Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ জুন, ২০২৬ ০৫:৩৭ অপরাহ্ণ

ম্যানগ্রোভ বন বাঁচলেই বাঁচবে উপকূল, টিকবে জীববৈচিত্র্য

ম্যানগ্রোভ বন বাঁচলেই বাঁচবে উপকূল, টিকবে জীববৈচিত্র্য
মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার
১৬ জুন, ২০২৬
মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া থেকে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীর—দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) ধ্বংসের যে দৃশ্য প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে, তা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সামষ্টিক নৈতিকতার কঠিন প্রশ্ন। আদালতের নির্দেশ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা, প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান—কিছুই থামাতে পারছে না ভূমিদস্যুদের এই সংগঠিত ধ্বংসযজ্ঞ। প্রতিদিন কুড়ালের আঘাতে উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর সৃষ্টি করছে ফাঁকা, আর অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা।

১. উপকূলের নীরব প্রহরী
প্যারাবন কোনো সাধারণ বন নয়—এটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বনঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলভাঙন ও লবণাক্ততার বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হয়ে কাজ করছে। সুন্দরবন যেমন পশ্চিমের রক্ষাকবচ, তেমনি কক্সবাজারের প্যারাবনগুলো দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের জীবনরেখা। অথচ জাতীয় পর্যায়ে এদের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা এতটাই কম যে দখল ও ধ্বংস অবাধে চলছে।
বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ম্যানগ্রোভ বন ঝড়ের গতিবেগ ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে, ঢেউয়ের শক্তি শোষণ করে এবং উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দেয়। ২০০৪ সালের সুনামির পর থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ অক্ষত ছিল, সেখানে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বিশ্বের অন্যতম কার্যকর কার্বন শোষক—প্রতি হেক্টরে বছরে প্রায় ৩০০-৫০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অপরিহার্য।

২. চোখের সামনে বাস্তুতন্ত্রের পতন
বাঁকখালী নদীর তীরের প্যারাবন একসময় ছিল পাখি, মাছ, কাঁকড়া ও অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস। সম্প্রতি মাত্র এক রাতে প্রায় ৮ একর জমির ৩০ হাজারের বেশি গাছ কেটে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ বসতি—একটি ঘটনাই ধ্বংসের নৃশংসতা ফুটিয়ে তোলে।
শুধু তাই নয়—সোনাদিয়া দ্বীপ, ঘটিভাঙ্গা, তাজিয়াকাটা ও হামিদার দিয়া—মহেশখালীর এসব অঞ্চলে বিস্তীর্ণ প্যারাবন কেটে তৈরি করা হচ্ছে চিংড়িঘের, লবণ মাঠ ও অবৈধ স্থাপনা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে সোনাদিয়ায় প্রায় ৭,০০০ একর ম্যানগ্রোভ বিলীন হয়েছে। এর ফলে শুধু গাছ হারাচ্ছে না, ধ্বংস হচ্ছে মাছ-চিংড়ির প্রজনন ক্ষেত্র, হারিয়ে যাচ্ছে পাখির আবাস, বিপন্ন হচ্ছে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য।

৩. জলবায়ু সংকটের যুগে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার—এসব ইতিমধ্যেই চরম চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে প্যারাবন ধ্বংস মানে নিজের প্রতিরক্ষা বলয় নিজেই ভেঙে ফেলা।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ খরচ ৫০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে, পাশাপাশি বিপুল কার্বন সুবিধা দেয়। অথচ আমরা সেই প্রাকৃতিক সম্পদটাকেই ধ্বংস করছি, যার বিনিময়ে বাঁধ নির্মাণে ব্যয় করতে হবে হাজার হাজার কোটি টাকা।

৪. আইনের চোখে ফাঁকি, প্রয়োগে দুর্বলতা
আদালত নির্দেশ দিচ্ছেন, সরকারি সংস্থা মামলা করছে—তবু দখলদাররা ফিরে আসছে। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি সামান্য। কেন?
কারণ, আইনের অভাব নয়, প্রয়োগের ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতার অভাব প্রধান সমস্যা। আবার কিছু সরকারি সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বনভূমি বরাদ্দ দিচ্ছে ভুল বার্তা। প্রকৃতপক্ষে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দখলদারদের সুযোগ করে দিচ্ছে।

৫. রোপণের চেয়ে সংরক্ষণ জরুরি
প্রতি বছর বৃক্ষরোপণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়—এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু একটি পরিণত প্রাকৃতিক বন গড়ে উঠতে দশক লাগে, ধ্বংস করতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ফলে বিদ্যমান প্যারাবন সংরক্ষণ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং কার্যকর।

৬. সংকট উত্তরণে জরুরি ৭-পয়েন্টি কর্মপরিকল্পনা
১. জিরো টলারেন্স ও টেকনোলজি-ভিত্তিক নজরদারি
· ড্রোন ও স্যাটেলাইট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিনের মনিটরিং।
· উপকূলীয় টহল জোরদার করা (কোস্ট গার্ড, বন বিভাগ, প্রশাসনের সমন্বয়ে)।
২. আইনি প্রয়োগে গতি ও দৃষ্টান্ত
· পরিবেশ আদালত ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চালু করা।
· দখলদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৩. বনভূমি বরাদ্দের পূর্বে বাধ্যতামূলক EIA
· পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment) ও জনপরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া যাবে না।
৪. স্থানীয় কমিটি গঠন ও অংশীদারিত্ব
· প্যারাবন রক্ষায় গ্রামভিত্তিক সংরক্ষণ কমিটি গঠন।
· স্থানীয়দের ইকো-ট্যুরিজম, টেকসই কাঁকড়া ও মাছ চাষ, মধু সংগ্রহ—এসবের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করা।
৫. আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সেল
· পরিবেশ, ভূমি, বন, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন।
৬. শিক্ষা ও সচেতনতা অভিযান
· স্কুল-কলেজে উপকূলীয় পরিবেশ ও প্যারাবনের গুরুত্ব পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
· স্থানীয় গণমাধ্যম ও মসজিদের মাইকে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার।
৭. বিকল্প জীবিকার বাস্তবায়ন
· দখলদার বা সম্ভাব্য দখলদারদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু করা, যাতে তারা বন ধ্বংস না করে টেকসই পেশায় যুক্ত হতে পারে।

৭. প্রকৃতির ঋণ শোধের সময় এখনই
প্যারাবনের প্রতিটি গাছ একেকটি বাঁধ, একেকটি আশ্রয়স্থল, একেকটি জীবন্ত প্রহরী। আজ যারা লোভের বশে এগুলো ধ্বংস করছেন, তারা শুধু গাছ কাটছেন না—উপকূলের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কেটে ফেলছেন।
ইতিহাস জুড়ে প্রকৃতি মানুষকে রক্ষা করেছে। এখন মানুষের পালা প্রকৃতিকে রক্ষা করার। কারণ সত্যটি অত্যন্ত সরল কিন্তু কঠোর:
প্যারাবন বাঁচলেই বাঁচবে উপকূল, টিকবে জীববৈচিত্র্য, বেঁচে থাকবে মানুষ।

মন্তব্য করুন