প্রভাষক
২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ
ভাষা পরিবর্তনের কারণ
ভাষা হলো বহতা নদীর মতো। নদী যেমন তার গতিপথ পরিবর্তন করে, ভাষাও তেমনি সময়ের সাথে সাথে নানাবিধ কারণে পরিবর্তিত হয়। আর এই পরিবর্তন সাধারণত হঠাৎ করে ঘটে না, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে থাকে। মানুষের মুখে কেমন করে ভাষা এলো তা এক অপার রহস্য। বাংলার অধিবাসীরা প্রথম থেকে বাংলা ভাষায় কথা বলতো না। অথচ তাদের মুখের ভাষা ছিল তবে সেটি বাংলা ছিলো না। বাঙালির মুখে বাংলা ভাষা যেদিন জন্মেছিল, সেদিনই তা কেউ লিখে রাখেনি। মানুষের বুক থেকে মানুষের মুখে এসে ধ্বনিত হয়ে আদি বাংলা ভাষা মিশে গেছে আকাশে-বাতাসে। হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা রূপান্তরিত হয়ে বঙ্গীয় অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিল এক মধুর-কোমল-বিদ্রোহী প্রাকৃত। তার নাম বাংলা। ওই ভাষাকে কখনো বলা হয়েছে প্রাকৃত', কখনো বলা হয়েছে 'গৌড়ীয় ভাষা'। কখনো বলা হয়েছে 'বাঙ্গলা' বা 'বাঙ্গালা'। এখন বলি 'বাংলা'। এভাবে ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে।
ভাষা পরিবর্তনের কারণসমূহ:
◼️ধ্বনি পরিবর্তন:বিভিন্ন কারণে ভাষার পরিবর্তন ঘটে। তবে ধ্বনির পরিবর্তনের ফলে ভাষারও পরিবর্তন হয়। উচ্চারণ পদ্ধতি ও ধ্বনির শ্রুতিগত পরিবর্তনের ফলে ভাষা 'নিয়মিত' ও 'অনিয়মিত' ভাবে পরিবর্তন হয়। ধ্বনি পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণ। যেমন-স্বরভক্তি, ধ্বনি বিপর্যয়, স্বরাগম, স্বরলোপ, অপিনিহিত, অভিশ্রুতি, স্বরসঙ্গতি প্রভৃতি কারণে ভাষার পরিবর্তন ঘটে।
◼️ভৌগোলিক কারণ: সমগ্র দেশে একটি চলিত ভাষ্যরূপ প্রচলিত থাকলেও আঞ্চলিক দূরত্বের জন্য একই চলিত ভাষা বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তিত রূপে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিভিন্ন ভৌগোলিক বা সামাজিক প্রতিবেশ ভিন্ন ভিন্ন ভাষাকে লালন করে। তাকে অবলম্বন করে বিকশিত হয়ে গড়ে উঠে সেই অঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতি। যার জন্য ভাষার পরিবর্তন হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রতি ১৫ কিলোমিটার পরপর ভাষার পরিবর্তন হয় আর এটির কারণ হলো ভাষার ভৌগোলিক প্রভাব। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা বিভিন্ন রকমের। পূর্ববঙ্গের বাঙালি ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ক্ষেত্রে ভাষার পার্থক্য, কতই না বিভেদ। ভৌগোলিক রূপভেদের জন্য বিশ-পঁচিশ মাইলের ব্যবধানে ভাষার পরিবর্তন চিহ্নিত হচ্ছে।
◼️বাক-প্রত্যঙ্গের প্রভাব: নিখুঁত বাকপ্রত্যঙ্গ শুদ্ধ ও স্বাভাবিক ধ্বনি উচ্চারণে সাহায্য করে। ধ্বনির শ্রুতিগত পরিবর্তনের ফলে ভাষার পরিবর্তন হয়। ব্যক্তির বাকপ্রত্যঙ্গে খুঁত থাকলে ধ্বনি নিঁখুতভাবে উচ্চারিত হয়না। বাকপ্রত্যঙ্গের যেকোনো ত্রুটির কারণে ভাষার পরিবর্তন ঘটে থাকে।
◼️শিশুদের অনুকরণের প্রভাব : কোন শিশু ব্যাকরণ পড়ে ভাষা শিখে না। মানুষ অনুকরণীয় প্রবৃত্তি স্বভাবে আবদ্ধ। এ অনুকরণীয় স্বভাব শিশুদের বেশি প্রভাবিত করে। শিশুরা স্বভাবত পিতামাতার দ্বারা প্রভাবিত হয় বেশি। তাই শিক্ষিত পিতামাতার সন্তানদের তুলনায় অশিক্ষিত পিতামাতার সন্তানেরা বিকৃত উচ্চারণের স্বভাবে বেড়ে উঠে। প্রজন্মন্তরে অবিকল ভাষা শেখা হয়না বলে ভাষার পরিবর্তন ঘটে।
◼️সময় বা যুগের ব্যবধান :যুগের পরম্পরায় ভাষা পরিবর্তনশীল। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের মধ্যে আমরা যে বাংলা ভাষা দেখি সেটি কিন্তু মধ্যযুগের 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যে দেখিনা। আবার 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যের ভাষা আর আধুনিক কাব্যগুলোর ভাষা এক নয় সেটিরও পরিবর্তন ঘটেছে। এভাবে যুগের ব্যবধানে ভাষার পরিবর্তন ঘটে।
◼️অতি আধুনিকতার কারণ: মানুষ আধুনিকতা প্রিয়। যুগের সাথে তালমিলিয়ে সবাই চলতে চায়। যার ফলে তার মাতৃভাষার সাথে বিদেশি ভাষার মিশ্রণ ঘটিয়ে যখন কোন মানুষ কথা বলে তখন ভাষার পরিবর্তন হতে পারে। আবার কোন বাঙালি শিশু শৈশবে বিদেশে অবস্থানের সময় বিদেশি ভাষা আয়ত্তকরণের পর সেই রীতিতে মাতৃভাষা ব্যবহারের সময় বা কোন ব্যক্তি দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের পর অনেক ক্ষেত্রে তার ভাষাগত পরিবর্তন সাধিত হয়।
◼️শব্দ ঋণ: আদিকাল থেকে এই দেশে বহু জাতির আগমন ঘটেছে। যার ফলে তাদের ব্যবহৃত কিছু শব্দ বাংলা ভাষার সাথে মিশে গেছে এবং এ কারণে ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে।
◼️যুক্তবর্ণের প্রভাব: বাংলা ভাষায় অনেক ধ্বনি যুক্তভাবে থাকে। এসব যুক্তধ্বনি ভাষা পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
◼️অর্থনৈতিক কারণ: বক্তৃতা সম্প্রদায়গুলো যোগাযোগমূলক লক্ষ্যে পৌঁছানোর সময় তাদের উচ্চারণগুলোকে যতটা সম্ভব দক্ষ এবং কার্যকরী হতে পরিবর্তন করে। উদ্দেশ্যমূলক কথা বলা তাই খরচ এবং সুবিধার একটি বাণিজ্য বন্ধ জড়িত।
◼️ভাবপ্রবণতা: সাধারণ বা অত্যধিক ব্যবহার করা ভাষা সময়ের সাথে সাথে তার মানসিক বা অলংকারিক তীব্রতা হারাতে থাকে। অতএব, সেই তীব্রতাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য নতুন শব্দ এবং নির্মাণ ক্রমাগত নিযুক্ত করা হয়।
◼️সাদৃশ্য: সময়ের সাথে সাথে, বক্তৃতা সম্প্রদায়গুলো অসচেতনভাবে নির্দিষ্ট শব্দ, ধ্বনি ইত্যাদিতে নিয়মের প্যাটার্ন প্রয়োগ করে সম্পর্কহীন অন্যান্য শব্দ, ধ্বনি ইত্যাদিতে।
◼️সাংস্কৃতিক পরিবেশ: একটি সংস্কৃতির বিকাশের সাথে সাথে, নতুন স্থান, পরিস্থিতি এবং বস্তুগুলি অনিবার্যভাবে তার ভাষায় প্রবেশ করে, সংস্কৃতি বিভিন্ন মানুষের মুখোমুখি হোক বা না হোক।
◼️স্থানান্তর/আন্দোলন: বক্তৃতা সম্প্রদায়, একটি নতুন বা আরও জটিল ভাষাগত পরিস্থিতিসহ একটি অঞ্চলে চলে যাওয়া ভাষা পরিবর্তনকে প্রভাবিত করবে এবং প্রভাবিত করবে; তারা কখনো কখনো এমনকি সম্পূর্ণ নতুন ভাষা, যেমন। পিজিন এবং ক্রিওল দিয়ে শেষ করে।
◼️অসম্পূর্ণ শিক্ষা: একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, শিশুরা নিয়মিতভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ফর্মগুলো অসম্পূর্ণভাবে শিখে এবং পরিবর্তিত ফর্মগুলো তখন একটি নতুন স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়। বিকল্পভাবে, অসম্পূর্ণ শিক্ষা নিয়মিতভাবে সমাজের একটি অংশে ঘটে; যেমন একটি অভিবাসী গোষ্ঠী, যেখানে সংখ্যালঘু ভাষা একটি উপস্তর গঠন করে এবং পরিবর্তিত রূপগুলো শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যবহারকে প্রভাবিত করতে পারে।
◼️সামাজিক প্রতিপত্তি: ব্রিটিশপ্রাপ্ত উচ্চারণ উচ্চারণে অশ্লীলতা হারানোর ক্ষেত্রে যেমন বেশি সামাজিক প্রতিপত্তি আছে বা নেতিবাচক প্রতিপত্তি আছে এমন বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রহণ করার জন্য একটি ভাষা
ভাষা পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন কারণেই ভাষার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে ধ্বনি পরিবর্তনের কারণে ভাষার পরিবর্তন ঘটে। সময়, ব্যক্তি, শারিরীক কারণ এবং উচ্চারণ সহজের জন্যও অনেক কারণে ভাষার পরিবর্তন হয়।
মোহাম্মদ মনির উদ্দিন
বি.এ.& এম.এ. ( চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)
প্রভাষক, বাংলা।
রংগিয়াঘোনা মনছুরিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসা
৭১
১৪৫ মন্তব্য