প্রভাষক
০৫ মার্চ, ২০২৬ ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ
বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনাপর্ব
বাংলায় ব্রিটিশ বা ইংরেজ শাসনের সূচনা কোনো একক ঘটনার ফল ছিল না, বরং এটি ছিল ধাপে ধাপে ক্ষমতা দখলের একটি প্রক্রিয়া। নিচে এর বিস্তারিত পর্যায়গুলো আলোচনা করা হলো:
১. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন ও বাণিজ্য বিস্তার
১৬০০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রানীর সনদ নিয়ে ভারতে আসে। ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফররুখশিয়ারের ফরমান লাভের মাধ্যমে তারা বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্যের অধিকার পায়। এই অধিকারের অপব্যবহার এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে স্থানীয় নবাবদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
২. পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)
সূচনাপর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো পলাশীর যুদ্ধ। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন কোম্পানির দুর্গ নির্মাণ ও অবাধ্যতার প্রতিবাদ করেন, তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে।
তারিখ: ২৩ জুন, ১৭৫৭।
পরিণতি: মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব পরাজিত ও নিহত হন। ইংরেজরা মীর জাফরকে পুতুল নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসায় এবং বাংলার প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতে চলে যায়।
৩. বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪)
মীর জাফরের পর মীর কাশিম স্বাধীনভাবে চলার চেষ্টা করলে ইংরেজদের সাথে তার যুদ্ধ হয়। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাশিম, অযোধ্যার নবাব এবং মুঘল সম্রাট শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়। এটি প্রমাণ করে যে, ইংরেজরা কেবল একটি বাণিজ্যিক শক্তি নয়, বরং একটি শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
৪. দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫)
বক্সারের যুদ্ধের পর লর্ড ক্লাইভ মুঘল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার 'দেওয়ানি' (রাজস্ব আদায়ের আইনি অধিকার) লাভ করেন। এর ফলে কোম্পানি বাংলার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পায়, যদিও নামমাত্র নবাব ক্ষমতায় ছিলেন।
৫. দ্বৈত শাসন ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর
ক্লাইভ বাংলায় 'দ্বৈত শাসন' ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এতে নবাবের হাতে থাকে দায়িত্ব কিন্তু ক্ষমতা নেই, আর কোম্পানির হাতে থাকে ক্ষমতা কিন্তু কোনো দায়িত্ব নেই। এর ফলে ব্যাপক লুণ্ঠন ও শোষণের ফলে ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বা 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' ঘটে, যাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়।
৬. রেগুলেটিং অ্যাক্ট ও ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২-১৭৭৩)
১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসন রদ করে সরাসরি কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৭৩ সালের 'রেগুলেটিং অ্যাক্ট' পাসের মাধ্যমে ফোর্ট উইলিয়ামকে কেন্দ্র করে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং হেস্টিংস বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল হন।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাংলা একটি স্বাধীন প্রদেশ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়।
৫
৫ মন্তব্য