Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ মার্চ, ২০২৬ ০৩:০২ অপরাহ্ণ

তাজহাট রংপুরের জমিদার বাড়ি ও পুরাতন ইতিহাস

তাজহাট জমিদার বাড়ি ও রংপুরের পুরাতন ঐতিহ্য


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন শহর রংপুর ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। শতাব্দীপ্রাচীন এই জনপদে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পুরাকীর্তি, যা আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


তাজহাট জমিদার বাড়ি: স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন


রংপুর শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে তাজহাট গ্রামে অবস্থিত তাজহাট জমিদার বাড়ি । বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১৭ সালে, যাতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর এবং ব্যয় হয়েছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা ।


নামকরণের ইতিহাস


মহারাজা গোপাল লাল রায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। তিনি হীরা-মানিক খচিত 'তাজ' বা মুকুটের ব্যবসা করতেন এবং এখানে তাজ বিক্রির জন্য হাট বসত। সেই থেকেই এই এলাকার নাম হয় 'তাজহাট' এবং জমিদার বাড়ির নাম তাজহাট জমিদার বাড়ি ।


স্থাপত্যশৈলী


প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত ও চার তলার সমান উঁচু । এর গঠনশৈলী প্রাচীন মুঘল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত, যার প্রমাণ মেলে মধ্যভাগের বিশাল গম্বুজ ও দুই পাশে ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোতে ।


এখানে সর্বমোট ৩১টি সিঁড়ি আছে, যার প্রতিটিই ইতালীয় ঘরানার মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি থেকে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটাও একই পাথরে মোড়ানো । রাজবাড়ির পশ্চাৎভাগে রয়েছে গুপ্ত সিঁড়ি, যা কোনও সুড়ঙ্গের সাথে যুক্ত হয়ে সরাসরি ঘাঘট নদীতে গিয়ে মিশত বলে জনশ্রুতি আছে ।


বর্তমান অবস্থা


১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাসাদটিকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘরকে এ প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয় । বর্তমানে জাদুঘরে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম, সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, মুঘল সম্রাট আওরাঙ্গজেবের সময়ের কুরআন, মহাভারত ও রামায়ণের পাণ্ডুলিপি এবং কালো পাথরের হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতি সংরক্ষিত আছে ।


জাদুঘরটি সপ্তাহে রবিবার বন্ধ থাকে এবং অন্যান্য দিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য ২০ টাকা ।


রংপুরের অন্যান্য ঐতিহ্য


রংপুর জেলায় আরও অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে:


· কারমাইকেল কলেজ ভবন: ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ ভবন রংপুরের শিক্ষার ইতিহাসের সাক্ষী ।

· পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার বাড়ি: নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার স্মৃতিধন্য এই বাড়ি ।

· কেরামতিয়া মসজিদ: মুঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই মসজিদ রংপুরের অন্যতম পুরাকীর্তি ।

· মন্থনার জমিদার বাড়ি: রংপুরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য জমিদার বাড়ি ।

· রংপুর জাদুঘর: তাজহাট জমিদার বাড়িতে স্থানান্তরের আগে এটি ছিল জাদুঘরের পুরনো ভবন ।

· হযরত শাহজালাল বোখারীর মাজার: রংপুরের অন্যতম ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র ।


রংপুরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য


রংপুর ভাওয়াইয়া গানের আকরভূমি হিসেবে বিখ্যাত । ৭০০ বছরের ঐতিহ্যের ধারক শতরঞ্জি (পাটের তৈরি বিছানার চাদর) রংপুরের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত । এছাড়া হাড়িভাঙ্গা আম, আলু ও তামাক উৎপাদনের জন্যও রংপুর বিখ্যাত ।


রংপুরের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে দেশি শাক-সবজির ব্যবহার বেশি এবং এখানকার বিখ্যাত "কালা ভুনা" বিশেষ কায়দায় তৈরি করা হয় । পান রংপুরের মানুষের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে ভাওয়াইয়া গানে পান প্রেম ও আপ্যায়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।


নামকরণের ইতিহাস


রংপুরের নামকরণ নিয়ে নানা মত আছে। কেউ কেউ মনে করেন, মহাভারতের সময়ে প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভগদত্তের রঙ্গমহল ছিল রংপুরে এবং সেই রঙ্গমহল হতে নাম হয়েছে রঙ্গপুর । আবার অনেকের মতে, এখানে পাটের বস্ত্রে রং করা হতো বলে প্রথমে 'রংরেজপুর' এবং পরে 'রঙ্গপুর' নাম হয় । ঐতিহাসিকদের মতে, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর শাসন আমলে ফার্সি শব্দ থেকে রঙ্গপুর নামের উদ্ভব ।


কিভাবে যাবেন


ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের বাস রংপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া পড়বে ৫৫০-৯০০ টাকা । রংপুর শহর থেকে তাজহাট জমিদার বাড়ি যেতে রিকশা বা সিএনজি পাওয়া যায়।


ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এই নগরী রংপুরে একবার ঘুরে এলে আপনি মুগ্ধ হবেন এর প্রাচীন স্থাপত্য আর সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে।



ছবিঃ আমার ক্যামেরায় ক্লিক!

মন্তব্য করুন