সহকারী শিক্ষক
২৭ মে, ২০২৬ ০৭:৫১ অপরাহ্ণ
কুরবানি: পশুর গলায় ছুরি নাকি নিজের ‘নফসের’ ওপর?
কুরবানি: পশুর গলায় ছুরি নাকি নিজের ‘নফসের’ ওপর?
ভূমিকা:
আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এক দিন। লক্ষ লক্ষ পশু জবেহ করা হবে বাংলাদেশের হাটে-ঘাটে, অলি-গলিতে। কিন্তু এই যে বিপুল আয়োজন, এই যে কোটি কোটি টাকার পশুর হাট—এর পেছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী? আমরা কি কেবল পশু জবেহ করছি, নাকি আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পশুত্বকেও বিসর্জন দিচ্ছি? ইব্রাহীম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের শিক্ষা কি কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ, নাকি আমাদের জীবনেও তার প্রতিফলন আছে?
ত্যাগের মহিমা ও আমাদের বাস্তবতা:
হজরত ইব্রাহীম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে পাওয়া তাঁর কলিজার টুকরো সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে কুরবানি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। সেটি ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার চূড়ান্ত পরীক্ষা। আল্লাহ আমাদের সেই কঠিন পরীক্ষায় ফেলেননি; দয়া করে পশুর বিনিময়ে সেই ত্যাগের সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু আজ আমাদের সমাজে কুরবানি কি সেই ‘তাকওয়া’র জায়গায় আছে?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন:
“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (পরহেযগারী)।” (সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ৩৭)
অবৈধ উপার্জনের কুরবানি কি কবুল হবে?
আজকের সমাজে দেখা যায়, কারো বার্ষিক বৈধ আয় হয়তো ১০-১২ লাখ টাকা, কিন্তু তিনি ৩২ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনছেন। প্রশ্ন জাগে, এই বাড়তি টাকা কোথা থেকে এলো? সরকারি অফিসের যে কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া ফাইল ছাড়েন না, যে ব্যাংক কর্মকর্তা জনগণের আমানত লুটপাটে সহায়তা করেন, কিংবা যে বিচারক অর্থের বিনিময়ে ন্যায়বিচারকে বন্দি করেন—তাঁরা যখন বিশাল অংকের পশু কিনে কুরবানি দেন, সেটি কি ইবাদত নাকি লোক দেখানো আড়ম্বর?
হারাম উপার্জনে কুরবানি সম্পর্কে ইসলাম কঠোর। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (হালাল) বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।” (সহীহ মুসলিম)
সুদ, ঘুষ আর দুর্নীতির টাকায় কেনা পশুর রক্তে কি আল্লাহর সন্তুষ্টি মিলবে? নাকি তা কেবলই মাংস খাওয়ার উৎসবে পরিণত হবে?
সামাজিক অবিচার ও কুরবানি:
আমরা দেখি গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রাস্তার ধারের একফুট জমি ছাড়তে নারাজ, অন্যের জমির আইল কেটে নিজের জমি বাড়াতে ব্যস্ত। অথচ কাল ঠিকই তিনি মস্ত বড় গরু কুরবানি দেবেন। আবার কেউ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে পশুর গলায় ছুরি চালাচ্ছেন। যে হাত দিয়ে অন্যের হক নষ্ট করা হয়, যে মুখ দিয়ে মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হয়, সেই হাত আর মুখ নিয়ে কি কুরবানির সওয়াব পাওয়া সম্ভব?
কুরবানি আমাদের শেখায় ত্যাগ করতে। অথচ আমরা ত্যাগের বদলে করছি ‘মজুতদারি’। ফ্রিজ ভরে মাংস রেখে দিয়ে গরিবের হক আমরা কতটুকু দিচ্ছি, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
যাদের ওপর আমরা জুলুম করছি:
সমাজের উঁচুতলার মানুষরা আজ আলাদা কাতারে নামাজ পড়েন। তাদের শান-শওকত আর অহংকারের তলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি আর ব্যাংক লুটের টাকায় যারা কুরবানি দিচ্ছেন, তারা আসলে কী ত্যাগ করছেন? তারা কি তাদের লোভ ত্যাগ করতে পেরেছেন? তারা কি পরশ্রীকাতরতা বা অহংকার ত্যাগ করতে পেরেছেন?
যদি কুরবানির পরদিন থেকেই আবার সেই পুরনো অন্যায়, দুর্নীতি আর জুলুম শুরু হয়, তবে সেই কুরবানি কেবল একটি ‘বার্ষিক অনুষ্ঠান’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
উপসংহার: আমাদের যা করা উচিত
কুরবানি মানে কেবল পশু জবাই নয়, কুরবানি মানে নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে হত্যা করা।
আসুন, আমরা কুরবানি দেই আমাদের লোভকে।
কুরবানি দেই আমাদের অহংকার আর ক্ষমতার দম্ভকে।
কুরবানি দেই অবৈধ উপার্জনের লালসাকে।
ত্যাগ করি অন্যের জমি বা হক দখল করার মানসিকতাকে।
আমাদের সমাজের সেই তথাকথিত নীতিহীন বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান—পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে নিজের ‘বিবেকের’ দরজায় কড়া নাড়ুন। আত্মজিজ্ঞাসা করুন, আপনার এই কুরবানি কি স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য, নাকি সমাজের মানুষকে নিজের বিত্ত দেখানোর জন্য?
আল্লাহ আমাদের লোক দেখানো ইবাদত থেকে রক্ষা করুন এবং সত্যিকারের ত্যাগের মানসিকতা দান করুন। আমিন।
৫৩
৯২ মন্তব্য