Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৬:২৩ অপরাহ্ণ

ইমান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

ইসলাম শিক্ষা।  নবম দশম শ্রেণির 


১ম অধ্যায় পাঠ-২ ইমান 


পাঠ ২ 


ইমানের পরিচয় 


ইমান الإيمان 


ইমান (৩) শব্দটি আমনুন (৩) মূল ধাতু থেকে নির্গত। এর অর্থ- বিশ্বাস করা, আস্থা স্থাপন, স্বীকৃতি দেওয়া, নির্ভর করা, মেনে নেওয়া, 

التَّصْدِيقُ

Affirmation / Confirmation / Belief

অর্থ: সত্য বলে মেনে নেওয়া, অন্তরে দৃঢ়ভাবে স্বীকার করা।

الإِقْرَارُ

Acknowledgment / Admission

অর্থ: মুখে স্বীকার করা, স্বীকৃতি প্রদান।

الاعْتِقَادُ

Conviction / Creed / Firm belief

অর্থ: অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস বা আকীদা।

الأَمَانُ

Security / Safety

অর্থ: নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা (যে বিশ্বাস ভয় দূর করে নিরাপত্তা দেয়)।

الثِّقَةُ

Trust / Confidence

অর্থ: আস্থা বা ভরসা করা।




ইমানের সংজ্ঞা 

১। ইসলামি পরিভাষায়, শরিয়তের যাবতীয় বিধি-বিধান অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং তদনুযায়ী আমল করাকে ইমান বলে। 


২।  ইমানের পরিচয় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- 


أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدْرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ 


অর্থ: ইমান হচ্ছে, আল্লাহ, তার ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, পরকাল এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের (ভালো-মন্দ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই হয়) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা (মুসলিম)। 


৩।  ইসলামের মূল বিষয়গুলোর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসকেই বলা হয় ইমান। 


ইমানে মুফাসসালে ইমানের মৌলিক বিষয়গুলো একত্রে বর্ণিত হয়েছে। যেমন- 


أمَنْتُ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْقَدْرِ خَيْرِهِ وَغَيْرِهِ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى وَالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ 


অর্থ: আমি ইমান আনলাম আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাগণের প্রতি, তার কিতাবগুলোর প্রতি, তার রাসুলগণের প্রতি, আখিরাতের প্রতি, তাকদিরের প্রতি যার ভালো-মন্দ আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকেই হয় এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি।



৪।  ইমাম আবু হানিফা (রহ.)

আবু হানিফা বলেন—

“ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা।” 


৫। আহলুস সুন্নাহর সংজ্ঞা

الإيمان قول باللسان وتصديق بالقلب وعمل بالأركان

অর্থাৎ—

ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল।



ঈমানদারের জন্য জান্নাত অবধারিত 


রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: « لَا يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ » (رَوَاهُ مُسلم) 


"কারও অন্তরে শস্যদানা পরিমাণ ঈমান থাকা অবস্থায় সে জাহান্নামে যাবে না।" 


(সহীহ মুসলিম: ২৭৬, মিশকাত: ৫১০৭) 


দুনিয়ায় কল্যাণময় জীবন লাভ 


আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 


وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ ﴾ 


"আর যদি জনপদের (পৃথিবীর) অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং পরহিযগারী অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানী ও পার্থিব নেয়ামতসমূহ উম্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের কারণে।" (সূরা আ'রাফ: ৯৬) 


একজন ঈমানদার থাকা পর্যন্ত কিয়ামত হবে না 


মুমিনদের সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ : اللَّهُ اللَّهُ " (رَوَاهُ مُسلم) 


"কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে না যতক্ষণ না দুনিয়ায় আল্লাহ আল্লাহ আর বলা হবে না। অর্থাৎ দুনিয়ায় কোন ঈমানদার থাকবে না।" (সহীহ মুসলিম: ৩৯২, মিশকাত: ৫৫১৬)




মুমিনের পরিচয় 

১। যিনি  সাতটি বিষয়ে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেন, তাকে বলা হয় মুমিন। 


২। মুমিন হলো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল, আখিরাত ও তাকদিরে বিশ্বাস করে এবং সে বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করে।

৩। যার অন্তরে দৃঢ় ঈমান এবং জীবনে সৎকর্মের প্রকাশ আছে—সেই প্রকৃত মুমিন।

৪। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, মানুষের উপকার করে এবং শরীয়তের বিধান মানে—সে মুমিন। 


৫. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত—

“তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” 


৬।  অন্য হাদিসে এসেছে—

“মুমিন সে ব্যক্তি, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” 


৭। সূরা আল-আনফাল ২–৪

আল-কুরআন-এ আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ...

“নিশ্চয়ই মুমিন তো তারাই—যাদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হলে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে; যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই প্রকৃত মুমিন।” 


মুমিনের গুণাবলী 


খুশু-খুজুর (একাগ্রতার) সাথে সালাত আদায় করা। কুরআনুল কারীমে রয়েছে, الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ) 


"আর তারা (মুমিনরা) তাদের সালাতে বিনয়ী।" (সূরা মুমিনূন: ২) 


বিনয় ও নমতার সাথে চলাফেরা করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন, 


وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا ) 


"রহমান (আল্লাহ তা'আলা)-এর বান্দা তারাই যারা নমভাবে যমিনে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, সালাম।” (সূরা ফুরকান: ৬৩) 


খরচে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন, 


وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا ﴾ 


"আর তারা খরচের সময় অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না বরং এ দু' এর মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেন।" (সূরা ফুরকান: ৬৭) 


যৌবনের হিফাযত করা: আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ﴾ 


"আর তারা তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী।" (সূরা মুমিনূন: ৫; সূরা মা'আরিজ: ২৯) 


আমানত সংরক্ষণ করা: আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ ) 


"আর তারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতিকে রক্ষা করে।" (সূরা মুমিনূন: ৮: সূরা মা'আরিজ: ৩২) 


প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً ) 


"আর তোমরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা কর, কেননা প্রতিশ্রুতি পালন সম্পর্কে তোমাদেরকে জবাবদিহি করা হবে।" (সূরা বানী ইসরাঈল: ৩৪) 


অনর্থক ক্রিয়া কর্ম থেকে বিরত থাকা: আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ ) 


وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الرُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا ) "তারা অনর্থক ক্রিয়া কর্ম থেকে বিরত থাকে।" (সূরা মুমিনূন: ৩) 


"এবং যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়।" (সূরা ফুরকান: ৭২) 


নবীর স. প্রতি সর্বাপেক্ষা মহব্বত রাখা: রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ) 


"তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতামাতা, সন্তান সন্ততি ও সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়েছি।" (সহীহ আল-বুখারী: ১৫, সহীহ মুসলিম: ১৭৮ মিশকাত: ৭) 


পরের ব্যথায় নিজের মতই ব্যথিত হওয়া: হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


إِنَّ الْمُؤْمِنَ مِنْ أَهْلِ الْإِيمَانِ بِمَنْزِلَةِ الرَّأْسِ مِنَ الْجَسَدِ يَأْلَمُ الْمُؤْمِنُ لِأَهْلِ الْإِيمَانِ كَمَا يَأْلَمُ الْجَسَدُ لِمَا فِي الرَّأْسِ» (احمد) 


"ঈমানদারদের মাঝে মুমিনের দৃষ্টান্ত এরূপ হওয়া চাই যেরূপ দেহের মধ্যে মাথার উদাহরণ। একজন ঈমানদার ব্যক্তি অন্যান্য মুমিনদের ব্যথায় সেরূপ ব্যথীত হয়, যেরূপ ব্যথীত হয় মাথা ব্যাথার কারণে সমগ্র দেহ।" (মুসনাদে আহমদ: ২২৮৭৭, সহীহ লি-গাইরিহী) 


"মুমিন কখনও একই গর্ত থেকে দু' বার দংশিত হয় না।" (সহীহ আল-বুখারী: ৬১৩৩, সহীহ মুসলিম: ৭৬৯০, মিশকাত: ৫০৫৩) 


অভুক্ত প্রতিবেশির প্রতি খেয়াল রাখা: রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعُ إِلَى جَنْبِهِ (رَوَاهُ الْبَيْهَقِي فِي شعب الْإِيمَان) 


"সে ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে তৃপ্তি সহকারে আহার করে, কিন্তু পাশেই তার এক প্রতিবেশি ক্ষুধার্ত থাকে (সে তার কোন খোঁজ-খবর নেয় না)।" (বাইহাকী'র শুআবুল ঈমান: ৩৩৮৯, মিশকাত: ৪৯৯১, সহীহ) 


অন্যের জান-মাল তার থেকে নিরাপদে থাকা। রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ (رَوَاهُ التَّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِي) 


"(প্রকৃত) মুসলিম হল সেই ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর (প্রকৃত) মু'মিন হল সেই ব্যক্তি লোকেরা তাদের জান ও মালের বিষয়ে যে ব্যক্তির উপর আস্থা রাখতে পারে।" (জামি' আত-তিরমিযী: ২৬২৭, সুনান আন-নাসাঈ: ৪৯৯৫, মিশকাত: ৩৩, সহীহ) 


অপরাধ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাওবা করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন, 


إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا - وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارُ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا) 


"নিশ্চয় আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে। তারপর শীঘ্রই তাওবা করে। অতঃপর আল্লাহ এদের তাওবা কবুল করবেন আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। আর তাওবা নাই তাদের, যারা অন্যায় কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন বলে, আমি এখন তাওবা করলাম, আর তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা কাফির অবস্থায় মারা যায়; আমি এদের জন্যই তৈরী করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব।" (সূরা নিসা: ১৭-১৮) 


মিথ্যা ও খিয়ানত থেকে বিশেষভাবে বিরত থাকা: রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, 


عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُطْبَعُ الْمُؤْمِنُ عَلَى الْخِلَالِ كُلِّهَا إِلَّا الْحَيَانَةَ وَالْكَذِبَ (رَوَاهُ أَحْمد) 


"মুমিনগণের মধ্যে সব রকম দোষের সমাবেশ ঘটতে পারে কিন্তু খেয়ানত ও মিথ্যা এ দু'টি স্বভাবের সমাবেশ ঘটতে পারে না।" (মুসনাদে আহমাদ: ২২২২৪, মিশকাত: ৪৮৬০, যঈফ) 


একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটা: মুমিনগণ দ্বীন ও ঈমান বিষয়ে এমন সচেতন হবেন যে, ভুলক্রমে একবার তার দ্বারা কোন অপরাধ হলেও দ্বিতীয়বার সে ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না। عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبي - صلى الله عليه وسلم - قَالَ « لَا يُلْدَعُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ . (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)




ইমান ও ইসলামের সম্পর্ক 


১। ইমান ও ইসলাম দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা।

২। ইমান অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও তদনুযায়ী আমল করাকে ইমান বলা হয়। 


২।  ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ, আনুগত্য ইত্যাদি। মহান আল্লাহর যাবতীয় আদেশ নিষেধ বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তার প্রতি পূর্ণাঙ্গরূপে আত্মসমর্পণ করার নাম হলো ইসলাম। 


৩। এদের একটি ব্যতীত অন্যটি কল্পনাও করা যায় না।

৪।  এদের একটি অপরটির উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

৫।  ইমান ও ইসলামের সম্পর্ক গাছের মূল ও শাখা-প্রশাখার মতো। ইমান হলো গাছের শিকড় বা মূল আর ইসলাম তার শাখা-প্রশাখা। মূল না থাকলে শাখা-প্রশাখা হয় না। আর শাখা-প্রশাখা না থাকলে মূল বা শিকড় মূল্যহীন। 


৬।  ইমান ও ইসলাম একটি অন্যটি ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ হয় না। 

৭। ইমান মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, অনুরাগ ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের বাসনা সৃষ্টি করে। আর তাতে ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে সজীব ও সতেজ হয়ে পরিপূর্ণ সৌন্দর্যে বিকশিত হয় ইসলাম। 


৮। ইসলাম হলো ইমানের বহিঃপ্রকাশ। ইমান হলো অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত। 

৯। ইসলাম বাহ্যিক আচার-আচরণ ও কার্যাবলির সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- আল্লাহ, রাসুল, ফেরেশতা ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্বাস করা হলো ইমান। আর সালাত, যাকাত, হজ ইত্যাদি বিষয় পালন করা হলো ইসলাম। 


১০।  ইমান ও ইসলাম একটি অপরটির পরিপূরক। 

১১। দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করতে হলে ইমান ও ইসলাম উভয়টিকেই পরিপূর্ণভাবে স্বীয় জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।



মৌলিক বিষয় সমূহ সম্পর্কে 



আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস 

-ইমানের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয়ে ব্যাখ্যা কর। 


১।ইমানের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয় হলো আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস। 

২।আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়। 

৩।আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই। 

৪।আল্লাহ তায়ালা সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা।

৫। আল্লাহ তায়ালা সকল গুণের আধার (আশ্রয়স্থল)। 

৬। আল্লাহ তায়ালার সত্তা ও গুণাবলি তুলনাহীন।

৭।  সমস্ত প্রশংসা ও ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য নির্ধারিত।

৮। আল্লাহ তায়ালা পরকালের ন্যায় বিচারক। 

৯। আল্লাহ তায়ালা অতি দয়ালু। 

১০। আল্লাহ তায়ালা রক্ষণাবেক্ষণাকারী।



২. ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস 


১। ফেরেশতাগণ মহান আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি। 

২। ফেরেশতারা  নুরের তৈরি। 

৩। ফেরশতরা সবসময় আল্লাহ তায়ালার ইবাদত ও হুকুম পালনে নিয়োজিত।

৪।  ফেরেশতাদের  সংখ্যা অগণিত।

৫।  ফেরেশতারা নারীও নন, পুরুষও নন। 

৬। ফেরশতারা পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে মুক্ত। 

৭। ফেরশতারা নবি রাসূলগনের নিকট ওহি পৌঁছে দেন।

৮। ফেরেশতারা বৃষ্টি, বাতাস ও রিজিক বণ্টনের দায়িত্বে আছেন।

৯। হযরত আজরাইল (আ.) মৃত্যু ঘটান, অন্যান্য ফেরেশতা কবর ও হাশরের কাজে নিয়োজিত

১০। কিরামান কাতিবিন ফেরেশতা মানুষের ভালো-মন্দ কাজ লিখে রাখেন।




৩. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস

-আসমানী কিতাবে বিশ্বাস করতে হবে কেন? 


১।আসমানি কিতাবসমূহ আল্লাহ তায়ালার বাণী। 

২। আসমানি কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে নিজ পরিচয় প্রদান করেছেন। 

৩। নানা আদেশ-নিষেধ, বিধি-বিধান, সুসংবাদ, সতর্কবাণী ইত্যাদিও আসমানি কিতাবের মাধ্যমেই এসেছে।

৪।  আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলগণের নিকট আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন। 

৫। দুনিয়াতে সর্বমোট ১০৪ খানা আসমানি কিতাব নাজিল করা হয়েছে। 

৬।কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আসমানি কিতাবসমূহে বিশ্বাস করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

৭। আসমানি কিতাবে বিশ্বাস করা ঈমানের ৬টি রুকনের একটি।

৮। আসমানি কিতাব মানুষকে হিদায়াত ও সৎপথ দেখানোর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।

৯। আসমানি কিতাবের মাধ্যমেই হালাল–হারাম ও ন্যায়–অন্যায়ের শিক্ষা জানা যায়।

১০। আসমানি কিতাব মানুষের চরিত্র গঠন করে ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।





৪. নবি-রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস 


১। মানব জাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বহু নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন। 

২। নবি-রাসুলগণ ছিলেন আল্লাহ তায়ালার মনোনীত বান্দা। 

৩। সকল সৃষ্টির মধ্যে তাঁরাই সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। 

৪। তাঁরা ছিলেন নিষ্পাপ।

৫। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তাঁরা মানব জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন; মহান আল্লাহর পথে ডেকেছেন, সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখিয়েছেন, ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও মুক্তির দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

৬। আল্লাহ তায়ালা নবি–রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস করতে আদেশ করেছেন।

৭। নবি–রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস করা ঈমানের ৬টি রুকনের একটি।

৮। আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন নবি–রাসূলগণই।

৯। নবি–রাসূলগণ ছিলেন বাস্তব জীবনে অনুসরণযোগ্য সর্বোত্তম আদর্শ।

১০। সমাজে ন্যায়বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নবি–রাসূলগণ সংগ্রাম করেছেন।





৫. আখিরাতে বিশ্বাস

- আমিরাতে বিশ্বাস জরুরি কেন? 


১। আখিরাত হলো পরকাল। 

২। আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। 

৩। আখিরাত জীবনের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। 

৪। আখিরাতে  মানুষকে দুনিয়ার জীবনের সকল কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে। 

৫। কবর, হাশর, মিযান, সিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি আখিরাত জীবনের এক একটি পর্যায়।

৬।  দুনিয়াতে ভালো কাজ করলে মানুষ জান্নাত লাভকরবে। 

৭। ইমান না আনলে, অসৎ কাজ করলে মানুষের স্থান হবে ভীষণ আযাবের স্থান জাহান্নাম। 

৮। কুরআনে আখিরাতে বিশ্বাস করার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।

৯। আখিরাতে বিশ্বাস করা ঈমানের ৬টি রুকনের একটি।

১০। আখিরাতমুখী জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।

১১। মৃত্যুর সাথে সাথেই মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় না। 

১২।  মানবজীবন দুইভাগে বিভক্ত। ইহকাল ও পরকাল। ইহকাল হলো দুনিয়ার জীবন। আর পরকাল হলো মৃত্যুর পরবর্তী জীবন।

১৩।  আল্লাহ তায়ালা মানুষকে মৃত্যুর পর আবার জীবিত করবেন। সে সময় সকল মানুষ হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে। আল্লাহ তায়ালা সেদিন বিচারক হিসেবে মানুষের সকল কাজের হিসাব নেবেন। 

১৪। মানুষকে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কার স্বরূপ জান্নাতে ও মন্দ কাজের শাস্তিস্বরূপ জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। 

১৫।  মৃত্যুর পর আমরা সবাই পুনরায় জীবিত হব এ বিশ্বাস রাখা ইমানের অপরিহার্য বিষয়।

১৬। আখিরাতে বিশ্বাস করা ঈমানের ৬টি রুকনের একটি।

১৭। সব নবি–রাসূল আখিরাতের কথা গুরুত্বসহকারে স্মরণ করিয়েছেন।





৬. তাকদিরে বিশ্বাস

-তাকদিরে বিশ্বাস ইমানের অংশ 

-তাকদিরে বিশ্বাস জরুরি কেন? 



১। তাকদির অর্থ হলো নির্ধারিত পরিমাণ, ভাগ্য বা নিয়তি।

২।  আল্লাহ তায়ালা মানুষের তাকদিরের নিয়ন্ত্রক। 

৩। আল্লাহ তায়ালা  তাকদিরের ভালোমন্দ নির্ধারণকারী। 

৪। মানুষ যা চায় তা-ই সে করতে পারবে না। বরং মানুষ শুধু তার কাজের জন্য সাধনা করবে। অতঃপর ফলাফলের জন্য আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করবে। যদি চেষ্টা করার পরও কোনো কিছু না পায় তবে হতাশ হবে না। আর যদি পেয়ে যায় তবুও খুশিতে আত্মহারা হবে না। বরং সবর (ধৈর্য) ধারণ করবে ও শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায় করবে। 

৫।তাকদিরের ভালোমন্দ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার হাতে।

৬। তাকদিরে বিশ্বাস করা ঈমানের ৬টি রুকনের একটি।

৭।অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সবকিছু আল্লাহ আগেই জানেন।

৮। তাকদিরে বিশ্বাস মানুষকে দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে রক্ষা করে।

৯। দুনিয়ার ঘটনা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা—এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়।

১০। তাকদিরে বিশ্বাস বিপদে ধৈর্য এবং সুখে কৃতজ্ঞ হতে সাহায্য করে। 


ঈমান ভঙ্গের ১০টি কারণ: 


(১) আল্লাহর সাথে কারও শরীক করা।

(২) আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মাধ্যম বানানো।

(৩) কাফের-মুশরিকদের কাফির মনে না করা।

(৪) রাসূল (স) এর কথার চেয়ে অন্য কারও কথাকে উত্তম মনে করা।

(৫) রাসূল (স) এর কোন বিধানকে অপছন্দ করা।

(৬) দ্বীনের কোন বিধান নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করা।

(৭) জাদু করা।

(৮) মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফির-মুশরিকদের সাহায্য করা।

(৯) কাউকে শরীয়াতের উর্ধ্বে মনে করা।

(১০) দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।


মু. নাজিম উদ্দীন 

সহকারী শিক্ষক,  চুনতি মেহেরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। 

মন্তব্য করুন