শিক্ষকের সম্মান, সত্য যাচাই ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা
সময়টা যেন খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এখন যে কেউ, যে কোনো সময়, যে কোনো বিষয়ে কিছু লিখে বা প্রচার করে দিতে পারছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রেই সত্য-মিথ্যা যাচাই, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার ন্যূনতম দায়িত্ববোধটুকুও দেখা যাচ্ছে না।
একজন শিক্ষক বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের মানুষ করে তোলার জন্য কাজ করেন। বিদ্যালয়ের এসএমসি গঠন, উপবৃত্তি কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পাঠদান, মাতৃস্নেহে ও পিতৃসুলভ মমতায় শিক্ষার্থীদের লালন-পালন—এসবের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষক তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত ক্ষোভ, স্বার্থের সংঘাত বা অনৈতিক সুবিধা না পাওয়ার কারণে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেন, তাহলে সেই দীর্ঘদিনের সুনাম মুহূর্তেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ এখন অনেক সময় প্রকৃত ঘটনার তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ হওয়া উচিত। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং একজন নির্দোষ মানুষের জীবন, পরিবার ও পেশাগত মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আজকাল অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বে না জড়িয়ে, সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেন বলেই বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। অনৈতিক দাবি-দাওয়া পূরণ না করলে বা কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তখন হয়ে ওঠে চরিত্রহননের সহজ মাধ্যম।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অভিযোগ করা যেমন নাগরিক অধিকার, তেমনি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও সামাজিক দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে একজন শিক্ষক, চিকিৎসক বা অন্য কোনো সম্মানিত পেশাজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নিয়ে প্রচার করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
একটি সভ্য সমাজে বিচার হবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, গুজবের ভিত্তিতে নয়; তদন্তের মাধ্যমে, আবেগের মাধ্যমে নয়; সত্যের আলোকে, অপপ্রচারের অন্ধকারে নয়।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পাবে, আবার নির্দোষ মানুষও অপবাদ ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হবে না। কারণ শিক্ষক সমাজকে সম্মান না করলে, শিক্ষকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে, ভবিষ্যতে মেধাবী ও আদর্শবান মানুষ এই মহান পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে।
সত্য যাচাই করি, গুজব নয়।
ন্যায়বিচার চাই, চরিত্রহনন নয়।
শিক্ষকের সম্মান রক্ষা করি, শিক্ষার পরিবেশ বাঁচাই।
৬
১২ মন্তব্য