Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ জুন, ২০২৬ ০৬:৩৩ অপরাহ্ণ

মানবতার বিদায় বাণী - মোঃ মুজিবুর রহমান


মানবতার বিদায় বাণী

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

হে মানবজাতি! শোনো আজি আরাফাতের ডাক,
যে ডাক যুগে যুগে জাগায় সত্যের পবিত্র শাখ।
যে বাণী নেমে এসেছিল রহমতের নবীর মুখে,
আজও তা নূরের প্রদীপ হয়ে জ্বলে বিশ্ববুকে।

অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল আরবের জনপদ,
জুলুম, বৈষম্য, অহংকারে ছিল কলুষিত সদা।
শক্তিমান করিত শাসন দুর্বলের রক্ত চুষে,
নারীর অধিকার ছিল বন্দী লাঞ্ছনারই ফাঁসে।

এমন সময় রহমতের নবী এলেন দিশা নিয়ে,
মানবতার শ্রেষ্ঠ পাঠ হৃদয় মাঝে দিয়ে।
তিনি বললেনমানুষ সবে আদম সন্তানের দল,
একই মাটি, একই উৎ, একই জীবনের ফল।

কোথায় তবে অহংকারের গর্বিত সেই ভাষা?
কোথায় বংশের বড়াই, কোথায় জাতির আশা?
তাকওয়া ছাড়া শ্রেষ্ঠত্বের নেই তো কোনো মান,
আল্লাহর কাছে মর্যাদা পায় খোদাভীরু প্রাণ।

বিদায় হজ্জের প্রান্তরে নবী দিলেন ঘোষণা,
মানবাধিকারের ইতিহাসে যা শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা।
বললেনতোমাদের রক্ত পবিত্র অতি,
তোমাদের ধন-সম্পদও নিরাপদ রাখো নিতি।

কোনো মানুষের সম্মান করো না কখনো ক্ষুণ্ণ,
অন্যায়ভাবে অধিকার হরণ করো না গুণ।
যেমন পবিত্র আজকের দিন, মাস নগর,
তেমনি পবিত্র মানুষের জীবন অন্তর।

বললেনশোনো, নারীদের হক আদায় করো,
স্নেহ, দয়া ভালোবাসায় সংসার আলোক ভরো।
তারা তোমাদের আমানত, আল্লাহর পক্ষ হতে,
অত্যাচারের হাত বাড়িও না কখনো তাদের প্রতি।

এতিম শিশুর অশ্রুধারা মুছে দাও আপন হাতে,
মিসকিনের মুখে আহার দাও ভালোবাসার সাথে।
ক্ষুধার্ত যদি থাকে পাশে, তুমি কেমন ধনী?
প্রতিবেশীর হক না দিলে বৃথা তোমার গণি।

শ্রমিক যখন শ্রম বিলায় রৌদ্রের প্রখর তাপে,
তার প্রাপ্য মজুরি দিও বিলম্ব না করে কভু পাছে।
ঘাম শুকানোর পূর্বেই দাও ন্যায্য তার মূল্য,
ন্যায়বিচারের এই শিক্ষাই ইসলামের মহামূল্য।

মদিনার সনদ সাক্ষী, ইসলামের সেই পথ,
যেখানে সব ধর্মের মানুষ পেয়েছিল সমান রথ।
স্বাধীনভাবে পালন করে নিজ নিজ বিশ্বাস,
নিরাপত্তার ছায়াতলে কাটিয়েছে শুভ নিশ্বাস।

কেউ অপরাধ করলে শুধু সে- হবে দায়ী,
নির্দোষ কোনো মানুষ হবে না তার সাথী।
ন্যায়ের পাল্লা সমান হবে ধনী কিংবা গরিব,
সত্যের সামনে মাথা নোয়াবে ক্ষমতাবানও নতশির।

মানবতার মহাসনদ কেবল কাগজ নয়,
যে জীবনের প্রতিটি পথে চলার পরিচয়।
অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা মানুষের ন্যায্য হক,
এসব হতে বঞ্চিত করা অন্যায়েরই শোক।

যুদ্ধের আগুন জ্বলে যখন শিশুর কান্নার মাঝে,
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস লেখা সাজে।
ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে মানুষ যখন ভুলে যায়,
তখন নবীর বিদায় বাণী নতুন করে পথ দেখায়।

তিনি শেখালেনক্ষমা করো, করো না প্রতিশোধ,
মানুষকে ভালোবাসাতেই লুকিয়ে আছে মোক্ষবোধ।
ঘৃণার দেয়াল ভেঙে গড়ো ভ্রাতৃত্বেরই সেতু,
মানবতার বন্ধন হোক পৃথিবী জুড়ে যত।

আজও যদি মানবজাতি সে শিক্ষা গ্রহণ করে,
শান্তির ফুল ফুটবে আবার ধরণীর অন্তরে।
অন্যায়, জুলুম, বৈষম্যের হবে অবসান,
প্রতিটি প্রাণ পাবে আবার মর্যাদার সম্মান।

এসো তবে হাতে হাত রেখে নবীর পথে চলি,
অধিকার আর দায়িত্ব নিয়ে জীবনগাঁথা গড়ি।
বিদায় হজ্জের বাণী হোক হৃদয়ের অলংকার,
মানবতার পতাকা উড়ুক বারবার, অনিবার।

যতদিন সূর্য উদয় হবে, চাঁদ উঠবে রাতে,
ততদিন নবীর শিক্ষা জ্বলবে মানবপ্রাতে।
মানুষ সবার আগে মানুষহোক চেতনা জাগ্রত,
মানবাধিকারের সুরে ভরে উঠুক বিশ্বভুবন সমগ্র।



***

মানবতার চিরন্তন সনদ

বিবেকের দুয়ারে আজ করি বিনীত আহ্বান,
জাগো হে মানবসমাজ, জাগো হে বিশ্বপ্রাণ।
যে বাণী যুগে যুগে ছড়ায় ন্যায়ের সুবাস,
যে আলো মুছে দেয় জুলুমের কালো সর্বনাশ।

মানুষ সবার আগে মানুষ সত্য চিরকাল,
স্রষ্টার দান সে মর্যাদা, নয় কারো জাল।
জাতি-বর্ণ, ভাষা-ধর্ম, ধনী কিংবা গরিব,
মানবতার আদালতে সবাই সমান নসীব।

জন্মের সাথে মানুষ পায় কিছু মহান অধিকার,
নয় কোনো রাজার দান, নয় কোনো উপহার।
প্রভুর পক্ষ থেকে আসে সম্মানের সে আলো,
যার দীপ্তিতে মানবজীবন হয় সুন্দর ভালো।

কত যুগে কত শাসক গড়েছে অত্যাচার,
ক্ষমতার অহংকারে করেছে অধিকার হরণ বারবার।
তবু ন্যায়ের পিপাসায় জেগেছে মানবপ্রাণ,
স্বাধীনতার গান গেয়ে লিখেছে নতুন গান।

সাইরাসের সেই আহ্বানে মুক্তির শঙ্খ বাজে,
দাসত্বের অন্ধকারে আশার প্রদীপ সাজে।
ম্যাগনা কার্টার পাতায় জ্বলে ন্যায়ের আলোকরেখা,
আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়ইতিহাস পেল দেখা।

কিন্তু মানবতার পূর্ণ রূপ ফুটল একদিন,
মদিনার পবিত্র মাটিতে জাগল নতুন ঋণ।
রহমতের নবী এলেন সত্যের দীপ জ্বেলে,
মানুষকে মানুষ ভাবার শিক্ষা দিলেন মেলে।

মদিনার সেই সনদে উঠল মহান ডাক,
সকল ধর্ম, সকল জাতি পেল নিরাপদ ফাঁক।
ধর্মের পথে স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা,
ন্যায়বিচারের ছায়াতলে মানবতার সফলতা।

কেউ যদি অপরাধ করে, দায় তার নিজেরই,
নির্দোষের ঘাড়ে বোঝা চাপবে না কখনোই।
দুর্বল যদি কাঁদে কোথাও, ছুটে যাও তার তরে,
মানবতা আল্লাহর কাছে প্রিয় সকলের চেয়ে বেশি করে।

এরপর এলো আরাফাতের সেই মহামহিম দিন,
যেখানে কেঁপে উঠেছিল লক্ষ মানবচিন।
নবীজি দাঁড়িয়ে দিলেন বিদায়ের আহ্বান,
মানবাধিকারের শ্রেষ্ঠতম অমর ঘোষণা দান।

বললেন"হে মানবজাতি! মন দিয়ে শোনো,
আজকের এই বাণী ভবিষ্যতে পৌঁছে দিও।
হয়তো সাক্ষাতের পর আর হবে না দেখা,
তাই হৃদয়ে ধারণ করো সত্যের রেখা।"

"তোমাদের রক্ত পবিত্র, পবিত্র তোমার প্রাণ,
পবিত্র তোমার সম্পদ, পবিত্র সম্মান।
যেমন পবিত্র নগরী, মাস দিন,
তেমনি পবিত্র মানুষের অধিকার প্রতিদিন।"

কেঁপে উঠল মরুভূমি, কাঁপল মানবমন,
মানবতার ইতিহাসে জ্বলল নতুন ক্ষণ।
জীবনের মর্যাদা পেল স্বর্গীয় স্বীকৃতি,
জুলুমের বিরুদ্ধে উঠল ন্যায়ের মহাগীতি।

বললেন"সুদের সব হিসাব আজ হলো বিলুপ্ত,
শোষণের যে শৃঙ্খল ছিল, আজ হলো লুপ্ত।
ক্ষমতার নামে আর নয় দুর্বলের রক্তপান,
ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ো মানবতার স্থান।"

বললেন"নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো,
ভালোবাসা আর মমতায় সংসার ভরো।
তারা তোমাদের আমানত মহান রবের দান,
তাদের সম্মান রক্ষা করা মুমিনের পরিচয় জ্ঞান।"

কত নারী যুগে যুগে পেয়েছে লাঞ্ছনা,
সে অন্ধকার ভেদ করে উঠল মুক্তিগাথা।
অধিকারের আসনে বসালেন নারীজাতিকে,
সম্মানের মুকুট দিলেন মানবসভ্যতাকে।

পুনরায় উচ্চারিলেন বিশ্বমানবের তরে,
"
সবাই আদম সন্তানের দল ধরণীর ঘরে।
আরবের উপর অনারবের নেই কোনো শ্রেষ্ঠত্ব,
অনারবের উপর আরবেরও নেই প্রাধান্য।"

"সাদার উপর কালোর নয়, কালোর উপর সাদা,
তাকওয়া ছাড়া মর্যাদার নেই কোনো বাধা।"
বর্ণবাদের অন্ধকারে বজ্রের মতো ধ্বনি,
মানবতার আকাশজুড়ে জ্বলে উঠল আলোকবাণী।

ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সবাই একই কাতার,
আল্লাহর কাছে মানুষের মূল্য তাকওয়ার।
বংশের গৌরব, রঙের অহংকার, জাতির বড়াই যত,
সত্যের সামনে মুছে যায় সব বিভেদের রথ।

এতিমের চোখের পানি মুছে দাও আপন হাতে,
মিসকিনের ক্ষুধা নিবারণ করো ভালোবাসাতে।
অসহায়ের মুখে হাসি ফিরিয়ে দাও আবার,
সেবাই মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার।

প্রতিবেশীর হক আদায় করো আন্তরিক প্রাণে,
তার সুখে হাসো তুমি, দুঃখে দাঁড়াও টানে।
শ্রমিকের ঘামে গড়ে ওঠে সভ্যতারই ঘর,
তাদের ন্যায্য অধিকার দাও, করো না অবহেলা আর।

শিক্ষার আলো পৌঁছে যাক প্রতিটি জনপদে,
অজ্ঞতার কালো মেঘ হারিয়ে যাক গগনে।
চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় মানুষের হক,
এসব হতে বঞ্চিত করা অন্যায়েরই শোক।

আজও পৃথিবীর পথে পথে রক্তের ধারা বয়,
অধিকারহারা মানুষের কান্না থামে না কভু কই।
কোথাও শিশু হারায় প্রাণ, কোথাও মায়ের আর্তনাদ,
কোথাও শক্তির অহংকারে পিষ্ট হয় মানবজাত।

তাই ফিরে চলো আরাফাতের সেই প্রান্তরে,
ফিরে চলো নবীর বাণীর আলোকিত অন্তরে।
যেখানে ন্যায়ের শপথ আছে, আছে করুণার গান,
আছে মানবমুক্তির শ্রেষ্ঠ চিরন্তন আহ্বান।

যদি মানুষ মানুষকে দেয় প্রাপ্য সম্মান,
যদি ন্যায়ের পথে চলে প্রতিটি প্রাণ,
যদি দুর্বলের পাশে দাঁড়ায় শক্তিমান,
তবে বদলে যাবে পৃথিবী, ফুটবে শান্তির গান।

এসো আজ শপথ করি মানবতার তরে,
জীবন গড়ব সত্য, ন্যায় আর প্রেমের ঘরে।
বিদায় হজ্জের বাণী হোক হৃদয়ের অলংকার,
মানবাধিকারের সূর্য উঠুক বারবার।

যতদিন আকাশ জুড়ে সূর্য হাসবে আলোয়,
যতদিন চাঁদের রূপ ভাসবে নিশির কালোয়,
ততদিন নবীর বাণী থাকবে অম্লান,
মানবতার ইতিহাসে জ্বলবে চির মহান।

মানুষ সবার আগে মানুষহোক জাগরণ,
ভালোবাসায় ভরে উঠুক বিশ্বভুবন।
ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্বে গড়ুক নতুন যুগের দ্বার,
এটাই হোক মানবতার চিরন্তন মহাসনদ আর।

মন্তব্য করুন

ব্লগ