সহকারী শিক্ষক
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৪১ অপরাহ্ণ
স্মার্টফোনের ভেতরে কী আছে: SoC, Modem ও সেন্সর বিশ্লেষণ
আমরা প্রতিদিন স্মার্টফোন ব্যবহার করি। সকালে অ্যালার্ম বাজে, রাতে ঘুমানোর আগে ভিডিও দেখি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, এই ছোট্ট ডিভাইসটার ভেতরে আসলে কী আছে? কোন জিনিসটা ফোনকে এত স্মার্ট করে তোলে?
কম্পিউটার অপারেশন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করার সময় আমি দেখেছি, অনেক মানুষ ফোন কেনার সময় শুধু ক্যামেরা আর ব্যাটারির দিকে নজর দেন। কিন্তু ফোনের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে ভেতরে, যেটা খালি চোখে দেখা যায় না।
আজকের এই লেখায় আমি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব স্মার্টফোনের ভেতরের তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ: SoC, Modem এবং সেন্সর। এগুলো বুঝলে আপনি পরের বার ফোন কেনার সময় অনেক বেশি সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
SoC কী? কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ?
SoC মানে হলো System on a Chip। বাংলায় বললে, একটাই ছোট চিপের মধ্যে পুরো একটা সিস্টেম।
আপনি যদি কোনোদিন পুরনো ডেস্কটপ কম্পিউটার খুলে দেখে থাকেন, তাহলে দেখেছেন আলাদা আলাদা অনেক পার্টস লাগানো থাকে: প্রসেসর, গ্রাফিক্স কার্ড, নেটওয়ার্ক কার্ড ইত্যাদি। কিন্তু স্মার্টফোনে এই সব কিছু একসাথে একটাই চিপে ঢোকানো থাকে। এটাই SoC।
একটা SoC-এর ভেতরে মূলত যা থাকে:
- CPU (Central Processing Unit): এটা হলো ফোনের মস্তিষ্ক। আপনি অ্যাপ খুললে, ম্যাসেজ পাঠালে বা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করলে CPU সেই কাজগুলো করে। প্রসেসর (CPU) কি? কিভাবে কাজ করে? এর গঠন এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন আমার আগের লেখায়।
- GPU (Graphics Processing Unit): গেম খেলা বা ভিডিও দেখার সময় যে স্মুথ গ্রাফিক্স দেখেন, সেটা GPU-র কাজ। GPU ছাড়া ফোনে গেম খেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
- NPU (Neural Processing Unit): এটা হলো AI-এর জন্য আলাদা একটা চিপ। ক্যামেরায় চেহারা চেনা, কণ্ঠস্বর বোঝা বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবির মান উন্নত করা, এই সব কাজ NPU করে। আধুনিক ফোনে এটা অনেক জরুরি।
- ISP (Image Signal Processor): ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার পর সেই ছবিকে সুন্দর করে প্রসেস করার কাজ ISP করে। রাতের বেলায় ভালো ছবি উঠলে সেটা ISP-এর কৃতিত্ব।
বাংলাদেশে কোন SoC বেশি দেখা যায়?
আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় MediaTek-এর চিপসেট। কারণ বাজেট ফোনে MediaTek Helio সিরিজ অনেক জনপ্রিয়। মিড-রেঞ্জে Snapdragon 4s বা 6s সিরিজের ফোনও পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের সেরা চিপসেটগুলোর মধ্যে আছে:
- Snapdragon 8 Elite Gen 5 (Qualcomm)
- Dimensity 9500 (MediaTek)
- Apple A19 Pro (Apple)
- Exynos 2600 (Samsung)
তবে এই ফ্ল্যাগশিপ চিপসেটগুলো সাধারণত ৫০ হাজার টাকার বেশি দামের ফোনে থাকে। সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য মিড-রেঞ্জ চিপসেটই যথেষ্ট।
একটা কথা মনে রাখবেন, SoC শুধু প্রসেসর না। এটা পুরো একটা সিস্টেম। তাই ফোন কেনার সময় শুধু "কত GHz" দেখলেই হবে না, কোন চিপসেট সেটাও দেখুন।
Modem কী? ফোন কীভাবে নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়?
Modem শব্দটা অনেকে শুনেছেন হয়তো ইন্টারনেট রাউটারের ক্ষেত্রে। কিন্তু আপনার ফোনের ভেতরেও একটা Modem আছে।
সহজ ভাষায় বললে, Modem হলো সেই যন্ত্র যেটা আপনার ফোনকে মোবাইল নেটওয়ার্কের (যেমন Grameenphone বা Robi) সাথে কথা বলতে সাহায্য করে। কল করা, ইন্টারনেট ব্যবহার করা, SMS পাঠানো, সব কিছুই Modem-এর মাধ্যমে হয়।
আধুনিক ফোনে Modem সাধারণত SoC-এর ভেতরেই থাকে। এটাকে বলা হয় Integrated Modem। তবে কিছু ফোনে আলাদা External Modem থাকে।
4G বনাম 5G Modem
বাংলাদেশে এখন 4G LTE নেটওয়ার্ক চলছে। কিছু শহরে সীমিতভাবে 5G পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে।
4G Modem দিয়ে সাধারণত ১০০ Mbps পর্যন্ত গতি পাওয়া যায়। 5G Modem দিয়ে এই গতি কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। তবে 5G-এর সুবিধা পেতে হলে নেটওয়ার্ক কভারেজও থাকতে হবে।
এখন অনেক মিড-রেঞ্জ ফোনেও 5G Modem দেওয়া হচ্ছে। তাই বাংলাদেশে 5G আসলে আলাদা ফোন কিনতে হবে না, যদি আপনার বর্তমান ফোনে 5G সাপোর্ট থাকে।
Modem-এর সাথে আরো কিছু থাকে ফোনে: Wi-Fi চিপ, Bluetooth, NFC, GPS। এগুলোও মূলত ফোনের connectivity-র অংশ এবং অনেক ক্ষেত্রে SoC-এর মধ্যেই যুক্ত থাকে
স্মার্টফোনের সেন্সর: ছোট কিন্তু অনেক কাজের
স্মার্টফোনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটা হলো সেন্সর। আমরা অনেকেই জানি না যে একটা আধুনিক স্মার্টফোনে ১০ থেকে ১৫টিরও বেশি সেন্সর থাকতে পারে।
- Accelerometer: ফোন ঘোরালে স্ক্রিন আপনাআপনি ঘোরে কীভাবে? এটা Accelerometer-এর কাজ। এটা বোঝে আপনি ফোনটা কোন দিকে ধরেছেন।
- Gyroscope: গেমে ফোন কাত করলে গাড়ি বা চরিত্র নড়ে ওঠে। এই কাজটা করে Gyroscope। এটা ফোনের ঘূর্ণন বা কোণ মাপতে পারে। ল্যাপটপ বনাম ডেস্কটপ: শিক্ষার্থীদের জন্য কোনটা ভালো হবে? লেখায় আমি আরো কিছু ডিভাইস সেন্সর নিয়ে আলোচনা করেছি।
- Proximity Sensor: কানে ফোন দিলে স্ক্রিন বন্ধ হয়ে যায়। এটা Proximity Sensor-এর কাজ। এটা বুঝতে পারে কোনো কিছু ফোনের কাছে আছে কিনা।
- Ambient Light Sensor: বাইরে রোদে গেলে ফোনের স্ক্রিন উজ্জ্বল হয়, অন্ধকারে কমে যায়। এটা Ambient Light Sensor করে।
- Fingerprint Sensor: এখন দুই ধরনের Fingerprint Sensor পাওয়া যায়। একটা স্ক্রিনের মধ্যে (In-display), আরেকটা পাশে বা পেছনে। In-display সেন্সর Optical বা Ultrasonic হতে পারে। Ultrasonic একটু বেশি নির্ভুল কিন্তু দামও বেশি।
- Magnetometer: এটা হলো ডিজিটাল কম্পাস। Google Maps-এ দিক বোঝার জন্য এই সেন্সরটা লাগে।
- Barometer: কিছু ফোনে বায়ুচাপ মাপার সেন্সর থাকে। এটা উচ্চতা নির্ধারণ ও আবহাওয়া অ্যাপে কাজে লাগে।
এতগুলো সেন্সর একসাথে কাজ করে বলেই আপনার ফোন এত স্মার্ট। RAM এবং ROM এর মধ্যে পার্থক্য, প্রকারভেদ ও বাস্তব জীবনে প্রভাব নিয়ে আমার আরেকটি লেখা আছে, যেখানে ফোনের মেমোরি সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করেছি।
ISP কী? ক্যামেরার আসল রহস্য এখানে
অনেকে মনে করেন ফোনের ক্যামেরা মানে শুধু লেন্স আর মেগাপিক্সেল। কিন্তু আসল ব্যাপারটা অনেক বেশি জটিল।
আপনি ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুললে, লেন্স আলো ধরে এবং সেন্সরে পাঠায়। কিন্তু সেই কাঁচা ডেটা সরাসরি দেখলে ছবি খুব একটা সুন্দর দেখাত না। এই ডেটাকে সুন্দর ছবিতে পরিণত করার কাজটা করে ISP, অর্থাৎ Image Signal Processor।
ISP যা করে:
রঙ ঠিক করে, শব্দ (noise) কমায়, আলো-ছায়ার ভারসাম্য আনে এবং শার্পনেস বাড়ায়। রাতে ছবি তুললে ফোন অনেকগুলো ছবি এক সেকেন্ডে তুলে একসাথে মিলিয়ে একটা ভালো ছবি বানায়। এটাকে বলা হয় Night Mode। এই কাজটা ISP করে, কোনো কোনো সময় NPU-র সাহায্যও নেয়।
তাই দুটো ফোনে একই ধরনের ক্যামেরা সেন্সর থাকলেও, চিপসেট আলাদা হলে ছবির মান আলাদা হবে। ভালো ISP মানেই ভালো ছবি।
আধুনিক ফোনে AI Camera Processing অনেক এগিয়ে গেছে। ফোন এখন নিজে থেকেই বুঝতে পারে আপনি কী ছবি তুলছেন, খাবার নাকি মানুষ, রাত নাকি দিন। সেই অনুযায়ী সেটিং পরিবর্তন করে নেয়।
মাদারবোর্ড ও অন্যান্য হার্ডওয়্যার
স্মার্টফোনে SoC, Modem আর সেন্সর ছাড়াও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে।
ফোনের ভেতরে একটা ছোট সার্কিট বোর্ড থাকে যার উপর সব কিছু লাগানো থাকে। এটা অনেকটা কম্পিউটারের মাদারবোর্ড কি? কত প্রকার এবং এর ব্যবহার কি কি বিস্তারিত এর মতোই কাজ করে, তবে অনেক ছোট এবং শক্তিসাশ্রয়ী।
RAM হলো ফোনের সাময়িক মেমোরি। আপনি যখন একসাথে অনেক অ্যাপ খুলে রাখেন, RAM সেগুলো ধরে রাখে। বেশি RAM মানে বেশি অ্যাপ একসাথে চালু রাখা যাবে।
Storage বা ROM হলো স্থায়ী মেমোরি। ছবি, ভিডিও, অ্যাপ সব এখানে সংরক্ষিত হয়। আধুনিক ফোনে UFS 4.0 স্টোরেজ ব্যবহার হচ্ছে যা অনেক দ্রুত।
ব্যাটারি ম্যানেজমেন্টও SoC-এর উপর নির্ভর করে। ভালো চিপসেট মানে কম বিদ্যুৎ খরচ, মানে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি।
বাংলাদেশে ফোন কেনার সময় কী দেখবেন?
এখন প্রশ্ন হলো, এত কিছু জানলাম, কিন্তু ফোন কেনার সময় কোনটা দেখব?
বাজেট অনুযায়ী কিছু সহজ পরামর্শ দিচ্ছি:
- ১৫,০০০ টাকার মধ্যে: এই বাজেটে MediaTek Helio G99 বা Dimensity 6100 চিপসেটের ফোন খুঁজুন। এগুলো দৈনন্দিন কাজের জন্য যথেষ্ট ভালো।
- ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা: এই রেঞ্জে Snapdragon 4s Gen 2 বা Dimensity 7200 এর ফোন ভালো পারফরম্যান্স দেবে। 5G সাপোর্টও পাবেন অনেক ফোনে।
- ৩০,০০০ এর উপরে: Snapdragon 8 সিরিজ বা Dimensity 9000 সিরিজের চিপসেট পাবেন। এগুলো হেভি গেমিং, ভিডিও এডিটিং এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য আদর্শ।
সেন্সরের ক্ষেত্রে দেখুন ফোনে Gyroscope আছে কিনা, কারণ কম দামি ফোনে অনেক সময় এটা থাকে না। NFC থাকলে ভবিষ্যতে মোবাইল পেমেন্টে কাজে আসবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন দামের স্মার্টফোন কেনার আগে মোবাইল ফোনের দাম তুলনা করে নিতে পারেন। PCB Store থেকে বিভিন্ন বাজেটের স্মার্টফোন কিনতে পারবেন এবং স্পেসিফিকেশন মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: SoC কি পরিবর্তন করা যায়?
না, SoC পরিবর্তন করা যায় না। এটা সরাসরি ফোনের বোর্ডে লাগানো থাকে। এই কারণেই ফোন কেনার সময় চিপসেট ভালো করে দেখে নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন ২: বেশি কোর মানেই কি ভালো প্রসেসর?
সবসময় না। কোরের সংখ্যা একটা বিষয়, কিন্তু আর্কিটেকচার, ক্লক স্পিড এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস (যেমন 3nm বা 4nm) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ৩: 5G ফোন কিনলে কি এখনই সুবিধা পাব বাংলাদেশে?
এখনই পুরো সুবিধা পাবেন না, কারণ 5G নেটওয়ার্ক এখনো সীমিত। তবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে 5G ফোন কেনা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে, যদি বাজেট থাকে।
প্রশ্ন ৪: সেন্সর নষ্ট হলে কী করব?
যদি কোনো নির্দিষ্ট সেন্সর কাজ না করে, প্রথমে ফোন রিস্টার্ট করুন। তারপরও না হলে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে যান। অনেক সময় সফটওয়্যার আপডেটেও সেন্সর সমস্যা ঠিক হয়।
প্রশ্ন ৫: বেশি মেগাপিক্সেল মানেই কি ভালো ক্যামেরা?
না। ক্যামেরার মান নির্ভর করে সেন্সরের আকার, ISP এবং সফটওয়্যার প্রসেসিংয়ের উপর। একটি ভালো ISP সহ ৫০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা, দুর্বল ISP সহ ২০০ মেগাপিক্সেলের চেয়ে ভালো ছবি তুলতে পারে।
প্রশ্ন ৬: Gyroscope না থাকলে কি বড় সমস্যা?
সাধারণ ব্যবহারে সমস্যা নেই। কিন্তু আপনি যদি গেমিং করেন বা VR ব্যবহার করতে চান, Gyroscope না থাকলে সেটা বেশ বড় অসুবিধা।
প্রশ্ন ৭: Integrated Modem কি External Modem-এর চেয়ে ভালো?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে Integrated Modem ভালো। কারণ এটা SoC-এর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় দ্রুত কাজ করে এবং কম বিদ্যুৎ খরচ করে।
শেষ কথা
স্মার্টফোনকে স্মার্ট করে তোলে তার ভেতরের প্রযুক্তি। SoC হলো ফোনের মস্তিষ্ক, Modem হলো ফোনের কণ্ঠস্বর যা বিশ্বের সাথে কথা বলায়, আর সেন্সরগুলো হলো ফোনের ইন্দ্রিয়।
এই তিনটি অংশ একসাথে মিলে কাজ করে বলেই আপনি ফোনে ছবি তুলতে পারেন, গেম খেলতে পারেন, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন এবং দিকনির্দেশনা পেতে পারেন।
পরের বার যখন ফোন কিনতে যাবেন, শুধু ক্যামেরার মেগাপিক্সেল বা স্ক্রিনের আকার দেখবেন না। একটু সময় নিন ভেতরের চিপসেটটাও দেখতে। কারণ সেটাই ঠিক করে দেবে আপনার ফোন কতটা ভালো চলবে, কতদিন ভালো থাকবে।
প্রযুক্তি বোঝা কঠিন না, শুধু দরকার সঠিক ভাষায় সঠিক ব্যাখ্যা। আশা করি এই লেখাটা সেই কাজটুকু করতে পেরেছে।
৭১
১৪৫ মন্তব্য