সহকারী অধ্যাপক
০৭ জুন, ২০২৬ ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ
স্মরণ, শোকর ও সবর-সালাত - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
স্মরণ, শোকর ও সবর-সালাত
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
হে আসমান-জমিনের মালিক, হে অনন্ত করুণাময়,
তোমারই নামের আলোতে জাগে হৃদয়-আত্মার প্রলয়।
তুমি ডাক দাও—“আমাকে স্মরণ করো, হে বান্দা আমার,”
আর আমি হারিয়ে যাই তোমার স্মরণে বারবার।
কত ছোট আমি, কত ভোলা আমি নিজেরই পথে,
তবু তুমি ডাকো আমাকে রহমতের স্নিগ্ধ রথে।
তোমার এই ডাক—“ফাযকুরূনী”—ভোরের প্রথম কিরণ,
অন্ধকার ভেঙে দেয়, জাগায় ঈমানের জীবন।
আমি স্মরণ করি তোমায়—ভাঙা কণ্ঠে, ভেজা চোখে,
তুমি কি স্মরণ করো আমায় অদৃশ্য রহমতের লোকে?
কুরআন বলে—তুমি স্মরণ করো, আমি স্মরণ করব,
এই প্রতিশ্রুতিতেই আমি বাঁচার অর্থ খুঁজে নিব।
হে রব! তোমার স্মরণ শুধু জিহ্বার উচ্চারণ নয়,
এ তো হৃদয়ের গভীরতম প্রেমের অগ্নিময় লয়।
প্রতিটি নিঃশ্বাসে যদি তোমার নাম জ্বলে ওঠে,
তবে দুনিয়ার সব দুঃখও মধুর আলো হয়ে ওঠে।
আর তুমি বলো—“শোকর করো, অকৃতজ্ঞ হয়ো না,”
নিয়ামতের বোঝা পেয়ে যেন মানুষ পথ না হারায় সনা।
শোকর মানে শুধু মুখে বলা কৃতজ্ঞতার নাম নয়,
শোকর মানে জীবনভর আনুগত্যের নিরব অঙ্গীকার রয়।
যে চোখ দেখে তোমার দান, আর ভুলে না দাতাকে,
যে হৃদয় কাঁদে তোমার ভয়ে, তোমারই সন্তুষ্টিকে।
শোকর সেই জীবন, যেখানে নাফরমানি নেই আর,
প্রতিটি কাজেই ফুটে ওঠে রবের প্রেম অপরিসীম ধার।
হে আল্লাহ! তুমি আমাদের অন্তর করো কৃতজ্ঞতায় ভরা,
অহংকারের অন্ধকার যেন না ছোঁয় এই ধরা।
যে বান্দা তোমায় ভুলে যায়, সে তো নিঃস্ব এক পথিক,
আর যে তোমায় স্মরণ রাখে, সে-ই সত্যিকারের সুখিক।
আর তুমি আবার ডাকো—“হে ঈমানদার, সাহায্য চাও,”
সবর ও সালাতের মাঝে আমার কাছে ফিরে আসো।
এই দুই পথেই খুঁজে পাবে তুমি শান্তির ঠিকানা,
এই দুই পথেই মুছে যাবে সব দুঃখের বেদনা।
সবর—এ তো শুধু কষ্ট সহ্য করা নয় কোনো দিন,
এ তো নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ, ঈমানের দৃঢ় ঋণ।
হারামের টানে যখন হৃদয় হয় অস্থির, অচঞ্চল,
সবর তখন বাঁধে তাকে, করে ঈমানকে অটল।
যখন দুঃখের ঢেউ আসে, ভাঙে জীবনের ঘর,
সবর তখন বলে—“আল্লাহ আছেন, ভয় কীসের পর?”
যখন ইবাদতের পথে ক্লান্তি নামে গভীর রাতে,
সবর তখন দাঁড় করায় বান্দাকে সিজদার সাথে।
আর সালাত—সে তো মুমিনের মেরাজের সিঁড়ি,
যেখানে বান্দা ভুলে যায় দুনিয়ার সব ভীড়ি।
সিজদার মাটিতে মিশে যায় অহংকারের ধূলি,
বান্দা তখন খুঁজে পায় রবের দরবারের কূলি।
হে রব! তুমি বলো—“আল্লাহ সবরকারীর সাথে আছেন,”
এই সাথে থাকা কোনো দুনিয়ার ভাষায় ধরা না-চান।
এ না দেহের সাথে থাকা, না সীমিত কোনো রূপ,
এ তো সাহায্য, রহমত, নূরের অনন্ত স্রোত।
যে বান্দা তোমার পথে দাঁড়ায় ধৈর্যের দৃঢ় পায়ে,
তুমি তাকে সাহায্য করো অদৃশ্য রহমতের ছায়ায়।
যে সালাতে ঝুঁকে পড়ে ভাঙা হৃদয়ের ভারে,
তুমি তার হৃদয় ভরিয়ে দাও শান্তিরই উপহারে।
হে আল্লাহ! আমাদের জীবন করো তিন আলোতে ভরা,
স্মরণ, শোকর আর সবর—এই তিনে হোক ধরা।
এই তিন আলোয় যেন কেটে যায় অন্ধকার রাত,
এই তিন আলোয় পাই যেন চির শান্তির সাক্ষাৎ।
আমরা যেন তোমায় ভুলে না যাই কখনোই হে রব,
তোমার স্মরণেই বাঁচুক আমাদের প্রতিটি অনুভব।
তোমার শোকরে ভরে উঠুক আমাদের প্রতিটি দিন,
আর সবরের পথে চলুক আমাদের ঈমানের ঋণ।
শেষে এই প্রার্থনা—হে দয়াময়, হে মহান,
আমাদের হৃদয় করো তোমার জিকিরে জ্যোতির্ময় গান।
যেন মৃত্যু পর্যন্ত থাকে তোমারই স্মরণের আলো,
আর আখিরাতে পাই তোমার রহমতের চির ভালো।
***
হে আসমান-জমিনের রব, হে অনন্ত দয়ার ভাণ্ডার,
তোমারই নামের আলোয় জাগে হৃদয়ের অন্ধকার।
তুমি ডাকো—“আমাকে স্মরণ করো,” করুণার সেই আহ্বান,
আমি হারিয়ে যাই তোমার স্মরণে, পাই জীবনের মান।
ফাযকুরূনী—তোমার এই ডাক হৃদয় কাঁপায় গভীর,
ভুলে যাওয়া আত্মাকে ফিরিয়ে আনে ঈমানের নীর।
তুমি বলো—“আমি তোমাদের স্মরণ করিব নিশ্চয়,”
এই ওয়াদা-আলোতেই মুছে যায় সকল সংশয়।
আমি তো ধূলি, আমি তো ভুলে যাওয়া এক পথিক প্রাণ,
তবু তুমি দাও মর্যাদা, করো আমাকে সম্মান।
তোমার স্মরণই আমার বাঁচা, আমার অস্তিত্বের গান,
তোমার স্মরণেই হৃদয় পায় সত্যিকারের জ্ঞান।
হে রব! তোমার জিকিরে জেগে ওঠে ভোরের আলো,
অন্তরের সব অন্ধকার হয়ে যায় শান্ত-ভালো।
যে মুখ তোমায় স্মরণ করে, সে মুখ কখনো ম্লান নয়,
যে হৃদয় তোমায় পায়, সে হৃদয় আর নিঃস্ব নয়।
তুমি বলো—“শোকর করো, অকৃতজ্ঞ হয়ো না কভু,”
নিয়ামতের ভারে যেন না ভেঙে পড়ে হৃদয় লভু।
শোকর মানে শুধু ভাষা নয়, তা জীবন-ইবাদত,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে রবের দিকে ফিরে যাওয়ার আদত।
যে চোখ দেখে তোমার দান, আর ভুলে না দাতাকে,
যে হৃদয় ঝুঁকে পড়ে, তোমারই সন্তুষ্টিকে।
শোকর সেই আলো, যা অন্ধকার দূর করে দেয়,
শোকর সেই জীবন, যা জান্নাতের পথে নেয়।
আর তুমি ডাকো—“হে ঈমানদার, সাহায্য চাও,”
সবর ও সালাতের মাঝে আমার কাছে আসো।
এই দুই পথই বান্দার জন্য রহমতের দরজা,
এই দুই পথেই মিটে যায় দুঃখ-দুর্দশার বোঝা।
সবর—এ তো আত্মার শক্তি, নফসের উপর বিজয়,
হারামের আগুনে না পোড়া, এটাই প্রকৃত পরিচয়।
লোভের ডাকে না সাড়া দেওয়া, এ এক মহা জিহাদ,
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই সবচেয়ে বড় ফাসাদ-প্রতিরোধ।
সবর মানে ইবাদতে অবিচল থাকা ধৈর্যের সাথে,
রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কান্না ভেজা সিজদাতে।
ক্লান্তি এলেও না থামা, না ভাঙা, না হারা,
“ইন্নাল্লাহা মাআস্সাবিরীন”—এই বিশ্বাস ধরা।
বিপদ এলে মনে রাখা—এও রবেরই ফয়সালা,
দুঃখের মাঝে লুকিয়ে থাকে রহমতেরই মালা।
সবর তখন হৃদয়কে করে পাহাড়সম দৃঢ়,
ঝড়-তুফানেও রাখে ঈমানকে অটুট অক্ষর।
আর সালাত—সে তো মেরাজ, বান্দার ঊর্ধ্বগমন,
যেখানে মাটি ছুঁয়ে পায় আসমানের মনন।
সিজদায় পড়ে যায় অহংকারের সব ভ্রান্ততা,
রবের সামনে বিলীন হয় দুনিয়ার সব ক্ষমতা।
সালাত সেই নীরব ভাষা, যেখানে আত্মা কথা বলে,
চোখের পানি সেখানে রহমতের স্রোত হয়ে চলে।
প্রতি রুকুতে বিনয়, প্রতি সিজদায় মুক্তি,
সালাতেই মেলে বান্দার প্রকৃত শক্তি।
হে আল্লাহ! তুমি বলো—তুমি ধৈর্যশীলদের সাথে,
এই “সাথে থাকা” আলো জ্বালে হৃদয়ের রাতে।
না দেহের সাথে, না সীমার মাঝে আবদ্ধ কোনো রূপ,
বরং সাহায্য, রহমত, নূরের অনন্ত স্বরূপ।
যে সবর করে তোমার পথে, তুমি তার পাশে থাকো,
যে সালাতে দাঁড়ায়, তাকে শান্তি দান করো রাখো।
এই সাথে থাকা-ই বান্দার সবচেয়ে বড় পাওয়া,
এই সান্নিধ্যেই জীবন পায় সত্যিকারের ছোঁয়া।
হে রব! আমাদের জীবন করো জিকিরে ভরা নদী,
প্রতিটি শ্বাসে যেন তোমার নাম হয় অগাধ ধ্বনি।
শোকর, সবর, সালাত—এই তিন আলো জ্বালো,
এই তিনে আমাদের হৃদয় করো পবিত্র ভালো।
যেন আমরা না ভুলে যাই তোমার প্রতিশ্রুতি,
“তোমরা আমাকে স্মরণ করো”—এই চির সত্য গীতি।
আর যেন আমরা না হই অকৃতজ্ঞ কোনো দিন,
তোমার পথে চলুক আমাদের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি ঋণ।
হে দয়াময় রব! শেষ প্রার্থনা তোমার দরবারে,
আমাদের হৃদয় রাখো তোমার স্মরণের ধারায়।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জারি থাকুক তোমারই জিকির,
আর আখিরাতে দাও তোমার রহমতের চির নীর।
***
হে রাব্বুল আলামীন, হে দয়ার অশেষ নদী,
তোমারই নামের আলোতে জাগে অন্তরের সব বিধি।
তুমি ডাকো—“আমাকে স্মরণ করো”—নরম করুণ সুরে,
আর আমি হারিয়ে যাই তোমারই জিকিরের নূরে।
তুমি তো অমুখাপেক্ষী, আমি তো ধূলির সন্তান,
তবু তুমি দাও মর্যাদা, করাও আত্মার সম্মান।
“ফাযকুরূনী”—এই বাক্যে ভেঙে যায় গাফেলতার দেয়াল,
হৃদয়ের গভীরে নামে ঈমানের শান্ত জোছনাল।
আমি স্মরণ করি তোমায়—ভুলে যাওয়া কণ্ঠে, অশ্রুতে,
তুমি কি স্মরণ করো আমায় রহমতের অদৃশ্য পথে?
তোমারই ওয়াদা—“আজকুরকুম”—কি অপার দয়া,
বান্দার ক্ষুদ্র স্মরণে তুমি দাও জান্নাতের ছায়া।
হে আল্লাহ! তোমার জিকিরই আমার জীবন-প্রাণ,
তোমার স্মরণেই মুছে যায় সব ব্যথার অবসান।
যে হৃদয় তোমায় ডাকে, সে কখনোই নিঃস্ব নয়,
তোমার স্মরণই তার জন্য চিরজীবী পরিচয়।
তুমি বলো—“আমার শোকর করো, অকৃতজ্ঞ হয়ো না,”
নিয়ামতের ভারে যেন অহংকার জন্ম না পায় সনা।
শোকর শুধু ভাষা নয়, এ এক জীবনভর নতি,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে রবের দিকে ফেরার গতি।
চোখ যখন দেখে তোমার দান, হৃদয় বলে—তুমিই দাতা,
শোকর তখন বান্দাকে বানায় আলোর যাত্রী-স্রোতা।
অকৃতজ্ঞতা অন্ধকার, যা হৃদয়কে করে নীরব কবর,
শোকরই সেখানে জ্বালায় ঈমানের দীপ্ত প্রহর।
হে ঈমানদার! তুমি সাহায্য চাও ধৈর্য আর সালাতে,
এই দুই পথেই মুক্তি আছে জীবনের প্রতিটি রাতে।
“ওয়াস্তাঈনূ বিস্সবরি ওয়াস্সালাহ”—এ স্বর্গীয় ডাক,
বিপদের মাঝে এ-ই তোমার অদৃশ্য আলোর ঝলক।
***
সবর মানে নফসের বিরুদ্ধে নিরন্তর জিহাদ,
হারামের টানেও না হারানো ঈমানের মোরাদ।
সবর মানে ইবাদতের পথে ক্লান্তি সহ্য করা,
রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অশ্রু ঝরানো সারা।
সবর মানে বিপদের দিনে ভেঙে না পড়া মন,
“ইন্নাল্লাহা মাআস্সাবিরীন”—এই বিশ্বাসে জীবন।
যখন দুনিয়া কাঁপে, হৃদয় হয় দিশেহারা,
সবর তখন বলে—“আল্লাহ আছেন, তুমি একা না।”
সালাত—আত্মার মেরাজ
আর সালাত—সে তো বান্দার মেরাজের পথ,
যেখানে মাটি ছেড়ে আত্মা পায় অনন্ত রথ।
সিজদার মাটিতে মুছে যায় অহংকারের নাম,
বান্দা তখন খুঁজে পায় রবের নিকটতম ধাম।
রুকুতে বিনয়, সিজদায় প্রেমের অশ্রু ধারা,
সালাতেই মিলে যায় হৃদয়ের সব অন্ধকারারা।
যে দাঁড়ায় সালাতে, সে কখনো একা নয়,
তার সাথে থাকে রহমতের অদৃশ্য পরিচয়।
হে রব! তুমি বলো—“আমি সবরকারীর সাথে আছি,”
এই সাথে থাকা-ই তো জীবনের সর্বোচ্চ আশ্বাসি।
না শরীরের সাথে, না কোনো সীমার বাঁধনে,
বরং সাহায্য, রহমত—অদৃশ্য আলোর টানে।
যে ধৈর্য ধরে তোমার পথে, তুমি তার পাশে থাকো,
যে সিজদায় পড়ে যায়, তার হৃদয় ভরে রাখো।
তোমার এই “সাথে থাকা”—সব দুঃখের অবসান,
এটাই মুমিনের সবচেয়ে বড় শান্তির স্থান।
শেষ প্রার্থনা
হে আল্লাহ! আমাদের জীবন করো স্মরণে ভরা,
শোকরে জ্বালাও হৃদয়, সবরে করো স্থির ধরা।
সালাতের মাঝে দাও আমাদের শান্তির ঠিকানা,
তোমার জিকিরেই কাটুক জীবনের প্রতিটি সনা।
আমরা যেন না ভুলে যাই তোমার এই আহ্বান,
না হই অকৃতজ্ঞ, না হারাই ঈমানের গান।
মৃত্যু পর্যন্ত হৃদয়ে থাকুক তোমারই আলো,
আখিরাতে দাও আমাদের চির শান্তির ভালো।
৭১
১৪৫ মন্তব্য