সহকারী মৌলভী
১১ জুন, ২০২৬ ০৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ
সহকারী মৌলভী
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকের করণীয়: গবেষণা, বাস্তবতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
“ছেলেটা আগে কত মনোযোগ দিয়ে পড়ত, এখন বই খুলতেই চায় না!”
বর্তমান সময়ে এমন অভিযোগ প্রায় প্রতিটি পরিবারেই শোনা যায়। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা যখন দেখেন তাদের সন্তান ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। কেউ বকাঝকা করেন, কেউ কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেন, আবার কেউ হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সন্তান কি সত্যিই পড়াশোনা করতে চায় না, নাকি তার ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটছে যা আমরা বুঝতে পারছি না?
শিক্ষা ও শিশু মনোবিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় অনাগ্রহের পেছনে অলসতা নয়; বরং মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা শেখার পদ্ধতির সমস্যাগুলো দায়ী থাকে। তাই শুধু ফলাফল নয়, সন্তানের অনুভূতি ও মানসিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এই লেখায় গবেষণার আলোকে আলোচনা করা হবে কীভাবে অভিভাবকরা ভালোবাসা, সচেতনতা ও সঠিক কৌশলের মাধ্যমে সন্তানের পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে পারেন।
আজকের শিশুরা এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে যেখানে প্রতিনিয়ত তাদের মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা চলছে। স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণ, অনলাইন গেম এবং একাডেমিক চাপ—সব মিলিয়ে তাদের মনোযোগ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
তবে গবেষণা বলছে, শুধু প্রযুক্তিই দায়ী নয়। অনেক সময় পরিবারের অতি প্রত্যাশা, তুলনা করার প্রবণতা কিংবা সন্তানকে না বুঝে চাপ প্রয়োগ করাও শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়।
অনেক অভিভাবক সন্তানের রিপোর্ট কার্ড দেখেন, কিন্তু তার মনের অবস্থা জানার চেষ্টা করেন না। অথচ একজন শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষমতা তার মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সন্তানের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলুন, যেখানে সে বিচার বা সমালোচনার ভয় ছাড়াই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।
মনে রাখবেন, সন্তান যদি আপনাকে শিক্ষক নয়, নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখে, তাহলে সে নিজের সমস্যাগুলো খোলামেলাভাবে বলতে পারবে।
“তুমি কিছুই পারো না” — এই একটি বাক্য কখনো কখনো একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ায়। তাই নম্বর কম পেলেও তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করুন। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখাতে সাহায্য করুন।
শিশুরা যা দেখে, তাই শিখে। ঘরে যদি সারাক্ষণ টেলিভিশন চলে বা সবাই মোবাইলে ব্যস্ত থাকে, তাহলে শুধু সন্তানকে পড়তে বলা খুব বেশি কার্যকর হয় না।
একটি নিরিবিলি পড়ার জায়গা, নির্দিষ্ট রুটিন এবং পরিবারের সদস্যদের ইতিবাচক আচরণ শিশুর মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সচেতন ব্যবহার শেখানোই বেশি কার্যকর।
শিক্ষামূলক ভিডিও, অনলাইন কোর্স এবং ডিজিটাল লার্নিং টুল ব্যবহার করে প্রযুক্তিকে শেখার অংশ বানানো যায়। একই সঙ্গে স্ক্রিন টাইমের যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
“পাশের বাসার মেয়েটা প্রথম হয়েছে, তুমি পারো না কেন?”
এ ধরনের তুলনা শিশুদের অনুপ্রাণিত করার বদলে হতাশ করে। প্রত্যেক শিশুর শেখার গতি, আগ্রহ এবং সক্ষমতা ভিন্ন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিজেদের অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত তুলনার শিকার হয়, তাদের আত্মবিশ্বাস ও শেখার আগ্রহ উভয়ই কমে যায়।
বড় লক্ষ্য অনেক সময় ভীতিকর মনে হয়। তাই “এবার প্রথম হতে হবে” বলার পরিবর্তে “আজ একটি অধ্যায় শেষ করি” ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
ছোট সাফল্যগুলো শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তার শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।
অনেক অভিভাবক মনে করেন বেশি সময় পড়লেই ভালো ফলাফল হবে। কিন্তু গবেষণা বলছে, পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্য মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ক্লান্ত ও মানসিকভাবে অবসন্ন শিক্ষার্থী কখনোই দীর্ঘ সময় কার্যকরভাবে পড়াশোনা করতে পারে না।
সন্তানের পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনা কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি ধৈর্য, ভালোবাসা এবং বোঝাপড়ার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একজন শিক্ষার্থী যখন অনুভব করে যে তার পরিবার তাকে শুধু নম্বরের জন্য নয়, একজন মানুষ হিসেবেও মূল্যায়ন করছে, তখন তার ভেতরে শেখার আগ্রহ নতুন করে জন্ম নেয়।
সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো তাকে ভয় দেখানো নয়, বরং তার পাশে থাকা। কারণ একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হতে পারেন তার অভিভাবক।
৭১
১৪৫ মন্তব্য