সহকারী অধ্যাপক
০৮ জুন, ২০২৬ ০১:৫৪ অপরাহ্ণ
আরশের ছায়াতলে ন্যায়ের শাসক - মোঃ মুজিবুর রহমান
আরশের ছায়াতলে ন্যায়ের শাসক
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয় জাগানিয়া গান,
ইনসাফ, ন্যায় আর তাকওয়ার পথে চলার আহ্বান।
মহাশক্তিমান রবের বাণী, নবীর অমর বাণ,
যুগে যুগে জাগায় অন্তর, দেয় সত্যের পরিচয় জ্ঞান।
প্রশ্ন জাগে আজও মনে—কবে হবে সে শুভ প্রভাত?
কবে ভাঙবে জুলুমের শিকল, মিলবে মজলুমের নাজাত?
কবে শাসকের দ্বারে গিয়ে হক পাবে ক্ষুধার্ত জন?
কবে কান্না থামবে এতিমের, হাসবে নিঃস্ব মানুষের মন?
কবে হবে এমন শাসক, ন্যায় যার জীবনের ধারা,
নিজের সুখ ভুলে যে খোঁজে প্রজার অশ্রুভেজা কারা?
যার কাছে ধনী-গরিব এক, সমান সবার বিচার,
আল্লাহভীত হৃদয় যার, সত্য যার একমাত্র অস্ত্র।
কবে হবে সে ইনসাফগার, রাতের আঁধার নামলে পরে,
বেরিয়ে যাবে ছদ্মবেশে মানুষের দুঃখের তরে?
দেখবে কোথায় ক্ষুধার আগুন, কোথায় কান্না নিরবধি,
কোথায় বিধবা দীর্ঘশ্বাসে কাটায় তার রাত নিরবধি।
কবে হবে সে ন্যায়পরায়ণ, যে শুনবে মজলুমের কথা,
ক্ষমতার অহংকার ভুলে মুছিয়ে দেবে বুকের ব্যথা?
যে জানবে তার প্রতিটি কর্ম লিখে রাখেন রব মহান,
একদিন দিতে হবে হিসাব, হবে সকল গোপন প্রকাশমান।
দুনিয়ার মসনদ ক্ষণিক ছায়া, ক্ষমতা ক্ষণিকের ধন,
চোখের পলকে ফুরায় সবই, থাকে শুধু কর্মগুণ।
আজ যে রাজা, কাল সে প্রজা, আজ যে শক্তিশালী বড়,
মৃত্যুর পরে কবরবাসী—সবার পরিণতি এক ঘর।
তাই তো আল্লাহ অবকাশ দেন, সঙ্গে সঙ্গে ধরেন না,
জালিমদের দেখে মনে হয় যেন কিছুই ঘটেনা।
কিন্তু যেদিন আসবে হাশর, ভয়ংকর সেই বিচারদিন,
সেদিন খুলে যাবে সব পর্দা, হবে প্রকাশ গোপন ঋণ।
সূর্য যখন হবে নিকটে, উত্তাপে জ্বলিবে ধরা,
ঘামে ডুববে মানবসমাজ, হবে দিশেহারা সর্বহারা।
মা ভুলিবে সন্তানকে, ভাই চিনিবে না আপন ভাই,
নিজের হিসাব নিয়ে সবাই ভয়ে হবে পথহারা তাই।
সেদিন কোথায় বৃক্ষছায়া? কোথায় শীতল নদীর কূল?
কোথায় প্রাসাদ, কোথায় সম্পদ, কোথায় রাজ্যের ফুল?
কোনো আশ্রয় মিলবে না আর, কোনো শক্তি হবে না সহায়,
আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো নিরাপদ ঠাঁই নাই।
সেই কঠিন দিনেই তবে হবে সুসংবাদের ঘোষণা,
সাত শ্রেণির বান্দার তরে রহমতের বিশেষ সান্ত্বনা।
সবার আগে ডাকা হবে ন্যায়পরায়ণ শাসককে,
যে দুনিয়াতে ইনসাফ করেছে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে।
যে কখনো বিকায়নি ভয়ে, বিকায়নি লোভের টানে,
যে সত্যকে আঁকড়ে ধরেছে হাজার ঝড়ের মাঝখানে।
যার আদালতে দুর্বল মানুষ পেয়েছে সমান অধিকার,
যার শাসনে নিরাপদ ছিল প্রতিটি ঘর আর প্রতিটি দ্বার।
যে পৌঁছে দিয়েছে হক মানুষের তারই আপন দরজায়,
যে ঘুমানোর আগে ভেবেছে—কেউ কি বঞ্চিত রয়ে যায়?
যে কাঁদিয়েছে নিজের অন্তর অন্যের চোখের জল দেখে,
যে ভয় পেয়েছে রবকে শুধু, ক্ষমতার মুকুট মাথায় রেখে।
সেদিন আরশের ছায়াতলে ডাকা হবে তাকে সসম্মানে,
ফেরেশতারা ঘিরে ধরবে রহমতের অপরূপ গানে।
যেখানে কোটি মানুষ পুড়বে তপ্ত রৌদ্রের আগুনে,
সেখানে সে থাকবে নিরাপদ রবের করুণার বাগিচায় গুণে।
হায়! আজ কত শাসক দেখি জুলুমে যাদের অন্তর ভরা,
ক্ষমতার নেশায় ভুলে গেছে মৃত্যুর ভয়াল সীমানা।
মজলুমের আর্তনাদ শুনেও যারা থাকে নিরব চিরকাল,
ভাবছে বুঝি রক্ষা পাবে, থাকবে অটুট তাদের জাল।
তারা কি শোনেনি রবের বাণী—
"যালিমদের কাজ হতে আমি গাফেল নই কখনো"?
অবকাশ শুধু পরীক্ষার তরে,
ধরা হবে একদিন অবশ্যই যেন।
যেদিন চক্ষু হবে বিস্ফারিত, অন্তর হবে শূন্য,
মস্তক তুলে ছুটবে সবাই, হবে জীবন মূল্যহীন গণ্য।
সেদিন কোথায় যাবে জালিম? কোথায় তার সেনাবাহিনী?
কোথায় যাবে অহংকার তার, কোথায় ক্ষমতার রাণী?
যারা বলেছিল—"আমাদের পতন হবে না কোনোদিন",
তারাই হবে লাঞ্ছিত সেদিন, হারাবে গৌরবের রঙিন ঋণ।
পাহাড়সম ষড়যন্ত্র তাদের ভেঙে যাবে মুহূর্তে,
আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে কিছুই নয় বাস্তবে।
আর মজলুম তখন হাসবে, শেষ হবে তার দীর্ঘ রাত,
আল্লাহর দরবারে পাবে সে পূর্ণ ন্যায়ের সুবিচার।
কারো হক থাকবে না বাকি, কারো দাবি হবে না ক্ষয়,
প্রতিটি জুলুমের প্রতিদান সেদিন যথাযথ হবে নিশ্চয়।
মুমিনেরা যখন পার হবে জাহান্নামের ভয়াল সেতু,
তখনও থাকবে হিসাব বাকি, থাকবে অধিকারের ঋতু।
একজনের প্রতি অন্যজনের যত জুলুম ছিল দুনিয়ায়,
সব প্রতিশোধ মিটিয়ে তবে জান্নাতের দুয়ার খুলে যায়।
কী মহান সেই ন্যায়বিচার! কী সূক্ষ্ম তার পরিমাপ!
সেখানে নেই পক্ষপাতিত্ব, নেই কোনো মিথ্যা চাপ।
একটি কথাও হারাবে না, একটি অশ্রুও বৃথা নয়,
আল্লাহর নিকট সবই সংরক্ষিত, কিছুই কখনো লোপ না হয়।
তাই হে শাসক, হে নেতা, হে ক্ষমতার অধিকারী,
মনে রেখো, এই দুনিয়া ক্ষণিক, আখিরাত চিরস্থায়ী।
ক্ষমতা তোমার পরীক্ষা মাত্র, নয় কোনো স্থায়ী সম্মান,
ন্যায় প্রতিষ্ঠাই তোমার মুক্তি, ইনসাফ তোমার পরিত্রাণ।
আর হে সাধারণ মানুষ, তুমিও হতাশ হয়ো না,
জালিম দেখে ভেঙে পড়ে রবের রহমত ভুলে যেও না।
আল্লাহ দেখছেন সবকিছুই, শুনছেন প্রতিটি আহাজারি,
ধৈর্য ধরো, সত্য আঁকড়ে ধরো, আসবে ন্যায়ের সুবাতাস ভারি।
কবে হবে সেই ইনসাফগার?—প্রশ্ন জাগে বারবার,
উত্তর লুকায় আমাদের মাঝে, আমাদেরই অন্তরভূমির দ্বার।
যেদিন মানুষ আল্লাহভীতি নিয়ে নিজের দায়িত্ব নেবে,
সেদিন থেকেই ন্যায়ের সূর্য নতুন আলো নিয়ে উঠবে।
যেদিন নেতা হবে খাদেম, শাসক হবে সেবক মহান,
যেদিন হক পৌঁছাবে ঘরে ঘরে, পূর্ণ হবে মানবপ্রাণ।
যেদিন কাঁদবে শাসকের চোখ প্রজার দুঃখের সংবাদে,
সেদিন ফুটবে ইনসাফের ফুল মানবতার উন্মুক্ত প্রান্তরে।
আর যদি এমন শাসক সত্যিই আল্লাহর তরে বাঁচে,
মজলুমের অশ্রু মুছে দিয়ে শান্তির বাতি হাতে রাখে,
তবে সে ধন্য, মহাধন্য, সৌভাগ্যের শ্রেষ্ঠ অধিকারী,
কিয়ামতের ভয়াল ময়দানে হবে সে আরশের ছায়াধারী।
হে আল্লাহ! আমাদের মাঝে এমন নেতা দান করুন,
ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে সত্যের পতাকা বহন করুন।
মজলুমের হক আদায় করে যাঁরা আপনার সন্তুষ্টি চায়,
হাশরের সেই কঠিন দিনে তাদের আরশের ছায়া দান করায়।
***
আরশের ছায়াতলে ন্যায়ের
এ প্রয়াস কবে হবে তবে? প্রশ্ন জাগে প্রাণে,
কবে ইনসাফ নামবে নেমে মানুষের কল্যাণে?
কবে শাসক ভাববে আগে ক্ষুধার্ত শিশুর কথা,
কবে বিধবার চোখের জলে কাঁপবে তারও ব্যথা?
কবে রাত্রির নিস্তব্ধতায় রাজপ্রাসাদের দ্বার,
খুলে যাবে দীন-দুঃখীর তরে বারংবার?
কবে ক্ষমতার সিংহাসন হবে আমানত জ্ঞান,
কবে শাসক বলবে নিজে—“আমি আল্লাহর বান্দা মাত্র, নই কোনো মহান”?
কবে মাহরুম মানুষের হক পৌঁছাবে তার ঘরে,
কবে নিঃস্ব কৃষক হাসবে ফসল ভরা ভোরে?
কবে শ্রমিকের ঘামে গড়া সম্পদের ন্যায্য দাম,
ফিরে আসবে তার হাতেতে, পূর্ণ হবে কাম?
কবে এতিম শিশুর মুখে ফুটবে হাসির ফুল,
কবে মজলুমের কান্নাধ্বনি হারাবে দুঃখের কূল?
কবে শাসক নিজের সুখকে তুচ্ছ করে দিবে,
অন্যের ব্যথা নিজের বুকে ধারণ করে নিবে?
যে শাসক রাতে ঘুমায় না প্রজার দুঃখ ভেবে,
যে শাসক হিসাব করে রবের আদালতে যাবে,
যে শাসকের হৃদয় কাঁদে অন্যের আহাজারিতে,
তারই নাম লিখা থাকবে আরশের ছায়ার নীড়ে।
কিয়ামতের সেই ময়দানে যখন সূর্য হবে নিকট,
মানুষ যখন ঘামে ডুববে অপরাধের দৃষ্টান্ত,
যখন পাপের ভারে নত হবে কোটি কোটি শির,
যখন কোনো আশ্রয় মিলবে না, হবে না কোনো স্থির—
সেদিন আরশের ছায়াতলে একদল হবে ধন্য,
যাদের আমল আলোকিত, হৃদয় ছিল পুণ্য।
তাদের প্রথম সারিতেই থাকবে ন্যায়ের ইমাম,
যার ইনসাফে প্রসন্ন ছিল জমিন ও আসমান।
সে দেখেনি মানুষকে শুধু ভোট কিংবা সংখ্যা,
দেখেছিল আল্লাহর বান্দা—এটাই ছিল লক্ষ্য।
ক্ষমতার মোহে নয়, ছিল না দম্ভের নেশা,
আল্লাহভীতি ছিল তার জীবনের পরিবেশা।
সেদিন ডাকা হবে তাকে সম্মান আর নূরে,
ফেরেশতারা বলবে তাকে—“এসো রহমতের সুরে।”
দুনিয়াতে তুমি মুছে দিলে বহু চোখের জল,
আজ তোমার তরে খোলা হলো রহমতের অনল।
আর যারা জুলুম করে আজ হাসছে বুক ফুলিয়ে,
মজলুমদের দীর্ঘশ্বাসকে অবহেলায় ভুলিয়ে,
তাদের জন্য অপেক্ষা করে ভয়াল এক পরিণাম,
যেখানে কোনো ক্ষমতা হবে না তাদের কাম।
যেখানে মুকুট হবে না ঢাল, হবে না প্রাসাদ সাথী,
হিসাবের দিনে প্রকাশ পাবে গোপন সকল গাঁথি।
একটি হকও হারাবে না, একটি অশ্রুও নয়,
রবের দরবারে সবকিছুর ন্যায়বিচার হয়।
মজলুম তখন মাথা তুলে বলবে—“আলহামদুলিল্লাহ!”
শেষ হয়েছে দুঃখের রাত, পূর্ণ হয়েছে চাওয়া।
যে হক ছিল ছিনিয়ে নেওয়া, ফিরবে তারই হাতে,
ন্যায়ের পাল্লা সমান হবে বিচার দিনের রাতে।
হে মানুষ! যদি চাও তুমি আরশের শীতল ছায়া,
তবে অন্যের হক নষ্ট করে গড়ো না সুখের মায়া।
ক্ষমতা যদি হাতে আসে, করো না অহংকার,
প্রতিটি পদে স্মরণ রেখো—আল্লাহ মহান বিচারক আর।
হে যুবক! যৌবন তোমার আমানত প্রভুর দান,
ইবাদতে রাঙাও জীবন, পাবে অফুরান সম্মান।
হে দানশীল! গোপন দানে করো অন্তর ভরা,
রবের কাছে গোপন আমল সবচেয়ে অধিক সরা।
হে মসজিদপ্রেমী মুমিন! হৃদয় রেখো তাতে,
হে প্রেমিক! ভালোবাসো শুধু আল্লাহরই পথে।
হে অশ্রুসজল বান্দা! নির্জনে কেঁদে যাও,
রবের রহমতের সাগরে নিজেকে ভাসাও।
সাত শ্রেণির সেই সৌভাগ্যবান দলে যদি চাই স্থান,
তবে গড়তে হবে জীবনকে কুরআন-সুন্নাহর বিধান।
ন্যায়, দয়া, তাকওয়া, সবর, ইখলাস আর হক,
এসব নিয়েই গঠিত হবে জান্নাতের পথ।
কবে হবে সে ইনসাফগার?—আজও প্রশ্ন রয়,
উত্তর কিন্তু আমাদেরই অন্তরের গভীরে কয়—
যেদিন মানুষ নিজেকে আগে সংশোধন করবে,
সেদিন থেকেই ন্যায়ের সূর্য পৃথিবীতে উদ্ভাসিত হবে।
হে আল্লাহ! দান করুন এমন ন্যায়পরায়ণ নেতা,
যাদের হাতে নিরাপদ হবে উম্মাহর প্রতিটি ব্যথা।
মজলুমের হক আদায়ে যারা হবে সদা সচেষ্ট,
হাশরের দিনে আরশতলে করুন তাদের প্রতিষ্ঠিত।
হে আল্লাহ! আমাদেরও করুন সত্যের অনুগামী,
জুলুম থেকে দূরে রেখে করুন নেককার বান্দাগণ স্বামী।
যেদিন থাকবে না কোনো ছায়া, থাকবে না কোনো আশ্রয়,
সেদিন আপনার আরশতলে দিন আমাদেরও স্থান নিশ্চয়।
***
আরশের ছায়াতলে ইনসাফের দীপশিখা
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয়ের নিবেদন,
রবের পথে জাগুক আবার ন্যায়ের মহা স্পন্দন।
যে ন্যায়েতে বাঁচে মানুষ, যে ন্যায়েতে জাগে প্রাণ,
সে ন্যায়েতে রচিত হোক পৃথিবীর প্রতিটি গান।
প্রশ্ন জাগে অন্তরে আজ, ব্যথা জাগে গভীর সুরে,
কবে মানুষ হক পাবে তার আপন ঘরের দ্বারে?
কবে ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে ফুটবে আশার হাসি,
কবে দুঃখের রাত পেরিয়ে আসবে সুখের বাতাসি?
কবে নেতা হবে খাদেম, কবে শাসক হবে দাস,
কবে ক্ষমতা হবে আমানত, হবে না অহংকারের বাস?
কবে রাজদণ্ড হাতে নিয়ে কাঁদবে মানুষের তরে,
কবে মজলুমের আহাজারি পৌঁছাবে হৃদয় ঘরে?
কত মানুষ নীরব রাতে চোখের জলে ভাসে,
কত দীর্ঘশ্বাস হারিয়ে যায় অন্ধকারের পাশে।
কত হক যে লুণ্ঠিত হয় শক্তির মিথ্যা বলে,
কত স্বপ্ন ভেঙে পড়ে জুলুমের বিষঢলে।
তবু মুমিন আশা রাখে রবের মহান বাণী,
অন্যায়ের রাত যত দীর্ঘ, শেষ তো হবেই জানি।
যিনি আসমান ও জমিনের প্রতিটি খবর রাখেন,
তিনি মজলুমের কান্নাধ্বনি নীরবে শুনে থাকেন।
দুনিয়ার এই রাজ্য যত, ক্ষণিক ছায়ার মতো,
আজ যে উঁচু সিংহাসনে, কাল সে মাটির তলে শুতো।
যে সম্পদে গর্ব করে, যে শক্তিতে বুক ফুলায়,
মৃত্যুর পরে কিছুই তার সঙ্গে আর না যায়।
একদিন আসবে সেই দিন, ভয়াবহ মহাময়দান,
যেদিন কাঁপবে সকল প্রাণ, থমকে যাবে জাহান।
সূর্য হবে নিকটতর, উত্তাপে জ্বলিবে ধরা,
নিজ নিজ কর্মের ভারে হবে সবাই দিশাহারা।
সেদিন থাকবে না কোনো ছায়া, থাকবে না কোনো ঠাঁই,
আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া নিরাপদ আশ্রয় নাই।
সেই দিনে ধন্য হবে যাদের জীবন ছিল সত্য,
যাদের অন্তর আল্লাহভীত, যাদের কর্ম পবিত্র।
সবার আগে সম্মান পাবে ন্যায়ের সেই ইমাম,
যার ইনসাফে হাসত মানুষ, খুশি ছিল আসমান।
যে দেখেনি প্রজার মাঝে ধনী-গরিব ভেদ,
যার আদালতে সমান ছিল প্রতিটি মানুষের রায় ও খেদ।
যে পৌঁছে দিত হক মানুষের নিজের হাতে ধরে,
যে ভুলত নিজের আরাম অন্যের দুঃখ ঘুচাতে তরে।
যে রাতে ঘুমাবার আগে হিসাব নিত মনে,
কোনো মানুষ বঞ্চিত রইল কি আমার এই শাসনে?
যার হৃদয়ে ছিল না দম্ভ, ছিল না ক্ষমতার নেশা,
তাকওয়ার আলোয় আলোকিত ছিল তার পরিবেশা।
মানুষ তার ভয়ে নয়, ভালোবেসে কাছে যেত,
তার ন্যায়বিচারের কথা যুগে যুগে স্মরণ করত।
সেদিন ফেরেশতারা ডেকে বলবে তাকে হেসে—
“এসো আজ রহমতের ছায়ায়, এসো সম্মানের দেশে।
দুনিয়াতে তুমি মুছিয়েছ বহু চোখের জল,
আজ তোমার জন্য খোলা হলো জান্নাতের অনল।”
আর যারা জুলুম করে গড়েছিল সুখের ঘর,
মজলুমের হক মেরে হয়ে উঠেছিল প্রবল পরাক্রমশালী বর,
তাদের সব গৌরব সেদিন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে,
ক্ষমতার সব মিথ্যা প্রাচীর মুহূর্তে ভেঙে যাবে।
সেদিন কেউ বাঁচাতে পারবে না আপন আপন প্রাণ,
না থাকবে সৈন্য, না থাকবে কোনো মুকুটের সম্মান।
একটি হকও হারাবে না, একটি অশ্রুও নয়,
রবের দরবারে সবকিছুর নিখুঁত বিচার হয়।
মুমিন তখন দেখবে হেথা ন্যায়ের পূর্ণ জ্যোতি,
অত্যাচারের অন্ধকারে জ্বলবে সত্যের বাতি।
যে কেঁদেছিল নিরবে বসে পৃথিবীর নির্জনে,
সে হাসবে আজ আল্লাহর ন্যায়বিচারের সনে।
হে মানুষ! যদি চাও তুমি আরশের শীতল ছায়া,
তবে অন্যের অধিকার নষ্ট করে গড়ো না সুখের মায়া।
ক্ষমতা যদি আসে হাতে, করো না অহংকার,
প্রতিটি পদে স্মরণ রেখো—আল্লাহ মহান বিচারক আর।
হে যুবক! যৌবন তোমার রবের দেওয়া ধন,
ইবাদতে রাঙাও জীবন, করো না সময় ক্ষণ।
হে দানশীল! গোপন দানে ভরিয়ে দাও প্রাণ,
রবের কাছে লুকানো আমল সবচেয়ে বড় সম্মান।
হে মসজিদপ্রেমী বান্দা! মসজিদে রেখো মন,
হে অশ্রুসজল মুমিন! জাগাও তাওবার স্পন্দন।
হে প্রেমিক! ভালোবাসো আল্লাহরই সন্তুষ্টির তরে,
তবে মিলবে রহমতের ছায়া হাশরের প্রান্তরে।
আজ প্রয়োজন শুধু নয় কথার, প্রয়োজন আমলও,
প্রয়োজন সত্যের পথে অবিচল থাকার বলও।
নিজেকে আগে বদলাতে হবে, বদলাতে হবে প্রাণ,
তবেই আবার ফুটবে ধরা জুড়ে ন্যায়ের সুবাসিত গান।
হে আল্লাহ! দান করুন এমন নেতা, এমন হৃদয়বান,
যারা আপনার ভয় নিয়ে করবে শাসন পরিচালন।
মজলুমের হক আদায়ে থাকবে সদা সচেষ্ট,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে হবে সত্যের দীপ্ত মশালদ্বস্ত।
হে আল্লাহ! আমাদেরও করুন ন্যায়ের অনুগামী,
জুলুম থেকে দূরে রেখে বানান নেককার স্বামী।
যেদিন থাকবে না কোনো ছায়া, থাকবে না কোনো আশ্রয়,
সেদিন আপনার আরশতলে দিন আমাদেরও স্থান নিশ্চয়।
***
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয় কাঁপানো গান,
ন্যায়ের পথে চলার ডাকে জাগুক ঘুমন্ত প্রাণ।
জাগুক আবার সত্যের আলো অন্ধকারের শেষে,
মানুষ খুঁজুক রবের সন্তোষ দুনিয়া ও পরকালে এসে।
কত জনপদ কাঁদে নীরব, কত চোখে জল,
কত দীর্ঘশ্বাস হারিয়ে যায় রাতের আঁধারতল।
কত অবহেলিত মানুষের বুকভরা আর্তনাদ,
কত বঞ্চিত অধিকার আজ খুঁজে ফেরে সুবিচার।
প্রশ্ন জাগে অন্তরে আমার, প্রশ্ন জাগে বারংবার—
কবে আসবে সেই সুবাতাস, কবে হবে ইনসাফের দ্বার?
কবে শাসক হবে খাদেম, কবে নেতা হবে সেবক,
কবে মানুষের কল্যাণ হবে ক্ষমতার প্রথম লক্ষ্য?
কবে ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে ফুটবে আশার হাসি,
কবে বিধবার চোখের জলে কাঁপবে বিবেক ভাসি?
কবে শ্রমিকের ঘামের মূল্য ফিরবে তারই হাতে,
কবে এতিমের মুখে আনন্দ ফুটবে জীবনের প্রাতে?
কবে ধনী-গরিবের মাঝে থাকবে না ভেদরেখা,
কবে ন্যায়ের পাল্লায় সবাই সমান হবে দেখা?
কবে আদালতের দ্বারে দুর্বল মানুষ দাঁড়িয়ে,
পাবে ন্যায়ের নিশ্চয়তা বুকের আশা জড়িয়ে?
দুনিয়ার ক্ষমতা ক্ষণিক, ক্ষণিক তার সম্মান,
ক্ষণিক সুখের প্রাসাদ যত, ক্ষণিক তার গান।
আজ যে রাজা, কাল সে মাটির নিঃশব্দ বাসিন্দা,
মৃত্যুর পরে সবার পরিচয়—কর্ম আর তাকওয়া।
তবু মানুষ ভুলে যায় সেই চিরসত্যের কথা,
অহংকারে ঢেকে ফেলে হৃদয়ের সকল ব্যথা।
ক্ষমতার নেশায় ভেবে নেয়—আমি বুঝি অমর,
ভুলে যায় কবরের মাটি অপেক্ষায় নিরন্তর।
কিন্তু একদিন আসবেই সেই মহাভয়ঙ্কর দিন,
যেদিন খুলে যাবে গোপন আমলের প্রতিটি ঋণ।
যেদিন সূর্য হবে নিকট, কাঁপবে সমগ্র প্রাণ,
নিজ নিজ কর্মের ভারে থমকে যাবে জাহান।
সেদিন কোথায় আশ্রয় হবে? কোথায় ছায়ার ঠাঁই?
আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া নিরাপদ স্থান নাই।
মানুষ দিশেহারা হয়ে ফিরবে এদিক-ওদিক,
কর্মই হবে একমাত্র সাথী, থাকবে না আর কিছু ঠিক।
সেই দিনে ধন্য হবে যাদের অন্তর ছিল পবিত্র,
যাদের জীবন আল্লাহভীত, যাদের আমল চরিত্র।
ধন্য হবে তারা সবাই, যাদের হৃদয় নূরে ভরা,
যারা দুনিয়াতে সত্যের পথে রেখেছে জীবন গড়া।
ধন্য হবে ন্যায়ের শাসক, ইনসাফ যার পরিচয়,
যার বিচার পেয়ে দুর্বল মানুষ খুঁজে পেয়েছে আশ্রয়।
যে ক্ষমতাকে আমানত জেনে বহন করেছে সদা,
যার হৃদয়ে আল্লাহভীতি ছিল পথের প্রদীপটা।
যে ঘুমাতে যাওয়ার আগে করেছে নিজের হিসাব,
কেউ কি রইল বঞ্চিত আজ? আছে কি কারো আজাব?
কেউ কি ক্ষুধায় কাঁদছে এখন? কেউ কি পায়নি হক?
এই চিন্তাতে যার হৃদয় কেঁপে উঠেছে অবিরত।
যে মুছে দিয়েছে মজলুমের চোখের নোনাজল,
যে পৌঁছে দিয়েছে হক মানুষের আপন ঘর অবধল।
যে শুনেছে আর্তনাদ রাতের গভীর নীরবতায়,
যে ভয় পেয়েছে রবকে শুধু ক্ষমতার উচ্চতায়।
সেদিন ফেরেশতা ডাকবে তাকে সম্মানের ভাষায়,
“এসো তুমি, আল্লাহর রহমত আজ তোমারই আশায়।
দুনিয়াতে তুমি ন্যায়ের পথে রেখেছিলে পদ,
আজ তোমার জন্য খোলা হলো শান্তির অনন্ত সদন।”
আর যারা জুলুম করে গড়েছিল সুখের প্রাসাদ,
অন্যের হক গ্রাস করে বানিয়েছিল ইবাদতবিহীন সাধ,
তাদের সকল অহংকার সেদিন হবে ম্লান,
ক্ষমতার সব গল্প তখন হারাবে সম্মান।
কারো হক থাকবে না বাকি, কারো দাবি অপূর্ণ নয়,
রবের দরবারে প্রতিটি বিচার নিখুঁতভাবে হয়।
একটি অশ্রুও হারাবে না, একটি দীর্ঘশ্বাসও না,
আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত প্রতিটি ব্যথার বয়ান।
হে মানুষ! যদি চাও তুমি আরশের শীতল ছায়া,
তবে অন্যের অধিকার নষ্ট করে গড়ো না সুখের মায়া।
সত্যকে আঁকড়ে ধরো দৃঢ়, ন্যায়কে করো সাথী,
তাকওয়ার আলোয় আলোকিত হোক জীবনের প্রতিটি গাঁথি।
হে যুবক! যৌবন তোমার অমূল্য রবের দান,
ইবাদতে রাঙাও জীবন, অর্জন করো সম্মান।
হে দানশীল! গোপনে দাও, শুধু রবের তরে,
সেই আমলই আলো হয়ে জ্বলবে কিয়ামতের প্রান্তরে।
হে অশ্রুসজল মুমিন! নির্জনে কেঁদে যাও,
পাপের বোঝা ঝরিয়ে দিয়ে রবের পথে চাও।
হে মসজিদপ্রেমী বান্দা! মসজিদে রেখো মন,
আল্লাহর স্মরণে জাগুক তোমার হৃদয়ের স্পন্দন।
আজ প্রয়োজন শুধু কথা নয়, প্রয়োজন আমলও,
প্রয়োজন সত্যের পথে অটল থাকার বলও।
নিজেকে আগে বদলাতে হবে, শুদ্ধ করতে প্রাণ,
তবেই ফুটবে পৃথিবীজুড়ে ন্যায়ের সোনার ভোরের গান।
হে আল্লাহ! দান করুন এমন নেতা, এমন হৃদয়বান,
যারা আপনার ভয়ে করবে শাসনের পরিচালন।
মজলুমের হক আদায়ে থাকবে সদা সচেষ্ট,
সত্যের পথে অবিচল, ইনসাফে হবে প্রতিষ্ঠিত।
হে আল্লাহ! আমাদেরও করুন ন্যায়ের অনুগামী,
অন্যায় থেকে দূরে রেখে করুন নেককার বান্দাগণ স্বামী।
যেদিন থাকবে না কোনো ছায়া, থাকবে না কোনো আশ্রয়,
সেদিন আপনার আরশতলে দিন আমাদেরও স্থান নিশ্চয়।
৫৩
৯২ মন্তব্য