সহকারী শিক্ষক
০১ মে, ২০২৬ ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ
মহান মে দিবস: ঘামের দাম, রক্তের দাবি
*শ্রমিক দিবস: ঘামের দাম, রক্তের দাবি—আমাদের শ্রমিকদের লড়াই চলছে*
*প্রতিপাদ্য:*
*“সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত
আসবে এবার নব প্রভাত”*
এবারের উক্ত প্রতিপাদ্যটি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে, যা কর্মক্ষেত্রে শোভন পরিবেশ নিশ্চিত করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথ দেখায়। সুস্থ শরীরে কর্মঠ হাতের মাধ্যমে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যেমনটি গত তিন মাসের দুর্ঘটনায় ১৮৬ শ্রমিকের মৃত্যুতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। আগে একটু পিছনে দেখে আসি---
১ মে মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, যা শুধু মিছিল আর স্লোগান নয়, বরং ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হেয়মার্কেটে শ্রমিকদের রক্তাক্ত লড়াইয়ের স্মৃতি। সেদিন তারা দাবি করেছিল ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা পরিবারের জন্য। পুলিশের গুলিতে পড়ে যাওয়া সেই শহীদদের আত্মত্যাগই আজ বিশ্বজুড়ে এই দিনকে অমর করেছে। বাংলাদেশে এই চেতনা তো আরও গভীরে বেঁধে আছে, কারণ আমাদের অর্থনীতি শ্রমিকদের কাঁধে দাঁড়িয়ে। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে চা বাগান, নির্মাণ সাইট—সবাই তাদের ঘামে দেশ চালাচ্ছে।
আমার চেনা আমু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। সাভারের একটা গার্মেন্টসে ১৫ বছর ধরে সিকার কাজ করছেন। বলেন, “ভাই, দিনে ১২ ঘণ্টা বসি, মজুরি ১২ হাজার, কিন্তু বাড়ির খরচ মেটাতে গেলে সুদে টাকা ধার করি।” এমন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আমাদের দেশের মেরুদণ্ড। তৈরি পোশাক শিল্প তো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক, ২০২৫ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে। স্পিপার্স, ইউনাইটেড পোশাকের মতো কারখানায় লক্ষাধিক মানুষ কাজ করে। কৃষিতে তো বলতেই নেই—চাষি, মজুর, মৎস্যজীবী সবাই। চট্টগ্রামের চামড়া শিল্প বা সিলেটের চা বাগানে শ্রমিকদের পরিশ্রম ছাড়া কী চলে?
কিন্তু এই অবদানের বিনিময়ে তারা কী পাচ্ছেন? অনেকেই ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। গত বছর ২০২৫-এ গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করেছে, কয়েকটা কারখানা বন্ধ হয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ তো দূরের কথা। রানা প্লাজা ২০১৩-এ ১১৩৪ জন প্রাণ গেছে, তারপরও শিক্ষা নেওয়া যায়নি। গত মাসেই চট্টগ্রামের একটা গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে, ৫ জন আহত। বিগত সরকারের সময় শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে পরিদর্শন কতটা হয়? ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই, জরুরি দরজা লক করা—এসব এখনও চলছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে কাজের চরিত্র বদলে গেছে। অনেক শ্রমিক এখন পাঠাও, ফুডপান্ডার মতো অ্যাপে কাজ করেন—অনিয়মিত ঘণ্টা, কোনো ছুটি নেই, দুর্ঘটনায় হলে কোনো কমপেনসেশন নেই। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার আছে কাগজে, কিন্তু বাস্তবে মালিকরা ভয় দেখায়। সরকারকে দরকার কঠোর প্রয়োগ: ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা, নিয়মিত ইন্সপেকশন, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি।
নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ। গার্মেন্টসে ৮৫% নারী, তারা দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলেছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, রাতের শিফটে নিরাপত্তার অভাব, সমান মজুরি না পাওয়া—এসব রোজকার। মাতৃত্বকালীন ছুটি পান ঠিকই, কিন্তু বাড়ি ফিরতে বাস নেই। গত বছর আশুলীয়াতে একটা কারখানায় নারী শ্রমিকরা হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। দরকার শিশুসেবা কেন্দ্র, নিরাপদ হোস্টেল, সমান চাকরির সুযোগ। এগুলো না হলে ক্ষমতায়ন কীভাবে হবে?
দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া তো চলবে না। প্রযুক্তি আসছে—অটোমেশন, এআই। শ্রমিকরা শিখবে না তো চাকরি যাবে। বিটিইমই-এর ট্রেনিং সেন্টার আছে, কিন্তু আরও দরকার। সরকার, এনজিও, আইএলও মিলে পুনঃপ্রশিক্ষণ চালু করুক। আমার চেনা রোমানা আপা গার্মেন্টস ছেড়ে সেলাইয়ের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেছে ট্রেনিং নিয়ে—এমন গল্প বাড়াতে হবে।
সমাজে শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে। এখনও শুনি, “কুলি-মজুর” বলে খোটা দেয়। কিন্তু তারাই তো সড়ক বানায়, বাড়ি গড়ে। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। টেকসই উন্নয়নের এসডিজি-তে (৮ নম্বর: সুষ্ঠু কর্মসংস্থান) বাংলাদেশ ভালো করছে, কিন্তু দারিদ্র্য (১ নম্বর) আর বৈষম্য (১০ নম্বর) কমাতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা উন্নত করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন—এসব এখনও স্বপ্ন।
শ্রমিক দিবস শুধু উদযাপন নয়, প্রতিশ্রুতির দিন। সরকার, মালিক, শ্রমিক—সবাই মিলে নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক কর্মক্ষেত্র গড়ি। আমু ভাইয়ের মতো লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাবে না যেন। তাদের শ্রমেই দেশ এগোয়, তাদের সম্মানেই জাতি ওঠে। এই চেতনা নিয়ে এগোই।
৭১
১৪৫ মন্তব্য