প্রভাষক
১৮ জুন, ২০২৬ ০২:০২ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষার সংজ্ঞা এবং প্রকারভেদ / ধরণ উল্লেখপূর্বক শিক্ষার লক্ষ্যসমূহ বর্ণনা
শিক্ষার পরিচয়
শিক্ষা হলো জ্ঞানলাভের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া এবং ব্যাক্তির সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন | যা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার | আমরা বিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান বা কৌশলকে শিক্ষা বলে থাকি এটা ব্যাপক অর্থে নয় সংকীর্ণ অর্থে। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে মানুষের জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া শিক্ষা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না। তাই শিক্ষা এক সামাজিক প্রক্রিয়া। এটি মানুষের অভিজ্ঞতার পুর্নগঠনে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে। সেই জ্ঞানকেই শিক্ষা বলা হবে যা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়ায় অর্জিত হয় এবং মানুষের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে, সমাজ সংরক্ষণ করে এবং রাষ্ট্র,সমাজ ও ব্যাক্তির মঙ্গল করে।
ব্যাপক অর্থে কোন নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করাকে শিক্ষা বলে | ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষা বলতে এমন জ্ঞানকে বুঝায় যা জান্নাতের পথ দেখায় এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায় | শিক্ষা সম্পর্কে সুপ্রসিদ্ধ একটি প্রবাদ বাক্য হলোالعِلْمُ نُوْرٌ অর্থাত্ শিক্ষাই আলো | এই ছোট্ট প্রবাদ বাক্যটিতে শিক্ষার প্রকৃত সংজ্ঞা নিহিত | তাই যে জ্ঞান মানুষের আচরণের কাঙ্ক্ষিত, বাঞ্চিত এবং ইতিবাচক পরির্বতন ঘটায় না তাকে শিক্ষা বলা যায় না | নিচে শিক্ষা সম্পর্কে কতেক মনীষী এবং পন্ডিতদের মতামত তুলে ধরা হলো –
1. ইমাম মালেক (রহ.) বলেন : إِنَّمَا الْعِلْمُ نُوْرٌ يُضعه اللّٰهُ عَزَّ وَجَلَّ فِيْ القَلْبِ অর্থাত্ শিক্ষাই আলো , যা আল্লাহ্ তায়ালা (বান্দার) অন্তরে স্থাপন করেন |
2. আল্লামা ইকবালের মতে, শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা ও শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে "খুদি" বা আত্মসচেতনতা জাগ্রত করা।
3. সক্রেটিসের মতে, শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের আবিষ্কার | অর্থাত্ মিথ্যাকে পরিহার করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে শিক্ষা |
4. বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্লেটো বলেছেন – শিক্ষা হল এমন একটি ধারণাশক্তি, যেটি সঠিক মুহূর্তে আনন্দ ও বেদনা অনুভবে ব্যক্তিকে সাহায্য করে। শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দেহ মনের সৌন্দর্য এবং অন্তর্নিহিত পূর্ণতাকে বিকশিত করে থাকে।
5. অ্যারিস্টটলের মতানুযায়ী শিক্ষার সংজ্ঞা হল – “Education is the creation of a sound mind in a sound body.” অর্থাৎ শিক্ষা হল সুস্থ শরীরে সুস্থ মনের সৃষ্টি করা।
6. বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ্ জন ডিউই (John Dewey) বলেছেন – শিক্ষা হল অভিজ্ঞতার অবিরাম পুনর্গঠনের মাধ্যমে জীবনযাপনের প্রক্রিয়া।
শিক্ষার প্রকারভেদ/ধরণ (Types of Education)
সমাজে মানুষের নীতি নৈতিকতা ও আচরণভেদে শিক্ষা দুই প্রকার। যথা :- 1. সুশিক্ষা ও 2. কুশিক্ষা
1. সুশিক্ষা: যে শিক্ষা ব্যাক্তির মূল্যবোধ জাগ্রত করে মানবিক ও সত্ গুণাবলির যথার্থ বিকাশ ঘটায়। এবং তাকে সত্, নৈতিক ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলে।
2. কুশিক্ষা: যে শিক্ষা মানুষের বিবেক ও মনুষ্যত্বের বিকাশ না ঘটিয়ে কেবল পুঁথিগত জ্ঞান দেয়, যা সমাজে নানা বিসৃঙ্খলা ও অকল্যাণ বয়ে আনে।
শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যম, পরিবেশ এবং কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা তিন প্রকার।
যথা :- 1. আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal Education)
2. অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Informal Education)
3. উপানুষ্ঠানিক বা উন্মুক্ত শিক্ষা (Non-formal Education)
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal Education) : নির্দিষ্ট কাঠামো, সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন, পাঠ্যক্রম ও সময়সীমার অধীনে কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে (যেমন: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়) যে শিক্ষা দেওয়া হয় তাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বলে।
অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Informal Education) : কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন ও পাঠ্যক্রম ছাড়াই পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম এবং পরিবেশ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রাত্যহিক জীবনে যে শিক্ষা অর্জিত হয় তাকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বলে।
উপানুষ্ঠানিক বা উন্মুক্ত শিক্ষা (Non-formal Education) : নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে পরিকল্পিত উপায়ে নমনীয় নিয়মে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তাকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বলে। যেমন: বয়স্ক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক বা কারিগরি প্রশিক্ষণমূলক শিক্ষা এবং দূরশিক্ষণ।
শিক্ষার লক্ষ্যসমূহ (Aims of Education)
সমাজের প্রয়োজন, চাহিদা ও মতাদর্শের উপর নির্ভর করে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ণয় করা হয়। ব্যক্তি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাথে শিক্ষার লক্ষ্যসমূহেরও পরিবর্তন হয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো ব্যাক্তির মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং গুণাবলির যথার্থ বিকাশ ঘটা। শিক্ষার লক্ষ্যসমূহকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। সার্বিকভাবে শিক্ষার লক্ষ্যসমূহ নিচে দেওয়া হলো ।
ক. ব্যক্তিকেন্দ্রিক লক্ষ্যসমূহ :-
1. ব্যক্তির মধ্যে সততা, নৈতিকতা, ভদ্রতা এবং মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে আদর্শ চরিত্র গঠন করা।
2. ব্যক্তির ভেতরে থাকা অন্তর্নিহিত মেধা, সৃজনশীলতা ও সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা।
3. শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং চিন্তাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
4. বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা।
5. অন্ধবিশ্বাস দূর করে সত্য আবিষ্কার করতে ও স্বাধীনভাবে যুক্তিনির্ভর চিন্তা করতে শেখানো।
6. ব্যক্তি জীবনের পরিপূর্ণতা বিকাশ, দৈহিক ও মানসিক গুণাবলির সুপ্ত বিকাশ ঘটানো।
7. নিজেকে জানার দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
8. উচ্চতর মূলবোধ অর্জন ও চর্চা করে উচ্চতর আদর্শ জাগ্রত করা।
9. দেহের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটিয়ে সুস্থ দেহ ও সুস্থ দেহে সুস্থ্ মনের সৃষ্টি করা।
10. নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করা।
খ. সমাজ ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক লক্ষ্যসমূহ :-
1. মানুষকে সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
2. সমাজের নিয়ম-কানুন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করা এবং খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করা।
3. দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা।
4. গণতান্ত্রিক আদর্শে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা অর্জন করা।
5. সমাজের ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধকে বজায় রাখা।
6. সামাজিক বৃত্তিকে সুদৃঢ় করা এবং সামাজিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করা।
7. মানবসম্পদ তৈরি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন।
8. দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা।
9. সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটানো।
10. বিশ্বায়ন ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের ধারণার সাথে মিল রেখে অন্য সংস্কৃতি ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা।
শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মনীষীদের মতামত
শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন মতামত ব্যাক্ত করেছেন। নিচে কয়েকজনের মতামত উল্লেখ করা হলো :-
1. বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে :- আদর্শ চরিত্রের মানুষ সৃষ্টি করাই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য।
2. জন কিউই’ র মতে:- শিশুর ব্যক্তিসত্তার সুষম ও সর্বাঙ্গীণ বিকাশ সাধনই শিক্ষার লক্ষ্য।
3. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে:- প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে শরীর চর্চা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যাবলির মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার সুষম ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সাধনই শিক্ষার লক্ষ্য।
4. আল্লামা ইকবালের বলেছেন:- আত্মশক্তির জাগরণই শিক্ষার লক্ষ্য।
5. সক্রেটিসের মতে, “শিক্ষা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো নিজেকে জানা।” মানুষের আত্বজ্ঞানই হলো শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
৪
৪ মন্তব্য