Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ জুন, ২০২৬ ০৮:৩৭ অপরাহ্ণ

পাখির ভালোবাসা (পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত প্রাণিজগতের গল্পগুলোর একটি।)

১৯৯৩ সালে গুলিবিদ্ধ হয়ে উড়ার ক্ষমতা হারিয়েছিল মালেনা। তারপর ক্রোয়েশিয়ার এক ছোট্ট গ্রামের ছাদেই কেটে যায় তার জীবন। কিন্তু প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তার কাছে ফিরে আসত ক্লেপেতান। টানা প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই ঘটনাই আজ পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত প্রাণিজগতের গল্পগুলোর একটি। --- ১৯৯৩ সাল। ক্রোয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম ব্রডস্কি ভারোশের আকাশে সেদিনও অন্য দিনের মতো উড়ছিল একটি সাদা সারস। হঠাৎ শিকারিদের গুলিতে তার একটি ডানা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সেই মুহূর্তেই যেন বদলে যায় তার পুরো জীবন। সারসটির নাম মালেনা। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে সে আর কোনোদিন আকাশে ডানা মেলে উড়তে পারেনি। যেসব সারস জন্মগতভাবে আকাশকে নিজের ঘর মনে করে, তাদের মধ্যে একজনকে হঠাৎ মাটিতে থেমে যেতে হয়েছিল। সেই অসহায় সময়ে তাকে আশ্রয় দেন অবসরপ্রাপ্ত পরিচর্যাকারী স্টিয়েপান ভোকিচ। নদীর ধারে আহত অবস্থায় মালেনাকে খুঁজে পাওয়ার পর তিনি তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। শীতের কনকনে ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে বানিয়ে দেন আলাদা ঘর, নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং বছরের পর বছর তাকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো যত্নে রাখেন। অন্য সারসেরা যখন প্রতি বছর হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আফ্রিকার পথে উড়ে যেত, মালেনা তখন ভোকিচের বাড়ির ছাদে বসে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। ২০০১ সালে সেই অপেক্ষার রং বদলে যায়। এক পুরুষ সারস এসে মালেনার পাশে বাসা বাঁধে। তার নাম দেওয়া হয় ক্লেপেতান। শীত এলেই সে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে উড়ে যেত, আর বসন্তের শুরুতেই আবার ফিরে আসত মালেনার কাছে। গবেষকদের হিসেবে এই যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার। আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপের নানা অংশ অতিক্রম করে সে প্রতি বছর একই বাড়ির একই ছাদে ফিরে আসত। এই ফিরে আসা একবার বা দুবার নয়, টানা প্রায় দুই দশক ধরে নথিবদ্ধ হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম প্রতি বছর ক্লেপেতানের আগমনের খবর প্রকাশ করত, আর হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করত কবে আবার সেই সাদা সারসটি মালেনার পাশে এসে দাঁড়াবে। মালেনা উড়তে না পারলেও তাদের সংসার থেমে থাকেনি। ভোকিচের সহায়তায় ক্লেপেতান ও মালেনা একসঙ্গে মোট ৬৬টি ছানার জন্ম দেয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্রতি বছর ছানারা বড় হলে ক্লেপেতান তাদের নিয়ে দক্ষিণে উড়ে যেত। মালেনা থেকে যেত নিজের বাসায়। একদিকে দীর্ঘ অপেক্ষা, অন্যদিকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের যাত্রা—তারপরও প্রতি বসন্তে আকাশ যেন আবার তাদের মিলিয়ে দিত। এই দৃশ্য বহু মানুষের কাছে শুধু প্রাণিজগতের ঘটনা ছিল না, বরং এমন এক সম্পর্কের ছবি হয়ে উঠেছিল, যার ব্যাখ্যা হয়তো সবসময় বিজ্ঞানের ভাষায় মেলে না। তবে তাদের জীবন সবসময় শান্ত ছিল না। ২০১৭ সালে ক্লেপেতান ফিরে এসে দেখতে পায়, মালেনার বাসায় আরেকটি পুরুষ সারস রয়েছে এবং একটি ডিমও রয়েছে সেখানে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্লেপেতান সেই প্রতিদ্বন্দ্বী সারসকে তাড়িয়ে দেয় এবং ডিমটিও নষ্ট করে ফেলে। ঘটনাটি ক্রোয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এতে স্পষ্ট হয়, সারসদের জীবনেও এলাকা রক্ষা এবং সঙ্গীকে ঘিরে প্রতিযোগিতা কতটা প্রবল হতে পারে। ২০১৯ সালে ক্লেপেতান সময়মতো না ফেরায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন সে আর বেঁচে নেই। কিন্তু ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে সে আবার ফিরে আসে। ২০২১ সালেও সে মালেনার কাছে ফিরে এসেছিল। সেই বছরই, ৭ জুলাই, ২৮ বছর ধরে স্টিয়েপান ভোকিচের স্নেহে বেঁচে থাকার পর মালেনার মৃত্যু হয়। সে সময় তার বয়স ছিল প্রায় ২৮ বছর। পরবর্তীকালে ক্রোয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, ক্লেপেতান এখনও জীবিত এবং তার নতুন সঙ্গীর নাম ম্লাদা। ভোকিচের বাড়ির কাছেই আপেল গাছের নিচে মালেনাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে, আর মাঝে মাঝে ক্লেপেতান সেই জায়গার আশপাশে এসে দাঁড়ায় বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন