শিক্ষকতায় আমানতদারি: পেশাগত নৈতিকতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা
শিক্ষকতাকে আমরা 'আদর্শ' এবং 'পবিত্র' তকমা দিয়ে অনেক সময় এর ভেতরের পচনকে আড়াল করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে মাধ্যমিক ও মাদ্রাসায় পর্যায়ে কিছু নীতিগত বিচ্যুতি ও কর্মবিমুখতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। যারা সমাজকে আলোর পথ দেখাবেন, তাদেরই আমানতদারিতার অভাবে আজ জাতি এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
১. ৫ মিনিটের হিসাব: সময়ের সূক্ষ্ম চুরি
একজন শিক্ষক যখন ৪০ মিনিটের একটি পিরিয়ডে ৫ মিনিট দেরিতে ঢোকেন এবং ৫ মিনিট আগে বেরিয়ে যান, তখন তিনি কেবল ১০ মিনিট চুরি করেন না, বরং পুরো শিখন প্রক্রিয়াকে পঙ্গু করে দেন।
শিক্ষার্থীদের সাথে কুশল বিনিময় এবং ক্লাসের পরিবেশ তৈরি করতেই চলে যায় কয়েক মিনিট।
এরপর পাঠ উপস্থাপন, দলগত কাজ বা অনুশীলন এবং শেষে মূল্যায়ন করার জন্য যে সময়টুকু প্রয়োজন, তা ওই অবশিষ্টাংশ সময়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ফলাফল? দায়সারা পাঠদান। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যা শেখার কথা ছিল, তা শিখতে না পেরে কোচিং বা প্রাইভেটের দিকে ছুটছে। এই যে সময়ের খেয়ানত, এর জন্য কি পরকালে জবাবদিহি করতে হবে না?
২. রমজান ও কর্মবিমুখতা: ইসলাম কি এমনটা শেখায়?
রমজান মাসে সিয়াম সাধনা মুমিনের ওপর ফরজ। কিন্তু রোজা রাখার অর্থ এই নয় যে, কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়ে অলস সময় পার করতে হবে। আমাদের নবী (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম রমজান মাসে বড় বড় যুদ্ধ জয় করেছেন এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন।
ইসলামে 'কাসবে হালাল' বা হালাল উপার্জনকেও ইবাদত বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়ানোর যে দায়বদ্ধতা শিক্ষকের ওপর অর্পিত, তা পালন না করে পুরো মাস ছুটি কাটানো বা দায়সারা কাজ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মবিমুখতা নয়, বরং রমজানে আরও বেশি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনই প্রকৃত তাকওয়া।
৩. বেতন কি হালাল হচ্ছে? বিবেকের নির্লিপ্ততা
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো 'বিবেকের মৃত্যু'। অনেক শিক্ষক ভাবছেন, "সবাই তো এভাবেই চলছে, আমি একা ঠিক হয়ে কী করব?" এই 'স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া' মানসিকতা একজন আদর্শ শিক্ষকের গুণ হতে পারে না। আপনি যখন সরকারের কাছ থেকে ১০টা-৪টা ডিউটির জন্য পূর্ণ বেতন নিচ্ছেন, তখন সেই সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড জনগণের ট্যাক্সের পয়সার আমানত। যিনি জুম্মার খুতবায় হালাল-হারাম নিয়ে বয়ান করেন, তিনি যখন স্কুল চলাকালীন ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন বা জোহরের নামাজের বাহানায় দীর্ঘ সময় গায়েব থাকেন, তখন তার সেই উপার্জনকে কীভাবে 'তৈয়্যব' বা পবিত্র বলা যায়? ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো হালাল রিজিক। কর্মঘণ্টা চুরি করে করা ইবাদত কি স্রষ্টার দরবারে গ্রহণীয় হবে?
ইসলামি দৃষ্টিকোণ কী বলে? পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"হে মুমিনগণ! তোমরা যা করো না, তা তোমরা কেন বলো?" (সূরা আস-সাফ: ২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি পালন করা ঈমানের অংশ।" একজন শিক্ষক যখন সরকারের কাছ থেকে পূর্ণকালীন বেতন নিচ্ছেন, তখন সেই সময়টুকু প্রতিষ্ঠানের আমানত। সেই সময় চুরি করে ইবাদত করা বা অন্য কাজে ব্যয় করা আমানতের খেয়ানত। খেয়ানতকারীর উপার্জনকে ইসলাম কখনোই পূর্ণ 'হালাল' বলে স্বীকৃতি দেয় না।
৪. গ্রামীণ শিক্ষা ও কারিকুলামের করুণ দশা
শহরের চেয়ে গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৪টায় ছুটি হওয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে দুপুর ১:৩০ বা ২টার পরেই তালা ঝুলে যায়। আমাদের বর্তমান শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম এমনভাবে সাজানো যেখানে প্রতিটি 'লার্নিং আওয়ার' বা শিখন ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি নির্ধারিত সময়ের অর্ধেক আগেই স্কুল ছুটি হয়ে যায়, তবে কারিকুলামের বিভাজন ও শিখনফল অর্জিত হবে কীভাবে? এই বিশাল ঘাটতি নিয়ে ছাত্ররা যখন উচ্চতর ধাপে যায়, তখন তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। এটি কি শিক্ষার্থীদের সাথে এক প্রকার প্রতারণা নয়?
৫. শিক্ষকদের সম্মান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
আজ শিক্ষকরা অভিযোগ করেন যে সমাজ বা রাষ্ট্র তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করে না। কিন্তু মূল্যায়ন তো কাজের মাধ্যমে আদায় করে নিতে হয়। যখন একজন শিক্ষক নিজেই নিজের ডিউটি ফাঁকি দেন, পরীক্ষার হলে অসাধু উপায়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করেন (যা বিশেষ করে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় দৃশ্যমান), তখন তিনি নিজের সম্মান নিজেই ধূলিসাৎ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যে কড়াকড়ি দেখা যায়, তার সামান্য অংশও যদি মাধ্যমিক ও মাদ্রাসায় থাকত, তবে শিক্ষার মান আজ অন্য উচ্চতায় থাকত।
উপসংহার: উত্তরণের পথ কোথায়?
এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে সবার আগে প্রয়োজন 'আত্মোপলব্ধি'। শিক্ষকতা কোনো সাধারণ চাকরি নয়, এটি একটি আমানত।
ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: অন্যেরা কী করছে তা না দেখে নিজের আয়ের প্রতিটি টাকা হালাল কিনা তা ভাবুন।
প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি: স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
নৈতিক জাগরণ: রমজান বা ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কর্মবিমুখতার অজুহাত না বানিয়ে বরং ত্যাগের মহিমায় দায়িত্ব পালনের অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে হবে।
মনে রাখবেন, জাতির মেরুদণ্ড গড়ার কারিগর যদি নিজেই মেরুদণ্ডহীন এবং চোর হন, তবে সেই জাতির পতন অনিবার্য। আসুন, আমরা ফাঁকিবাজি ত্যাগ করি এবং নিজেদের সম্মান ও পেশার পবিত্রতা রক্ষা করি।
১
১ মন্তব্য