সহকারী শিক্ষক
২৫ জুন, ২০২৬ ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা প্রাণ: বিশ্ব বাণিজ্যের নেপথ্য সারথী
ভোরের আলো ফোটার আগেই আমাদের হাতের কাছে যে চায়ের কাপটি এসে পৌঁছায়, কিংবা আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখতে যে জ্বালানি ও কাঁচামাল প্রতিদিন ব্যবহৃত হয়—তার সিংহভাগেরই গল্প শুরু হয় অথৈ সমুদ্রের বুক থেকে। আমরা যখন স্থলভাগের নিরাপদ আশ্রয়ে দৈনন্দিন জীবনযাপনে ব্যস্ত, তখন একদল মানুষ মাসের পর মাস পরিবার-পরিজন ছেড়ে নীল জলরাশির বুকে কাটিয়ে দেন শুধু বিশ্বকে সচল রাখার তাগিদে। তাঁরাই হলেন আমাদের নাবিক সম্প্রদায়। প্রতি বছর ২৫শে জুন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) কর্তৃক স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক নাবিক দিবস’ পালনের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই মানুষগুলোর অসামান্য কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা।
২০২৬ সালের জন্য এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—"বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখা, ঝুঁকি বুকে নেওয়া।" বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই কথাটি নাবিকদের জীবনের এক রূঢ় ও বাস্তব চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে, পৃথিবীর মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পণ্যই পরিবাহিত হয় সমুদ্রপথে। খাদ্যশস্য, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে বিশালাকার সব প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করেন এই নাবিকেরা। তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ছাড়া স্থবির হয়ে পড়বে গোটা পৃথিবীর আধুনিক অর্থনীতি।
তবে জাহাজের এই জীবন যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়, তার আড়ালের বাস্তব পরিস্থিতি ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ এবং কঠিন। বর্তমান বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের যুগে সমুদ্রপথগুলো এখন আর আগের মতো নিরাপদ নেই। বিশেষ করে লোহিত সাগর বা কৃষ্ণ সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় আকস্মিক ড্রোন ও মিসাইল হামলা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য এক বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি সোমালি উপকূল কিংবা গিনি উপসাগরের মতো এলাকাগুলোতে জলদস্যুদের আক্রমণ ও জিম্মি হওয়ার চিরচেনা ভয় তো রয়েছেই। কেবল মানবসৃষ্ট এই সংকটোই নয়, মাঝসমুদ্রের ভয়ঙ্কর টাইফুন, সাইক্লোন আর দানবীয় ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে জাহাজকে নিরাপদ গন্তব্যে নিয়ে যেতে হয় তাঁদের। এর বাইরেও রয়েছে এক দীর্ঘ মানসিক লড়াই; মাসের পর মাস দিগন্তজোড়া জলরাশির মাঝে একাকী থাকা এবং প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার তীব্র মানসিক চাপ তাঁদের প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হয়।
বিশ্বের এই বিশাল সমুদ্রযাত্রায় আমাদের বাংলাদেশের সাহসী ও দক্ষ মেরিন অফিসার এবং ক্রুদের অবদানও অত্যন্ত গৌরবময়। তাঁরা একদিকে যেমন বিশ্ব বাণিজ্যের চাকা সচল রাখছেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে এক বড় ভূমিকা রাখছেন। তাই আন্তর্জাতিক নাবিক দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যে স্বাচ্ছন্দ্য ও আধুনিকতার সুফল ভোগ করছি, তার পেছনে সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা লক্ষাধিক মানুষের নিঃস্বার্থ অবদান রয়েছে। এই বীরদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। ঝড়-তুফান, জলদস্যু আর যুদ্ধের বারুদ মাড়িয়ে যারা বিশ্বকে সচল রাখছেন, আধুনিক সভ্যতার সেই নেপথ্য নায়কদের জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম।
১৩
১৮ মন্তব্য