সহকারী অধ্যাপক
০৮ জুন, ২০২৬ ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ
দুনিয়া মুমিনের কারাগার - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
দুনিয়া মুমিনের কারাগার
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয় ছোঁয়া গান,
ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়াতে মানুষের অবস্থান।
কেউ আসে হেসে, কেউ যায় কেঁদে, কেউ ভুলে যায় পথ,
কেউ বা খোঁজে রবের সন্তোষ, করে সত্যের রথ।
রাসূলের মুখনিঃসৃত বাণী, সত্য যার পরিচয়,
মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার—শুনে জাগে হৃদয়।
কাফিরের কাছে এ ভুবন যেন সুখের বেহেশত,
কিন্তু আখিরাতের তুলনায় সবই ক্ষণিকের সম্পদ।
কারাগারে বন্দি যেমন নিয়মের শিকলে বাঁধা,
মুমিন তেমনি রবের হুকুমে রাখে জীবন সাধা।
চোখ যা দেখে, মন যা চায়, সব তো করা যায় না,
হালাল-হারামের সীমারেখা লঙ্ঘন করা মানা।
নফস বলে, "চলো ভোগ করি, খুলে দাও সব দ্বার",
ঈমান বলে, "থামো একটু, সামনে বিচারঘর"।
প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করে কাটে দিনের পর দিন,
এই সংগ্রামের মাঝেই গড়ে প্রকৃত মুমিন।
যখন সবাই দৌড়ায় পিছে দুনিয়ার রঙিন স্বপ্নে,
মুমিন তখন হাঁটে ধীরে রবের সন্তুষ্টি খুঁজতে।
মানুষ দেখে বঞ্চনা শুধু, দেখে না অন্তর ধন,
সিজদার মাঝে যে পায় শান্তি, তা কি বোঝে জগৎজন?
রাতের আঁধার নেমে এলে যখন সবাই ঘুমায়,
মুমিন তখন অশ্রু ঝরায়, রবের দরবারে যায়।
কাঁদে বলে—"হে পরওয়ারদিগার, তুমি আমার প্রিয়,
তোমার সন্তোষ ছাড়া জীবনে আর কিছু নয়।"
কত সুযোগ আসে পাপে, কত আহ্বান মন্দে,
কত রঙিন মরীচিকা ডাকে বিভ্রান্তির ছন্দে।
তবু যে ব্যক্তি থেমে থাকে আল্লাহর ভয়ে নত,
সে-ই তো পাবে জান্নাতের চিরসুখের রত্নভাণ্ডার শত।
কাফির ভাবে, এ জীবনই সব, এরপর কিছু নেই,
আজকে খাও, আজকে ভোগ কর, কালকে কোথাও যেই।
তাই তো তার কাছে দুনিয়াটা স্বপ্নমাখা দেশ,
পরকালের খবর শুনে করে কেবল উপহাস।
কিন্তু যখন পর্দা উঠবে মৃত্যুর দুয়ার পেরিয়ে,
যখন মানুষ দাঁড়াবে সবাই হাশরের ময়দানে গিয়ে,
তখন বুঝবে কত বড় ছিল এ জীবনের ভুল,
যা ভেবেছিল জান্নাত সে ছিল মরুভূমির ফুল।
মুমিন যদিও কষ্ট পায়, রোগে ভোগে, দুঃখে,
তবু তার রব লিখে রাখেন প্রতিদান সুখে সুখে।
এক ফোঁটা অশ্রু বৃথা নয়, বৃথা নয় দীর্ঘশ্বাস,
প্রতিটি ধৈর্য জমা থাকে রবের কাছে বিশেষ।
যে ক্ষুধার্ত থেকেও অন্যকে দেয় নিজের আহার,
যে অপমান সয়ে রাখে আল্লাহর ভয়ে বারবার,
যে ক্ষমা করে প্রতিশোধের সুযোগ হাতে পেয়ে,
সে তো গড়ে আখিরাতের প্রাসাদ ধীরে ধীরে।
দুনিয়ার সুখ নদীর জলের ক্ষণিক ঢেউয়ের মতো,
একটু জাগে, একটু নাচে, তারপর মিলায় যত।
কিন্তু জান্নাতের সুখধারা অফুরন্ত অনন্ত,
যেখানে নেই মৃত্যু, শোক, নেই বিচ্ছেদের অন্ত।
সেখানে থাকবে শান্তির ছায়া আরশের তলে গিয়ে,
নদী প্রবাহিত হবে সদা প্রাসাদের পাশ দিয়ে।
না থাকবে রোগ, না থাকবে ভয়, না থাকবে কোনো ক্ষয়,
রহমানের দীদার হবে—এর চেয়ে বড় কী হয়?
তাই হে মুমিন, ভেঙো না মন দুনিয়ার কষ্ট পেয়ে,
তোমার পথের প্রতিটি কাঁটা ফুল হবে শেষে গিয়ে।
আজ যে শিকল মনে হয়, কাল তা হবে গৌরব,
আজকের ধৈর্য কালকে হবে জান্নাতেরই সোপান সব।
হালাল পথে চলার কষ্ট বৃথা যাবে না কখনো,
আল্লাহ দেখেন অন্তরের সব গোপন ব্যথা-বেদনা।
যে নিজেকে বেঁধে রাখে রবের বিধান মাঝে,
সে-ই তো মুক্ত হবে শেষে জান্নাতেরই সাজে।
মনে রেখো, এ পৃথিবী নয় চিরদিনের ঘর,
এখানে সবাই মুসাফির, সবাই পথের পর।
কেউ আগে যায়, কেউ পরে যায়, গন্তব্য একই স্থান,
আখিরাতের সেই সফরের প্রস্তুতি হোক প্রাণ।
হে আল্লাহ! আমাদেরও দাও মুমিনের সেই মন,
যে মন তোমার ভয়ে নত, তোমার প্রেমে গঠন।
দাও এমন ঈমান, যা ঝড়ে কখনো না টলে,
দাও এমন সবর, যা বিপদে হাসিমুখে চলে।
দাও এমন জীবন, যা হবে তোমারই সন্তোষে ভরা,
দাও এমন মৃত্যু, যার শেষে জান্নাত হবে ধরা।
দুনিয়ার কারাগার পেরিয়ে যখন হবে যাত্রা শেষ,
তখন যেন পাই আমরা ফিরদাউসের চিরবেহেশত।
আমীন।
দুনিয়া মুমিনের কারাগার
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয়-জাগানিয়া গান,
সত্যের পথে চলার তরে জাগুক প্রতিটি প্রাণ।
ক্ষণিক এই দুনিয়াখানা মুসাফিরের সরাই,
এখানে কেউ চিরদিনের বসতি গড়তে নাই।
আজ যে রাজা সিংহাসনে, কাল সে মাটির তলে,
আজ যে হাসে গর্ব ভরে, কাল সে নীরব চলে।
এই পৃথিবীর রঙিন মেলা ক্ষণিক সময়ের খেলা,
চোখের পলক ফুরিয়ে গেলে নিভে যায় জীবনের বেলা।
রাসূল দিলেন মহাসংবাদ, সত্য যার প্রতিটি বাণী,
মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার, কাফিরের সুখের বাগিচাখানি।
কত গভীর এ উপমা, কত বিস্তৃত এর জ্ঞান,
ভাবলে জেগে ওঠে অন্তর, কেঁপে ওঠে প্রাণ।
কারাগারে বন্দী যেমন ইচ্ছামতো চলতে পারে না,
যা খুশি তা করতে গিয়ে স্বাধীনতা পায় না।
মুমিন তেমনি আল্লাহর ভয়ে রাখে নিজেকে বেঁধে,
নফস যতই ডাকুক তাকে অন্যায় পথের স্রোতে।
চোখ চায় অনেক কিছু, মন চায় আরও বেশি,
কিন্তু ঈমান বলে, "সাবধান! এ পথ নয় সুখের দিশি।"
হালাল-হারামের সীমানাতে দাঁড়িয়ে থাকে সে,
রবের সন্তোষ লাভের আশায় কাঁদে নির্জন শেষে।
যখন কেউ অবাধ ভোগে ডুবে যায় রাতদিন,
মুমিন তখন নিজেকে শুধরে গড়ে তোলে রঙিন।
সিজদার মাঝে খুঁজে পায় যে প্রশান্তির সমুদ্র,
তা কি বুঝবে সেই হৃদয়, যে গাফিলতিতে মগ্ন?
কাফির ভাবে—এই জীবনই শেষ ঠিকানা তার,
খাও-দাও, হাসো, ভোগ করো, খুলে দাও সব দ্বার।
মৃত্যুর পরে কী আছে আর, সে চিন্তা তার নাই,
দুনিয়ার সুখেই মগ্ন থাকে, সত্যকে ভুলে যায়।
তাই তো তার কাছে পৃথিবী বেহেশতেরই মতো,
যদিও সে জানে না সামনে অপেক্ষা করছে কত।
যে ফুল দেখে মুগ্ধ হয়ে, দেখে না তার ক্ষয়,
যে রাত দেখে আনন্দময়, ভোরের হিসাব নয়।
অন্যদিকে মুমিন জানে—পথ এখনও বাকি,
মৃত্যুর পরে খুলবে গিয়ে অনন্ত জীবনের ফাঁকি।
প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি নিঃশ্বাস,
লিপিবদ্ধ হয় আমলনামায়, হবে তারই প্রকাশ।
এই ভয়ে সে থেমে থাকে পাপের হাতছানি পেয়ে,
এই আশাতে এগিয়ে চলে জান্নাতের স্বপ্ন নিয়ে।
তার চোখেতে দুনিয়াটা পরীক্ষার এক স্থান,
আখিরাতের ফসল ফলায় এই জীবনের মাঠে প্রাণ।
কত প্রলোভন চারিদিকে, কত রঙিন ডাক,
কত শয়তানি ফিসফিসানি, কত গুনাহর ফাঁক।
তবু যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে সংযম ধরে রাখে,
ফিরিশতারা তার নাম লেখে সম্মানেরই খাতায়।
যখন রাতের শেষ প্রহরে সবাই থাকে ঘুমে,
কেউ একজন উঠে দাঁড়ায় তাহাজ্জুদেরই সুরে।
অশ্রুভেজা দু’হাত তুলে বলে—"হে আমার রব!
তোমার দয়া ছাড়া আমার নেই তো কোনো সব।"
সেই অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটা মুক্তার চেয়েও দামি,
সেই দীর্ঘশ্বাস পৌঁছে যায় আরশের কাছাকাছি।
মানুষ দেখে না বাহির থেকে অন্তরের সে জ্বালা,
কিন্তু রহমান দেখেন সব, শোনেন কান্নার মালা।
কত দুঃখ, কত বেদনা, কত অপমান সয়ে,
মুমিন তবু এগিয়ে চলে রবের প্রেমে রয়ে।
রোগ আসে, শোক আসে, আসে বিপদ-ঝড়,
তবু তার ঈমানের প্রদীপ নিভে না কোনো পর।
কারণ সে জানে—এই দুঃখের প্রতিদান আছে,
এই কান্নারও মূল্য আছে আল্লাহরই কাছে।
একটি কাঁটা পায়ে ফুটলে যদি ধৈর্য ধরে প্রাণ,
সেটিও হয় গুনাহ মোচনের মহামূল্য দান।
দুনিয়ার সুখ শিশিরবিন্দু সকালেরই ঘাসে,
সূর্য উঠলেই মিলিয়ে যায় অদৃশ্য আকাশে।
মানুষ তবু সেই সুখ পেতে কত করে যুদ্ধ,
আখিরাতের অনন্ত সুখ ভুলে থাকে মুগ্ধ।
জান্নাত কিন্তু অন্য কিছু, অন্য এক জগত,
যেখানে নেই মৃত্যু-ব্যথা, নেই বিচ্ছেদের শোক।
যেখানে নেই হিংসা-বিদ্বেষ, নেই কোনো অশান্তি,
যেখানে শুধু শান্তির ধারা, অফুরন্ত প্রশান্তি।
সেখানে নদী বহবে সদা দুধ, মধু আর জলে,
সেখানে সুখের শেষ হবে না যুগের পরে যুগ চলে।
সেখানে রবের সন্তুষ্টি হবে সর্বোচ্চ পুরস্কার,
সেখানে দীদারের আশায় জ্বলবে না আর অপেক্ষার আগুনধার।
হে মুমিন! তাই হতাশ হয়ো না দুনিয়ার কষ্টে,
আজকের পরীক্ষা শেষ হবে কালকের বিজয়রথে।
আজ যে সংযম কঠিন মনে হয় নফসের কাছে,
কাল তা হবে মুক্তোর মুকুট জান্নাতেরই মাঝে।
আজ যে চোখ হারাম থেকে ফিরিয়ে রাখে দৃষ্টি,
কাল সে চোখে ফুটে উঠবে জান্নাতি আলোর সৃষ্টি।
আজ যে জিহ্বা মিথ্যা ছাড়ে সত্যের পথে রয়,
কাল সে জিহ্বা রবের প্রশংসায় আনন্দ খুঁজে লয়।
আজ যে পা চলে মসজিদের পথে আল্লাহরই টানে,
কাল সে পা চলবে সুখে জান্নাতি বাগানে।
আজ যে হৃদয় আল্লাহ ছাড়া আর কিছু না চায়,
কাল সে হৃদয় চিরশান্তির আবাস খুঁজে পায়।
তাই হে আমার প্রিয় ভাই, হে ঈমানদার জন,
দুনিয়াকে নয়, আখিরাতকে করো জীবনের ধন।
এ পৃথিবী ক্ষণিকের ছায়া, ক্ষণিকেরই সফর,
চোখের পলকে শেষ হয়ে যায় জীবন নামের প্রহর।
চলো সবাই প্রস্তুত হই সেই মহাদিবস তরে,
যেদিন মানুষ দাঁড়াবে গিয়ে রবেরই দরবারে।
যেদিন ধন-সম্পদ কিছুই কোনো উপকারে নয়,
শুধু বিশুদ্ধ ঈমান তখন মুক্তির কারণ হয়।
হে আল্লাহ! দাও আমাদের তাকওয়ার সেই নূর,
যে নূরে আলোকিত হবে অন্তরেরই সুর।
দাও এমন সবর, যা বিপদে ভেঙে না যায় কখনো,
দাও এমন ঈমান, যা হারায় না জীবনের ক্ষণে।
দাও এমন হৃদয়, যা তোমার স্মরণে কাঁদে,
দাও এমন জীবন, যা তোমার সন্তোষে বাঁধে।
দুনিয়ার এই কারাগার পেরিয়ে যখন হবে শেষ,
তখন যেন পাই আমরা ফিরদাউসের চিরবেহেশত।
***
যে মুমিন চোখের জলে তওবার বীজ বোনে,
রহমতের বৃষ্টি নেমে আসে তারই হৃদয় কোণে।
গুনাহ যত পাহাড়সম হোক, ভয় কিসের আর,
রহমানের ক্ষমার সাগর সীমাহীন অপার।
কত মানুষ দুনিয়ার মোহে হারায় সত্যপথ,
মিথ্যা সুখের পেছনে ছুটে করে জীবন রথ।
কিন্তু যে জন কুরআনের আলোয় খুঁজে নেয় দিশা,
তার অন্তরে জেগে ওঠে ঈমানেরই নিশা।
ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি থাকবে না চিরকাল,
সবকিছুই ফেলে যেতে হবে যখন আসবে কাল।
কাফনের সেই সাদা কাপড় হবে শেষ সম্বল,
সাথে যাবে শুধু আমল, আর কিছু নয় অবলম্বল।
কবর হবে প্রথম ঘাঁটি আখিরাতের পথে,
সফল হবে সেই ব্যক্তি রবের রহমতে।
যে দুনিয়ার কারাগারে থেকেও ছিল ধীর,
আল্লাহর স্মরণে কাটিয়েছে জীবনের প্রতিক্ষণ স্থির।
হাশরের সেই ভয়াল দিনে যখন কাঁপবে প্রাণ,
সূর্য হবে নিকট এসে বাড়াবে তাপের টান।
সেদিন যারা আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ফেলেছিল,
আরশের ছায়ায় তাদের স্থান মহান রব দিয়েছিলেন।
মীযানের পাল্লায় যখন ওজন হবে কাজ,
সেদিন ধরা পড়বে সবার জীবনেরই সাজ।
কত অহংকার মিশে যাবে ধূলির সাথে তখন,
বিনয়ীদের মুখে ফুটবে বিজয়েরই চিহ্ন।
সিরাতের সেই সূক্ষ্ম পথে চলবে মানবজাতি,
কারও গতি বিদ্যুতসম, কারও দুঃসহ গতি।
মুমিন তখন আল্লাহর নূরে অগ্রসর হবে,
রহমতেরই হাতছানিতে জান্নাতের দ্বার রবে।
জান্নাতের সে শাশ্বত সুখ ভাষায় বলা ভার,
নেই সেখানে মৃত্যু কোনো, নেই বিচ্ছেদের ভার।
নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, নেই কোনো ক্লান্তি,
শুধু রবের সন্তুষ্টি আর অফুরন্ত শান্তি।
তখন মুমিন স্মরণ করে দুনিয়ার সেই দিন,
কত কষ্ট, কত পরীক্ষা, কত ছিল ঋণ।
সবই তখন তুচ্ছ মনে হবে এক নিমেষে,
যখন সে থাকবে চিরসুখের জান্নাতি পরিবেশে।
তাই হে হৃদয়! ধৈর্য ধরো, ভেঙো না কোনোদিন,
এই পরীক্ষার মাঝেই লুকায় সফলতার ঋণ।
দুনিয়া যদি কারাগার হয় ঈমানদার প্রাণে,
তবু এর শেষ প্রান্তে সুখ অপেক্ষায় জান্নাতে।
চলো তবে রবের পথে জীবন করি দান,
সত্যের পতাকা উড়ুক প্রতিটি হৃদয়প্রাণ।
দুনিয়ার ক্ষণিক বন্দিত্ব হাসিমুখে করি শেষ,
যেন আখিরাতে পাই ফিরদাউসের চিরবেহেশত।
***
আর কতদিন দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকবে মন?
কতদিন ভুলে থাকবে তুমি আখিরাতের পণ?
মৃত্যু এসে দাঁড়িয়ে আছে অদৃশ্য দুয়ারে,
ডাক পড়িলে ফিরবে না আর দুনিয়ার বাজারে।
যে যুবক আজ শক্তি নিয়ে চলে অহংকারে,
কাল সে হবে নীরব যাত্রী কবরের অন্ধকারে।
যে ধনী আজ সম্পদ গুণে কাটায় দিবস-রাত,
তারও হবে হিসাব একদিন, খুলবে আমলখাত।
যে মুমিন রবের ভয়ে গোপনে অশ্রু ঝরায়,
ফেরেশতারা তার সে কান্না সম্মান ভরে লেখায়।
যে সিজদাতে লুটিয়ে পড়ে গভীর নিশীথ রাতে,
তারই জন্য রহমতের দ্বার খুলে যায় আসমানে।
দুনিয়াটা ছায়ার মতো, থাকবে না তো চির,
আজকে কাছে, কালকে দূরে—এই তো তার তদবির।
যে বুঝেছে এ সত্যবাণী, সে-ই তো জ্ঞানবান,
আখিরাতের পাথেয় নিয়ে করে জীবনযান।
হে হৃদয়! তুই জেগে উঠ, আর কত ঘুমাবি?
মিথ্যা সুখের মরীচিকায় আর কতই বা যাবি?
রবের ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে আয় আজই,
ক্ষমার সাগর উথলে ওঠে তওবাকারীর মাঝেই।
যেদিন ভেঙে যাবে সবই দুনিয়ার গর্ব-শান,
থাকবে না আর পদ-পদবি, থাকবেনা সম্মান।
সেদিন শুধু কাজে লাগবে ঈমানভরা প্রাণ,
রবের রহমত লাভের আশায় কাঁদা অশ্রুদান।
তাই হে মুমিন! দৃঢ় হও, সত্যপথে চলো,
নফসের সাথে যুদ্ধ করে ঈমানের দীপ জ্বালো।
দুনিয়ার এই কারাগারও লাগবে সুখের দেশ,
যদি শেষে ফিরদাউস হয় চিরস্থায়ী আবেশ।
সেদিন জান্নাতের বাগিচাতে ডাকবে হুরের দল,
নদীর ধারে বইবে শান্তি, ঝরবে অনন্ত জল।
আর মহান রবের সন্তোষ হবে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার,
সেই আশাতে কাটুক জীবন, হোক অন্তর উদ্ভাসিত বারবার।
আমরা সবাই মুসাফির আজ, পথের ক্ষণিক সাথি,
আখিরাতের চিরজীবনই আমাদের আসল গাঁথি।
দুনিয়ার সব শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি মিলবে শেষ,
যদি রব দেন আশ্রয় তাঁর জান্নাতের পরিবেশ।
***
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি হৃদয়-জাগানিয়া গান,
রবের পথে চলার তরে জাগুক নিদ্রিত প্রাণ।
ক্ষণিক এই দুনিয়াখানা মুসাফিরের সরাইখানা,
আজ যে এলো, কাল সে যাবে—এটাই জীবনের গাথা।
কেউ আসে ধন-সম্পদ নিয়ে, কেউ আসে খালি হাতে,
কেউ হারিয়ে যায় মোহের স্রোতে, কেউ চলে হেদায়াতে।
কেউ গড়ে প্রাসাদ আকাশছোঁয়া, করে অহংকার,
কেউ বা কাঁদে সিজদায় পড়ে, খোঁজে রবের দরবার।
রাসূল দিলেন সত্য বাণী, জাগ্রত করল প্রাণ,
“মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার”—অমর সেই ঘোষণা মহান।
কাফিরের কাছে দুনিয়াটা সুখের রঙিন বাগান,
কিন্তু মুমিন জানে—এর পরেই শুরু অনন্ত জীবন।
কারাগারে বন্দী মানুষ যেমন ইচ্ছামতো চলে না,
শাসন, নিয়ম, সীমার মাঝে নিজেকে রাখে বাঁধা।
মুমিনও তেমনি নফসের সাথে যুদ্ধ করে যায়,
আল্লাহর বিধানের সামনে নিজের মাথা নত রাখে সদায়।
চোখ যা দেখে সবই কি তার ভোগ করা চলে?
হৃদয় যা চায় সবই কি তার হাতে এসে মেলে?
না, ঈমান বলে—“থামো একটু, ভাবো শেষ পরিণাম,
আজকের ক্ষণিক আনন্দ যেন না কেড়ে নেয় চিরকালীন ইনআম।”
নফস বলে—“আরও ভোগ করো, জীবন তো একবার!”
ঈমান বলে—“মৃত্যুর পরে হবে কঠিন বিচার।”
নফস বলে—“পাপের পথে সুখের রঙিন মেলা,”
ঈমান বলে—“ওই পথ শেষে জ্বলবে অনুতাপের জ্বালা।”
এই সংগ্রামেই গড়ে ওঠে প্রকৃত মুমিন প্রাণ,
প্রতিটি ক্ষণে চলে তার অন্তরের মহাযুদ্ধের গান।
শয়তান ডাকে হাজার পথে, ডাকে বিভ্রান্তির সুর,
তবু সে খোঁজে কুরআনের আলো, সুন্নাহর নূর।
যখন মানুষ দৌড়ায় শুধু দুনিয়ার মোহে মত্ত,
মুমিন তখন ভাবে নীরবে—“আখিরাতই সত্য।”
যখন কেউ সম্পদের নেশায় হারায় বিবেকবোধ,
মুমিন তখন আল্লাহর ভয়ে রাখে নিজেকে শোধ।
রাত গভীর হয়, নিভে যায় সব কোলাহলের রেশ,
মানুষ যখন ঘুমে বিভোর, নীরব চারিপাশ।
সেই সময়ে এক মুমিন উঠে অশ্রুভরা নয়নে,
দাঁড়ায় তাহাজ্জুদের সিজদাতে নির্জন রাতের কোণে।
সে বলে—“হে আমার রব! তুমি আমার আশ্রয়,
তোমার দয়া ছাড়া জীবনে আমার আর কিছু নয়।
আমার গুনাহ পাহাড়সম, তুমি ক্ষমার সাগর,
তোমার দরেই এসেছি আমি, তুমি ছাড়া কে আর?”
সেই কান্নার প্রতিটি ফোঁটা মুক্তার চেয়েও দামি,
সেই দীর্ঘশ্বাস পৌঁছে যায় আরশের খুব কাছাকাছি।
মানুষ দেখে না বাহির হতে অন্তরের সে ব্যথা,
কিন্তু রহমান দেখেন সব, জানেন হৃদয়ের কথা।
কত প্রলোভন আসে জীবনে, কত গুনাহর ডাক,
কত রঙিন মরীচিকা ছড়ায় মিথ্যা সুখের ফাঁদ।
তবু যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ফিরিয়ে নেয় দৃষ্টি,
তারই জন্য অপেক্ষা করে জান্নাতি আলোর সৃষ্টি।
যে যুবক আজ হারাম ছেড়ে হালালের পথে রয়,
যে কন্যা রবের সন্তুষ্টির জন্য লজ্জা আঁকড়ে রয়,
যে ব্যবসায়ী প্রতারণা ছেড়ে সত্যের পথে চলে,
তাদের প্রতিটি ত্যাগ লেখা হয় রহমতের খাতায় ফলে।
যে কর্মচারী ঘুষের টাকা ফিরিয়ে দেয় দৃঢ় হাতে,
যে বিচারক সত্য প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহরই ভয়ে,
যে শিক্ষক আমানতদার হয়ে শিক্ষা দেয় নিষ্ঠাভরে,
তাদের আমল নূরের মতো জ্বলবে আখিরাতের ঘরে।
দুনিয়ার সুখ শিশিরবিন্দু ভোরের সবুজ ঘাসে,
সূর্য উঠলেই মিলিয়ে যায় নীরব আকাশে।
মানুষ তবু সেই সুখ পেতে কাটায় কত কাল,
ভুলে যায় যে সামনে আছে অনন্ত জীবনের পাল।
ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি, সৌন্দর্য আর মান,
সবই থাকবে দুনিয়াতেই, যাবে না কবরস্থান।
কাফনের সেই সাদা কাপড় হবে শেষ পরিচয়,
সাথে যাবে শুধু আমল, আর কিছুই নয়।
একদিন থেমে যাবে সব দৌড়ঝাঁপের খেলা,
বন্ধ হবে হাসি-কান্না, ফুরাবে জীবনের বেলা।
যে মুখে ছিল অহংকারের ঝড়, সে মুখ হবে নীরব,
যে চোখে ছিল দুনিয়ার নেশা, হবে মাটির সঙ্গী সব।
কবর হবে প্রথম ধাপ আখিরাতের পথে,
সফল হবে সেই ব্যক্তি যে ছিল রবের রহমতে।
যে দুনিয়ার কারাগারে থেকেও ছিল ধৈর্যশীল,
আল্লাহর স্মরণে কাটিয়েছে জীবন অটল স্থির।
তারপর আসবে হাশরের দিন—মহাভয়ের প্রহর,
যেদিন মানুষ ছুটবে শুধু মুক্তির আশ্রয় ঘর।
সূর্য হবে খুবই নিকট, ঘাম হবে নদীর মতো,
প্রতিটি প্রাণ ভাববে শুধু—“আজ কী হবে আমার গত?”
সেদিন রাজা-প্রজা সবাই দাঁড়াবে একই কাতারে,
কেউ পারবে না লুকিয়ে যেতে ক্ষমতার আড়ালে।
ধন-সম্পদ, বংশগৌরব, কিছুই হবে না সহায়,
শুধু ঈমান ও নেক আমল মুক্তির কারণ হয়।
মীযানের পাল্লা বসবে তখন ন্যায়বিচারের তরে,
একটি কণাও হারাবে না হিসাবের ঘরে।
সৎকর্ম দেখে মুমিন তখন হাসবে অশ্রুভরা চোখে,
রহমতের আশা নিয়ে দাঁড়াবে মহান রবের সামনে।
সিরাতের সেই সূক্ষ্ম পথে চলবে মানবজাতি,
কারও গতি বিদ্যুতসম, কারও দুঃসহ গতি।
মুমিন তখন আল্লাহর নূরে এগিয়ে যাবে ধীরে,
রহমতের হাতছানিতে জান্নাতেরই দ্বারে।
তারপর খুলবে জান্নাতের অমর সুখের দেশ,
যেখানে নেই মৃত্যু কোনো, নেই বিচ্ছেদের রেশ।
নেই কোনো রোগ, নেই কোনো শোক, নেই ক্লান্তির ভার,
শুধু শান্তি আর শান্তি, আর রবের অপরিসীম উপহার।
সেখানে নদী বইবে সদা স্বচ্ছ সুধার জলে,
সেখানে বাগান ফুটে থাকবে যুগের পরে যুগ চলে।
সেখানে থাকবে না কোনো ভয়, না থাকবে অবসাদ,
রহমানের সন্তুষ্টিই হবে সর্বোচ্চ পুরস্কার।
তখন মুমিন স্মরণ করবে দুনিয়ার সেই দিন,
কত পরীক্ষা, কত কষ্ট, কত ছিল ঋণ।
এক মুহূর্তেই ভুলে যাবে সব বেদনার রেশ,
যখন সে থাকবে ফিরদাউসের জান্নাতি পরিবেশ।
তাই হে মুমিন! ভেঙে পড়ো না দুনিয়ার কষ্ট পেয়ে,
আজকের প্রতিটি অশ্রুবিন্দু মুক্তা হবে শেষে গিয়ে।
আজকের প্রতিটি ধৈর্য তোমার জান্নাতেরই সোপান,
আজকের প্রতিটি ত্যাগ হবে অফুরন্ত সম্মান।
চোখকে রেখো পবিত্র সদা, জিহ্বাকে রাখো সত্যে,
হৃদয়কে রাখো আল্লাহর স্মরণে প্রতিক্ষণে।
নফসের সাথে যুদ্ধ করে ঈমানের প্রদীপ জ্বালো,
কুরআনের আলো হাতে নিয়ে অন্ধকার পথ চলো।
মনে রেখো, এ পৃথিবী নয় চিরদিনের ঘর,
এখানে সবাই মুসাফির, সবাই পথের পর।
কেউ আগে যায়, কেউ পরে যায়, গন্তব্য একই স্থান,
আখিরাতের সেই সফরের প্রস্তুতি হোক প্রাণ।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে দাও তাকওয়ার নূর,
যে নূরে আলোকিত হবে জীবনের প্রতিটি সুর।
দাও এমন ঈমান, যা ঝড়ে কখনো না টলে,
দাও এমন সবর, যা বিপদেও হাসিমুখে চলে।
দাও এমন হৃদয়, যা তোমার স্মরণে কাঁদে,
দাও এমন জীবন, যা তোমার সন্তোষে বাঁধে।
দাও এমন মৃত্যু, যার শেষে রহমতের দ্বার খোলে,
দাও এমন আমল, যা আমাদের জান্নাতে তুলে।
দুনিয়ার এই কারাগার পেরিয়ে যখন হবে শেষ,
তখন যেন পাই আমরা ফিরদাউসের চিরবেহেশত।
রবের সন্তুষ্টি হোক তখন সর্বোচ্চ পুরস্কার,
সেই আশাতে কাটুক জীবন বারবার, অনিবার।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
৭৩
১৪৬ মন্তব্য