Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ জুন, ২০২৬ ০৮:১০ অপরাহ্ণ

গ্যাস বেলুন কি শুধুই বিনোদন নাকি বিস্ফোরক?

গ্যাস বেলুনে কোন গ্যাস ভর্তি থাকে?উত্তর আমরা প্রায় সকলেই জানি,হিলিয়াম। কিন্তু না! পথে- ঘাটে,হাটে-বাজারে পাওয়া যত্রতত্র হাইড্রোজেন গ্যাস ভর্তি বেলুনে বাজার সয়লাব।মহাবিশ্বের সবচেয়ে হালকা গ্যাস হাইড্রোজেন(H2) যার ভর ২.০১৬ গ্রাম/মোল।হাইড্রোজেন গ্যাস বাতাসের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ হালকা এবং ঘনত্ব ০.০৮৯৯ গ্রাম/লিটার। বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরার কারণ হলো সস্তা,সহজলভ্য এবং বেলুন দ্রুত উপরে উঠতে পারে।শিল্পক্ষেত্রে,১০কিউবিক মিটার হাইড্রোজেন গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৫০০০০ টাকা।অন্যদিকে,হিলিয়াম(He) হলো পর্যায় সারণির গ্রুপ-১৮ এর s-ব্লকভুক্ত একমাত্র নিষ্ক্রিয় গ্যাস।নিষ্ক্রিয় গ্যাসের বৈশিষ্ট্য হলো এদের বহি:স্থ স্তর ইলেকট্রনপূর্ণ থাকায় এরা রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল ও বিক্রিয়াহীন,গন্ধহীন,স্বাদহীন এবং অদাহ্য।মহাবিশ্বের দ্বিতীয় হালকা গ্যাস হিলিয়াম যার ঘনত্ব ০.১৭৮৫ গ্রাম/লিটার।হাইড্রোজেন গ্যাসের তুলনায় এটি দ্বিগুন ভারী।শিল্পক্ষেত্রে রিফিলযোগ্য হিলিয়াম সিলিন্ডার ১০ কিউবিক মিটার গ্যাসের মূল্য প্রায় ১,২০,০০০ টাকা।মূল্য বেশি হওয়ার কারণ হিলিয়াম গ্যাস সরাসরি তৈরি করা যায় না মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস কূপগুলো হিলিয়ামের উৎস।এ আলোচনা থেকে মনে হতে পারে,হাইড্রোজেন গ্যাস দ্বারা বেলুন ভর্তি করাটা সঠিক।কিন্তু হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য,সামান্য উত্তাপ বা আগুনের সংস্পর্শে বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশে বিস্ফোরন হতে পারে।বাণিজ্যিকভাবে মিথেনের স্টিম(বাষ্প) রিফর্মিং প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করা হয়।এছাড়া এসিড মিশ্রিত পানিকে তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিয়োজিত করে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস উৎপন্ন করা যায়, দস্তার সাথে সালফিউরিক এসিড যোগ করে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করা যায়।কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় সিলিন্ডারের ভিতরেই হাইড্রোক্লোরিক এসিড বা কস্টিক সোডা,অ্যালুমিনিয়াম ও পানির বিক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে বেলুনে ভর্তি করে।ফলে প্রতিটি বেলুনে গ্যাসের খরচ পড়ে মাত্র ৩-৫ টাকার মতো অথচ হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করলে এ খরচ হতো ১০০ টাকার উপরে।এভাবে সরাসরি সিলিন্ডারে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।কারণ,প্রথমত বিক্রিয়াটি তাপোৎপাদী ,ফলে সিলিন্ডারের ভিতরে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়।তাছাড়া হাইড্রোজেন গ্যাসের ভর কম হওয়ায় দ্রুত প্রসারণশীল ফলে সিলিন্ডারের ভিতরের দেয়ালে প্রচুর চাপ সৃষ্টি করে।মূলত এ সিলিন্ডারগুলো গ্যাস পরিবহনের জন্য,গ্যাস উৎপাদন করার জন্য না। উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চ চাপে সিলিন্ডারগুলো নাজুক হয়ে যায়,তাই গ্যাস ভরার সময় বিস্ফোরনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।বাচ্চাদের আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন কার্টুন চরিত্র,মাছ,পাখির আকৃতিতে অহরহ গ্যাস বেলুন বিক্রি হচ্ছে।বেশিদিন আগের কথা নয়,মীরাক্কেল খ্যাত কৌতুক অভিনেতা গ্যাস বিস্ফোরণে আহত হয়েছিলেন,মিরপুরের রুপনগরে বেলুনে গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাত জন মৃত্যুবরণ করে ও পনেরো জন আহত হয়,এছাড়া গাজীপুরে রাজনৈতিক মিছিলে গ্যাস বেলুন বহনের সময় বিস্ফোরণে একুশ জন দগ্ধ হয়,পাশ্ববর্তী প্রতিবেশি দেশ ভারতের মুম্বাইয়ে লিফটে গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে।বর্তমানে এলপিজি(তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার দূর্ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস লাইন লিকেজের বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়েছে।রেগুলেটর বা হোস পাইপে ত্রুটির কারণে গ্যাস লিকেজ, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের  সিলিন্ডার,অসচেতনতা এর জন্য দায়ী। যেকোন উৎসবকে নিরাপদ করা ও দূর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে হাইড্রোজেন গ্যাস ভর্তি বেলুন যাতে উৎপাদন ও বাজারজাত না হতে পারে এ ব্যাপারে প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিৎ ও সাধারণ মানুষকে এ বিষাক্ত গ্যাস বেলুন কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার যাতে বাজারজাত না হয় এবং গ্যাস লাইন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন।পরিশেষে বলা যায়, আমাদের সচেতনতার মাধ্যমে এসব দূর্ঘটনা বহুলাংশে এড়ানো সম্ভব।

সোনিয়া আহমেদ

প্রভাষক,রসায়ন

সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ

মন্তব্য করুন