সিনিয়র শিক্ষক
১৫ জুন, ২০২৬ ০৯:৩০ অপরাহ্ণ
শিক্ষাবর্ষ শেষ, পরীক্ষা শুরু: সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য দাবি
শিক্ষাবর্ষ শেষ, পরীক্ষা শুরু: সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য দাবি
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতম কাঠামোগত দিকটি সম্ভবত এটাই—শ্রেণিকক্ষের পাঠদান শেষ হওয়া থেকে পাবলিক পরীক্ষা শুরু হওয়া এবং ফল প্রকাশ থেকে পরবর্তী স্তরে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মধ্যকার অযৌক্তিক ও কৃত্রিম দীর্ঘসূত্রতা। একটি শিক্ষাবর্ষ শেষ হয় ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে, অথচ এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা দুই থেকে তিন মাস কোনো একাডেমিক কার্যক্রম ছাড়াই অলস বসে থাকে। একইভাবে, ফল প্রকাশের পর ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে টানতে থাকে জুন-জুলাই পর্যন্ত। খাতা মূল্যায়নের জন্য প্রচলিত ও আইনগত ৬০ দিন সময়কে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রেখেও, কেবল পরীক্ষার আগের এবং ফলাফলের পরের এই মধ্যবর্তী সময়টুকুর অপচয়ের কারণে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে প্রতি বছর প্রায় চার-পাঁচ মাস কেবল প্রতীক্ষার স্থবিরতায় কেটে যায়।
কেন এই ব্যবধান ভয়াবহ ও ক্ষতিকর?
একাডেমিক ধারাবাহিকতা ভঙ্গ ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি: নির্দিষ্ট সময়ে পাঠদান শেষ হওয়ার পর পরীক্ষা বিলম্বিত হলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শেখার ধারা বিচ্ছিন্ন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ বিরতিতে অধীত জ্ঞানের ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষার্থীরা একধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদে ভোগে।
অনিয়ন্ত্রিত কোচিং বাণিজ্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: এই ফাঁকা সময়টিকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে এক অনৈতিক কোচিং শিল্প। অভিভাবকদের মনে ভয় কাজ করে—‘সন্তানের পড়া আটকে রাখা যাবে না’। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও তারা সন্তানকে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে ছুটতে বাধ্য হন। বর্তমানে শুধু ঢাকা শহরেই পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্রিক বাৎসরিক কোচিং বাণিজ্যের লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
🟡 প্রকৃত ব্যাপারটি আরও গভীর: অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা মেধাবী ঠিকই, কিন্তু তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন, প্রশিক্ষিত শিক্ষকও নন। এরা বহুল প্রচারণার মাধ্যমে ‘তারা শিক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন—ইউটিউব, ফেসবুক ও বিলবোর্ডে গ্যারান্টি দিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করেন। তাদের সাফল্য মাপা হয় শুধু ‘কটি কমন পড়ল’ বা ‘কজন এ+ পেল’ দিয়ে। অথচ একজন প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষককে পড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের দায়িত্ব নিতে হয়। কোচিং শিক্ষকদের সংকীর্ণ পরিধির সাফল্যই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখে। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে, বিদ্যালয়ের শিক্ষকের চেয়ে কোচিংয়ের প্রচারকৃত শিক্ষকই বেশি ‘রেজাল্ট দেয়’—তখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আরও প্রান্তিক হয়।
জাতীয় মানবসম্পদের অপচয়: একটি উন্নয়নশীল দেশে একজন শিক্ষার্থীর কার্যকর শিক্ষাজীবন ১২-১৫ বছর। এই সময়ের মধ্যে যদি স্রেফ পরীক্ষা শুরু ও ভর্তির অপেক্ষায় ২-৩ বছর নষ্ট হয়, তবে তা সমষ্টিগতভাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর বড় আঘাত। প্রতিবছর দেশের প্রায় ২ কোটি শিক্ষার্থী (মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে) এই কৃত্রিম সেশন জটের শিকার হচ্ছে।
সমাধান: খাতা মূল্যায়নের সময় অক্ষুণ্ণ রেখে শিক্ষাপঞ্জি পুনর্নির্ধারণ
এই সংকটের সমাধানের জন্য শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করার কিংবা খাতা মূল্যায়নের মান কমানোর কোনো প্রয়োজন নেই। খাতা মূল্যায়নের জন্য বিদ্যমান ৬০ দিন সময় সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রেখেই নিচের তিনটি সময়বদ্ধ সংস্কার করা সম্ভব:
[বর্তমান ব্যবস্থা]
পাঠদান শেষ ➔ (২-৩ মাস অপেক্ষা) ➔ পরীক্ষা ➔ (৬০ দিন মূল্যায়ন) ➔ ফল প্রকাশ ➔ (২-৩ মাস ভর্তি যুদ্ধ) ➔ নতুন ক্লাস
👇
[প্রস্তাবিত ব্যবস্থা]
পাঠদান শেষ ➔ (১৫ দিন রিভিশন) ➔ পরীক্ষা ➔ (৬০ দিন মূল্যায়ন) ➔ ফল প্রকাশ ➔ (১৫ দিন ডিজিটাল ভর্তি) ➔ নতুন ক্লাস
১. পরীক্ষার পূর্ববর্তী অলস সময় সংকোচন (Exam Lead-Time Reduction)
শ্রেণিকক্ষের পাঠদান শেষ হওয়ার অনধিক ১৫ দিনের মধ্যে লিখিত পরীক্ষা শুরু করতে হবে। পরীক্ষার পূর্বে প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত পুনরালোচনার (Revision) জন্য ৭ থেকে ১০ দিনই যথেষ্ট। 🟡 এটাই স্বাভাবিক নিয়ম: বিশ্বের গতিশীল শিক্ষাব্যবস্থায় (জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) পাঠদান শেষের ১-২ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা হয়। আমাদের দেশে এই দীর্ঘ ফাঁকা সময় কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার ফলে সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু কালক্রমে তা ‘নীতি’ হিসেবে গেঁথে গেছে। শিক্ষাবর্ষ শেষে পরীক্ষা দিতে কোনও অতিরিক্ত চাপ নেই—চাপ সৃষ্টি করে এই কৃত্রিম অপেক্ষা। এর অতিরিক্ত সময় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে কোনো নতুন মাত্রা যোগ করে না, বরং অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বাড়ায়।
২. ফলাফল-পরবর্তী ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়তা ও ডিজিটালাইজেশন
খাতা মূল্যায়ন শেষে ফলাফল প্রকাশের পর আর কোনো মানবীয় বা আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের যৌক্তিকতা নেই। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ফল প্রকাশের ২ সপ্তাহের (১৫ দিন) মধ্যে পরবর্তী স্তরে ভর্তি সম্পন্ন করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল নমিনেশন, অনাবশ্যক ফি বর্জন এবং অটো-মাইগ্রেশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে (যেমনটি ভারতের CBSE বোর্ড বা কলম্বিয়ায় সফলভাবে চালু আছে) এই প্রক্রিয়া একদিনেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং ভর্তি হয়রানি বন্ধ হবে।
🟡 ৩. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি—একটি অনিবার্য ফলাফল
উপরের সংস্কার দুটি বাস্তবায়িত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোচিংনির্ভর মানসিকতা ভাঙবে। কারণ আর ২-৩ মাস ফাঁকা সময় থাকবে না, যেখানে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে ছুটবে। তখন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই সময়মতো পাঠদান শেষ করা, রিভিশন দেওয়া ও পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পালন করতে হবে। 🟡 এই গন্ডি থেকে বেরিয়ে এলে শিক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হবে না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের পেশাদার দায়বদ্ধতা বাড়বে। যারা প্রকৃত মেধাবী ও প্রশিক্ষিত তারা আর কোচিংয়ের ‘তারা শিক্ষক’দের ছায়ায় থাকবেন না। আর যারা কেবল প্রচারের জোরে শিক্ষক সেজেছিলেন, তারা স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে চলে আসবেন—হয় প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুক্ত হবেন, নয়তো টিউটরিংয়ের সীমিত পরিসরে থাকবেন।
৪. একাডেমিক অভিযোজন সপ্তাহ (Orientation & Bridge Course)
নতুন স্তরে ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম সপ্তাহটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো 'ওরিয়েন্টেশন এবং ব্রিজ কোর্স'-এর জন্য বরাদ্দ রাখতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিক অবসাদ কাটিয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যসূচির সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।
এই সংস্কারের সুদূরপ্রসারী লাভ:
· আর্থিক স্বস্তি: কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং অভিভাবকদের অযাচিত আর্থিক চাপ কমবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা কোচিং ফি বাবদ বিদ্যালয়ের ফির চেয়েও বেশি খরচ করে, তাদের জন্য এটি বড় স্বস্তি।
· গতিশীল শিক্ষাজীবন: শিক্ষার্থীরা কোনো সেশন জট ছাড়াই দ্রুত নতুন স্তরে পাঠ শুরু করতে পারবে, যা তাদের কর্মজীবনে দ্রুত প্রবেশে সাহায্য করবে।
· প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি: বাধ্যতামূলকভাবে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই মূল পরীক্ষার প্রস্তুতি দেবেন—ফলে তাদের দায়িত্ব, সম্মান ও জনবিশ্বাস বাড়বে।
· দক্ষতা বৃদ্ধি: জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার দক্ষতা ও গতিশীলতা বাড়বে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পূর্বশর্ত।
· সম্পদের সঠিক ব্যবহার: উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ‘সময় ও মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার’ নিশ্চিত হবে।
উপসংহার
শিক্ষা কেবল পরীক্ষা ও সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন, গতিশীল ও উন্নয়নমুখী প্রক্রিয়া। বর্তমান শিক্ষাবর্ষের কাঠামো যে কৃত্রিম সেশন গ্যাপ তৈরি করে, তা কোনো নীতিগত জটিলতা বা খাতা কাটার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার ফল। এটি এমন এক অস্বাভাবিক অবস্থা, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে স্বাভাবিক নীতি হিসেবে প্রচলিত হয়ে গেছে। খাতা মূল্যায়নের গুণগত মান ঠিক রেখেও শুধু পরীক্ষার আগের এবং ফলাফলের পরের মৃত সময়টুকু বাঁচিয়ে শিক্ষাপঞ্জি সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের উচিত দেরি না করে অন্তত একটি শিক্ষা বোর্ড বা বিভাগে পরীক্ষামূলকভাবে (Piloting) এই প্রস্তাবনাটি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা।
আমরা যদি এই সংস্কার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হবে—যেখানে মেধা ও প্রশিক্ষণের মূল্য থাকবে, প্রচারের নয়।
লেখক
মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার।
১৫-৬-২০২৬
৫৩
৯২ মন্তব্য