devotion.”
হজ্জের সংজ্ঞা
১। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের নির্ধারিত দিনসমূহে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাইতুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) ও সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহ যিয়ারত করাকে হজ বলে।
২। হজ্জ হলো— নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানসমূহে (বায়তুল্লাহ ও সংশ্লিষ্ট মাশা‘ইর), নির্দিষ্ট আমলসমূহ (ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতে অবস্থান ইত্যাদি) সম্পাদনের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করা।
৩। আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু (ওহবা যুহাইলী)
এই গ্রন্থে হজ্জের সংজ্ঞা এসেছে—
হজ্জ হলো বায়তুল্লাহর উদ্দেশ্যে সফর করে বিশেষ কিছু আমল সম্পাদন করা, যা শরিয়ত নির্ধারিত করেছে।
৪। আল-মুগনি (ইবন কুদামা)
হজ্জ হলো—বায়তুল্লাহর দিকে গমন করে ইহরামসহ নির্ধারিত কার্যাবলি সম্পাদন করা।
৫। ফাতহুল কাদীর (ইবনুল হুমাম)
হজ্জ হলো—নির্দিষ্ট সময়ে কাবা শরিফের উদ্দেশ্যে ইহরাম বাঁধা এবং আরাফাতে অবস্থানসহ অন্যান্য নির্ধারিত আমল সম্পাদন করা।
৫ জায়গায় ৫ দিনে ৯ কাজ করাকে হজ্জ বলে।
৫ জায়গা
১. মিনা ২. আরাফা ৩. মুজদালিফা ৪. জামারাত
৫. বাইতুল্লাহ
৫ দিন
জিলহজ্জ মাসের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২
৯ কাজ
ফরজ ৩ কাজ
ওয়াজিব ৬ কাজ
যাদের উপর হজ্জ ফরজ
হজ ঐ সমস্ত ধনী মুসলমানের উপর ফরজ যাদের পবিত্র মক্কায় যাতায়াত ও হজের কাজ সম্পাদন করার মতো আর্থিক ও দৈহিক সামর্থ্য রয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন-
অর্থ: আর মানুষের মধ্যে যার আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে তার উপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা অবশ্য কর্তব্য (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৯৭)।
-সামর্থ্যবানদের জন্য হজ জীবনে একবার পালন করা ফরজ।
হাদিসে এসেছে
"একবার রাসূলুল্লাহ স কে জিজ্ঞেস করা হল যে কোন আমলটি অধিক উত্তম? জবাবে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। আবার জিজ্ঞেস করা হল, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। পূনরায় প্রশ্ন করা হল তারপর কোন আমলটি উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, কবুল হজ্জ।" (সহীহ আল-বুখারী: ২৬; সহীহ মুসলিম: ২৫৮, মিশকাত ২৫০৬)
হাদীসে রয়েছে,
عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْقُتُ وَلَمْ يفسق رجع كيوم وَلَدَتْهُ أُمُّهُ : (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
"যে ব্যক্তি হজ্জ সম্পাদন করল এবং কোন প্রকারের অশ্লীল কথা ও কর্ম কিংবা গুনাহ করল না সে যেন সেদিনের ন্যায় নিষ্পাপ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করল যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। (সহীহ আল-বুখারী: ১৫২১। সহীহ মুসলিম, ৩৩৫৭। মিশকাত: ২৫০৭)
রাসূলুল্লাহ স. বলেন,
عن ابن مسعود قال قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَابِعُوا بَيْنَ الْحَج وَالْعُمْرَة فَإِنَّهُما يتقِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنوب كما ينفي الكبر حيث الحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ للحجة المبرورة ثواب إِلَّا الجَنَّة» (رَوَاهُ التَّرْمِدِيُّ والنسائي)
"তোমরা হজ্জ ও উমরাহ পাশাপাশি আদায় কর, কেননা এ দু'টো আমল মানুষের দরিদ্রতা ও গুনাহ এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমনভাবে কর্মকারের ও স্বর্ণকারের হাপর বা আগুন লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা দূর করে দেয়। আর কবুল হজ্জের একমাত্র সওয়াব (প্রতিদান) হচ্ছে জান্নাত। "" (জামি' আত-তিরমিযী: ৮১০, হাসান সহীহ, সুনান আন-নাসাঈ। ২৬৩০, মিশকাত: ২৫২৪)
রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন,
عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلَّمَ مَنْ خَرجَ حَاجًا أَوْ مُعْتَيرًا أو عاريا ثم مات في طريقه كتب الله له أخر العاري والحاج والمعتبرة (رواه البيهقي في شعب الإيمان)
"যে ব্যক্তি হজ্জ বা উমরাহ অথবা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হল অতঃপর পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করল; আল্লাহ তা'আলা তার আমলনামায় হাজী, গাজী ও জিহাদকারীর সওয়াব লিখে দেবেন।" (বাইহাকীর শু'আবুল ঈমান। ৪১০০। মিশকাত। ২৫৩৯, সহীহ)
রাসূল (সা.) বলেছেন,
"যে আল্লাহর পথে ১টি টাকা খরচ করল তার জন্য সাতশ গুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে।" (জামি' আত-তিরমিয়ী। ১৬২৫, সহীহ, সুনান আন-নাসাঈ। ৩১৮৬। মিশকাত: ৩৮২৬)
হজের ফরজ ও ওয়াজিব সমূহ
হজের মোট ৩টি করজ রয়েছে। যথা-
১. ইহরাম বাঁধা (আনুষ্ঠানিকভাবে হজের নিয়ত করা)।
২. ৯ই জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে যিয়ারত (১০ই জিলহজ ভোর থেকে ১২ই জিলহজ পর্যন্ত যেকোনো দিন কাবা শরিফ তাওয়াফ করা)।
হজের ওয়াজিব-৬টি। যথা-
১. ৯ই জিলহজ দিবাগত রাতে মুযদালিফা নামক স্থানে অবস্থান করা।
২. সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ (দৌড়ানো) করা।
৩. ১০, ১১ ও ১২ই জিলহজ পর্যায়ক্রমে মিনায় তিনটি নির্ধারিত স্থানে ৭টি করে কংকর (পাথর কণা) শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করা।
৪. কুরবানি করা।
৫. মাথা কামানো বা চুল কেটে ছোট করা।
৬. বিদায়ী তাওয়াফ করা (এটি মক্কার বাইরের লোকদের জন্য ওয়াজিব)।
হজের ধর্মীয় গুরুত্ব
১। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা হাজ্জ নামে একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।
২। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ হজের ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।
৩। রাসুলুল্লাহ (স.) থেকেও হজের গুরুত্বের ব্যাপারে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন-
الحَجَ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءً إِلَّا الْجَنَّةُ -
অর্থ: মাকবুল (আল্লাহর নিকট গ্রহণীয়) হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নেই (বুখারি-মুসলিম)।
৪। হজের মাধ্যমে বিগত জীবনের গুনাহ মাফ হয়। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি হজ করে সে যেন নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়" (ইবনে মাজাহ)।
৫। হজ অস্বীকারকারী কাফির হয়ে যাবে।
৬।হজ্জের মাধ্যমে ঈমানের পরীক্ষা হয়।
৭। হজ্জের মাধ্যমে ব্যক্তির মানসিকতা প্রশস্ততা লাভ করে।
৭।হজ্জে বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর সকল জাতি ও বর্ণের পাশপাশি সমাবেশ ঘটে।
৮।হজ্জে ইসলামের দাওয়াত সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৯। বিশ্ব মুসলিম জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, ঐক্য ও সহযোগিতার প্রবণতা সৃষ্টি হয়।
১০। পরস্পরে বর্ণগত, ভাষাগত, দেশগত, জাতিগত সকল হিংসা, বিদ্বেষ ও রেষারেষি হজ্জপালনকারীর হৃদয় থেকে মুছে যায়।
১১। হজ্জে সে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে বিশ্ব কত বড় আর সকল মুসলিম কত আপন।
১২। হজ্জ ইসলামী শান-শওকত ও বায়তুল্লাহ শরীফের মর্যাদা প্রদর্শন।
১৩। হজ্জের মাধ্যমে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত বিষয়সমূহের বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়।
১৪। হজ্জ মুমিনদের আখিরাতমুখী করে।
১৫। হজ্জে শেষ বিদায়ের স্মরণ হয়।
১৬। হজ্জের মাধ্যমে ত্যাগ ও কোরবানীর মানসিকতা সৃষ্টি করে।
১৭। হজ্জে ঐতিহাসিক স্থানসমূহ দর্শনের ফলে জিহাদের প্রেরণা সৃষ্টি হয়।
১৮। হজ্জে মহান স্রষ্টার নিকট হাজিরা দেয়া হয়।
সামাজিক গুরুত্ব
১। হজের মাধ্যমে বিশ্বভ্রাতৃত্ব তৈরি হয়।
২। প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম একই স্থানে সমবেত হয়।
৩। হজ বিশ্বমুসলিমের মহাসম্মেলন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, "এবং মানুষের নিকট হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার নিকট (মক্কায়) আসবে পায়ে হেঁটে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে আরোহণ করে। তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে" (সূরা আল-হাচ্ছ, আয়াত ২৭)।
৪। হজে এসে সবাই একই রকম পোশাক পরিধান করে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করে।
৫। হজ্জে সম্মিলিত কণ্ঠে আওয়াজ করে বলতে থাকে লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। হাজির হে আল্লাহ। আমরা তোমার দরবারে হাজির।
৫। হজ্জ জাতি, বর্ণ ও ভাষার ভেদাভেদ দূর করে সাম্যের শিক্ষা দেয়।
৬। হজ্জ পারস্পরিক পরিচয়, সহযোগিতা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করে।
৭। হজ্জ ধৈর্য, সহনশীলতা ও শৃঙ্খলার চর্চা গড়ে তোলে।
৮। হজ্জ সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।
৯। হজ্জ আত্মত্যাগ ও পরোপকারের মানসিকতা বৃদ্ধি করে।
১০। হজ্জ ভিন্ন দেশের মুসলমানদের সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।
হজের শিক্ষা ও তাৎপর্য
১। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়
ধন-সম্পদ, বর্ণ-গোত্র ও জাতীয়তার দিক থেকে মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকলেও হজ এসব ভেদাভেদ ভুলিয়ে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়।
২। হজ মুসলমানদের আদর্শিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে।
৩। হজ্জ রাজা-প্রজা, মালিক-ভৃত্য সকলকে সেলাইবিহীন একই কাপড় পরিধান করায়।
৪। সাম্যের প্রশিক্ষণ দেয়।
৫। হজ মানুষকে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলাবোধের শিক্ষা দিয়ে সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলে।
৬। হজ্জ বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ শেখায়।
৭। হজ্জ পারস্পরিক ভাব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সৌহার্দ্যবোধ জাগ্রত করে।
৮। আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করার কারণে সাধারণ মানুষ হাজিদের সম্মান করে থাকে।
৯। আল্লাহর রহমত পেতে হলে তাঁর আদেশ পালনার্থে ধনী মুসলমানদের যত শীঘ্র সম্ভব হজ আদায় করতে হবে।
১০। হজ্জ করলে জান্নাত লাভ করা যায়।
১১। হজ্জ করলে অভাব অনটন দূর হয়ে যায়।
১২। হজ্জ করলে মানুষের গুনাহ থেকে নিষ্পাপ হয়ে যায়।
১৩। হাজীগণ আল্লাহর মেহমান
১৪। হজ্জ সর্বোত্তম আমল।
১৫।হজ্জ জীবনে একবার ফরজ।
১৪
২১ মন্তব্য