Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ জুন, ২০২৬ ০৬:০৪ অপরাহ্ণ

গাফেল হৃদয়ের পরিণতি - মোঃ মুজিবুর রহমান

গাফেল হৃদয়ের পরিণতি

সূরাঃ আল-আ'রাফ আয়াতঃ ১৭৯ মাক্কী

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

কত মানুষ হাঁটে পথে, চোখে থাকে দৃষ্টির আলো,

তবু তারা সত্যের পথে একটুও না চলে ভালো।

কত মানুষ শুনে কথা, কানে আসে হকের বাণী,

তবু তাদের অন্তর জাগে না ঈমানের গল্পখানি।

হৃদয় নামে বক্ষের মাঝে মাংসপিণ্ডটি আছে ঠিক,

কিন্তু তাতে জাগে না আর সত্য চিনার কোনো দিক।

আল্লাহ দিলেন বোধের শক্তি, দিলেন জ্ঞানের আলোকধারা,

তবু তারা মোহের নেশায় ডুবে থাকে সারা-পারা।

নিদর্শনে ভরা ধরিত্রী, আকাশ জুড়ে কুদরতের ছাপ,

প্রতিটি সৃষ্টি বলে চলে, "এক রব আছেন অপরিমাপ।"

সূর্য ওঠে নির্দিষ্ট পথে, চন্দ্র চলে আপন নিয়মে,

ঋতু বদল, বৃষ্টি ঝরে, সবই কথা বলে নীরব প্রেমে।

তবু কত হৃদয় রয়ে যায় পাথরেরও অধিক কঠিন,

উপদেশে নড়ে না তারা, জাগে না তাদের ঘুমন্ত দিন।

কুরআনের আয়াত শুনেও হাসে তারা উদাস মনে,

মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়ে মাতে ক্ষণিক সুখের ক্ষণে।

পশুর চেয়েও কেন তারা অধিক পথভ্রষ্ট হলো?

কুরআনের এই কঠিন বাণী কেন তাদের জন্য বলো?

পশু তো তার স্রষ্টার দেওয়া স্বভাব ছেড়ে যায় না কভু,

অবাধ্যতার পতাকা তুলে বিদ্রোহ করে না সে কভু,

মানুষ কিন্তু জ্ঞান পেয়েও সত্যপথে চলে না আর,

নিজের রবের হুকুম ছেড়ে গড়ে পাপের অন্ধকার।

যে জ্ঞান ছিল মুক্তির সোপান, সেটাই হলো ধ্বংসের কারণ,

যে চোখ ছিল হিদায়াত দেখার, দেখল শুধু দুনিয়ার স্বপন।

যে কান ছিল কুরআন শোনার, শুনল শুধু গানের সুর,

যে হৃদয় ছিল রবের ঘর, হলো গুনাহে ভরপুর।

এভাবেই সে হারিয়ে ফেলে জীবনের প্রকৃত মান,

অবশেষে জাহান্নামের পথে করে নিজেরই যাত্রা দান।

মৃত্যু যখন সামনে এসে ভেঙে দেবে মিথ্যা ঘোর,

তখন আর ফিরবে না কেউ অতীত দিনের কোনো ভোর।

আফসোস করে বলবে তখন, "হায়! যদি বুঝতাম আগে,

একটু যদি রবের ডাকে সাড়া দিতাম অনুরাগে।"

হায়! যদি সে চোখ মেলে দেখত সৃষ্টির মাঝে রবের নূর,

হায়! যদি সে শুনত প্রাণে কুরআনের আহ্বান ভরপুর।

হায়! যদি সে হৃদয় খুলে করত একটু চিন্তা মাত্র,

তবে হয়তো জান্নাত হতো তারই চিরস্থায়ী পাত্র।

তাই হে মানুষ, গাফেল থেকো না আর ক্ষণিক মোহের টানে,

জীবন তোমার অতি সংক্ষিপ্ত, ফুরিয়ে যাবে অজানায় গানে।

চোখকে দাও সত্য দেখাতে, কানকে দাও হক শুনাতে,

হৃদয়টাকে জাগাও আজই রবের প্রেমে কাঁদতে শিখাতে।

যে হৃদয় আজ আল্লাহর ভয়ে কেঁপে ওঠে নির্জনে,

সে হৃদয়ই শান্তি পাবে কবরের কঠিন ক্ষণে।

যে মানুষ আজ বুঝে নেয় রবের দেওয়া নিদর্শন,

সেই পাবে জান্নাতের পথে মুক্তির চির সম্মান।

হে আল্লাহ! গাফেলতার ঘুম হতে জাগিয়ে দাও প্রাণ,

কুরআনের আলোয় ভরে দাও আমাদের অন্তঃস্থান।

দাও এমন হৃদয়, যা সত্য শুনে বিনম্র হয়ে যায়,

দাও এমন জীবন, যা শুধু তোমার সন্তোষে বয়ে যায়।

***

গাফেলতার ঘোরে যারা ডুবে থাকে রাত-দিন,

সত্য তাদের সামনে এলেও জাগে না অন্তরচিন।

আয়াত নেমে আসে বারবার, কাঁপায় না তাদের প্রাণ,

নিদর্শনের সমুদ্র দেখেও জাগে না কোনো জ্ঞান।

আকাশ বলে, "দেখো আমায়, কে রেখেছে শূন্যে ভাসিয়ে?"

পৃথিবী বলে, "দেখো আমায়, কত নেয়ামত দিয়েছি সাজিয়ে।"

পর্বত বলে, "আমার মাঝে কুদরতেরই পরিচয়,"

নদী বলে, "আমার স্রোতে রবের দয়া বয়ে রয়।"

কিন্তু গাফেল হৃদয় তখন ব্যস্ত থাকে অন্য ধ্যানে,

দুনিয়ারই ক্ষণিক সুখের মরীচিকার পেছন-পানে।

অর্থ, প্রতাপ, যশের নেশা গ্রাস করে তার মন,

আখিরাতের চিরবাসর হয় না তার অন্বেষণ।

সে ভাবে না, কে দিল তাকে নিশ্বাস নেবার শক্তি,

কে দিল তাকে চলার ক্ষমতা, জ্ঞানের অমল ভক্তি।

কে দিল চোখ, কে দিল কান, কে দিল হৃদয়খানি,

কার অনুগ্রহে ভরে আছে জীবনের প্রতিটা বাণী।

যখন ডাকে মুয়াজ্জিনের সুর, "এসো সফলতার পথে,"

গাফেল তখন ব্যস্ত থাকে দুনিয়ার হিসাব-খাতাতে।

যখন কুরআন ডাকে তাকে চিন্তা করতে স্রষ্টার তরে,

সে তখনও ডুবে থাকে মোহের কালো অন্ধকারে।

এভাবেই ধীরে ধীরে হৃদয় হয়ে যায় কঠিন,

তওবার অশ্রু শুকিয়ে যায়, মুছে যায় ঈমানের ঋণ।

গুনাহ তখন সহজ লাগে, নেকি লাগে ভার,

সত্য কথা শুনলেই যেন জেগে ওঠে অহংকার।

কিন্তু সময় চিরদিন তো মানুষের নয় হাতে,

হঠাৎ করেই মৃত্যু এসে দাঁড়াবে একদিন পথে।

সেদিন আর সম্পদ, সন্তান, বন্ধু হবে না সহায়,

আমল ছাড়া কেউ তখন কোনো উপকারে না যায়।

খুলে যাবে কর্মের খাতা, প্রকাশ পাবে সব,

কোনো কিছুই গোপন হবে না মহান প্রভুর রব।

যে হৃদয় আজ গাফেল ছিল, কাঁদবে সেদিন হায়,

ফিরে যাওয়ার সুযোগ চেয়ে কোনো সুযোগ না পায়।

তাই হে মানুষ, জাগো এখন, সময় এখনো আছে,

মৃত্যুর আগে ফিরে এসো রবের রহমতের কাছে।

চোখকে দাও সত্য দেখার, কানকে দাও শুনতে,

হৃদয়টাকে জাগিয়ে তোলো কুরআনের নূর গুনতে।

যে হৃদয়ে আল্লাহর ভয়, সে হৃদয় জীবন্ত,

যে হৃদয়ে রবের স্মরণ, সে হৃদয় সৌভাগ্যবান অনন্ত।

যে হৃদয় হকের ডাকে সাড়া দেয় বিনম্র প্রাণে,

সেই হৃদয়ই শান্তি পাবে জান্নাতের সুশীতল টানে।

***

গাফেল হৃদয় কাঁদে না আর পাপের কালো দাগে,

নসীহতের বৃষ্টি ঝরেও পরিবর্তন না জাগে।

আয়াত যখন হৃদয় ছোঁয়ার আহ্বান নিয়ে আসে,

তখন সে মন দুনিয়ারই রঙিন স্বপ্নে ভাসে।

আল্লাহ দিলেন চোখ দু'খানি সত্যপথের তরে,

কিন্তু সে চোখ ব্যস্ত থাকে মায়ার পিছু ঘুরে।

আল্লাহ দিলেন শ্রবণশক্তি হকের বাণী শুনতে,

তবু সে কান মগ্ন থাকে অসার কথায় ডুবতে।

আল্লাহ দিলেন হৃদয়খানি চিনবে যেন রব,

কুদরতের প্রতিটি ছাপে দেখবে আপন সব।

কিন্তু সে হৃদয় হারিয়ে গেল প্রবৃত্তিরই স্রোতে,

অহংকারের অন্ধ নেশায় ডুবে রইল মোহের ঘোরেতে।

দিনের পরে রাত যে আসে, রাতের পরে দিন,

এই পরিবর্তন দেখেও কেন জাগে না তার চিন?

মৃত্তিকারই ক্ষুদ্র মানুষ কতই করে দম্ভ,

একটু ক্ষমতা পেলেই যেন ভুলে যায় সব নম্রতা-গম্ভীর গম্ভ।

কবরের ঘুম দীর্ঘ হবে, সঙ্গী হবে আমল,

তবু কেন সে ভুলে থাকে এই মহাসত্য সম্বল?

মৃত্যু যে এক অবধারিত, আসবেই নির্ধারিত ক্ষণ,

তবু কেন সে গড়ে তোলে গুনাহেরই অট্টালিকাগণ?

যখন রূহ পৌঁছে যাবে কণ্ঠনালীর কাছে,

আপনজনের ভিড়ও তখন কোনো উপকারে না আসে।

সোনা-রূপা, ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি যত,

এক নিমিষে মিথ্যা হবে, ভেঙে যাবে সব শত।

তখন গাফেল হৃদয় বলবে, "হায়! যদি ফিরতাম আবার,

একটি সিজদা করতাম আমি, ছাড়তাম পাপের ভার।

একটু যদি কুরআনের আলো হৃদয়ে নিতাম স্থান,

আজকে তবে জ্বলত না এই অনুতাপের আগুন-প্রাণ।"

কিন্তু সেদিন আর ফিরবার সুযোগ কোথাও নেই,

শেষ হয়ে যায় কর্মক্ষেত্র, সময়ও থাকে না সেই।

যা বপন করে গেছে মানুষ, তাই তো ফলবে শেষে,

ন্যায়ের মালিক রবের কাছে কিছুই যাবে না মিশে।

তাই হে মানুষ, জাগো আগে মৃত্যুর আগমনে,

তওবার অশ্রু ঝরাও তুমি নির্জন রাতের ক্ষণে।

চোখকে দাও কুরআন দেখার, কানকে দাও শুনতে,

হৃদয়টাকে আল্লাহর ভয়ে বিনম্র হয়ে গুনতে।

যে হৃদয়ে জাগে তওবা, সে হৃদয় মৃত নয়,

যে হৃদয়ে জাগে ঈমান, সে হৃদয়ে শান্তি রয়।

যে হৃদয় রবের স্মরণে অশ্রুসিক্ত হয়,

আখিরাতে সেই হৃদয়ের জন্যই সফলতা রয়।

গাফেলতার কালো শৃঙ্খল ভেঙে দাও আজই,

কুরআনের নূর হৃদয়ে নাও, সময় আছে এখনও বাকি।

রবের পথে চললে মানুষ পাবে জান্নাতের সম্মান,

আর গাফেল হৃদয়ের পরিণতিজাহান্নামের অবসানহীন শাস্তিদান।

মন্তব্য করুন