সহকারী শিক্ষক
২৫ জুন, ২০২৬ ০৭:১৭ অপরাহ্ণ
নীরব সাদা দাগ ও একটি মহৎ লড়াই: বিশ্ব ভিটিলিগো দিবসের অন্তরালে
ত্বকের স্বাভাবিক রঙের মাঝে হঠাৎ এক টুকরো সাদা মেঘের মতো ভেসে ওঠা দাগ—মেডিকেলের ভাষায় যাকে আমরা বলি ‘ভিটিলিগো’ আর সাধারণ মানুষের কাছে যা ‘শ্বেতী’ নামে পরিচিত। এটি কেবল একটি চর্মরোগ নয়, বরং এর চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় সমাজে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের মানসিক লড়াই। সমাজের অবহেলা, কুসংস্কার আর আড়চোখে তাকানোর চাদর ভেঙে মানুষের মাঝে সচেতনতার আলো ছড়াতেই প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস।
পপ সম্রাটের সেই বিষাদময় অধ্যায়
ভিটিলিগো বা শ্বেতী রোগ নিয়ে কথা বলতে গেলে বিশ্বসংগীতের এক অবিসংবাদিত রাজার নাম চলে আসে অবধারিতভাবেই। তিনি মাইকেল জ্যাকসন। একসময় বিশ্বজুড়ে রটেছিল, কৃষ্ণাঙ্গ মাইকেল নাকি কৃত্রিম উপায়ে নিজেকে শ্বেতাঙ্গ বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সত্যটা ছিল চরম বেদনাদায়ক। পপ সম্রাট আসলে ভুগছিলেন এই ভিটিলিগো রোগে। তাঁর শরীরের ত্বকের রং স্বাভাবিকতা হারাচ্ছিল তীব্র গতিতে। মেকআপের আড়ালে তিনি বছরের পর বছর লুকিয়ে রেখেছিলেন সেই ক্ষত। ২০০৯ সালের ২৫শে জুন এই মহান শিল্পী পৃথিবীকে বিদায় জানান। তাঁর এই নীরব লড়াইকে সম্মান জানাতে এবং বিশ্বজুড়ে শ্বেতী রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে তাঁর প্রয়াণ দিবস অর্থাৎ ২৫শে জুনকেই বেছে নেওয়া হয়েছে বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস হিসেবে।
শ্বেতী আসলে কী এবং কেন হয়?
আমাদের ত্বকে ‘মেলানোসাইট’ নামক কোষ থাকে, যা ‘মেলানিন’ তৈরি করে ত্বকের স্বাভাবিক রং ধরে রাখে। কোনো কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম যখন ভুলবশত নিজেরই এই মেলানোসাইট কোষগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে (Autoimmune Disorder), তখন ত্বকের সেই নির্দিষ্ট অংশগুলোতে মেলানিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে সাদা দাগ দেখা দেয়।
এখানে মনে রাখা জরুরি যে, এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে হাত মেলালে, মেলামেশা করলে কিংবা একই পাত্রে খাবার খেলে এই রোগ ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি কোনো অভিশাপ বা পাপের ফলও নয়, বরং পুরোপুরি একটি জিনগত ও শারীরিক চিকিৎসাগত বিষয়।
সামাজিক বৈষম্য ও মানসিক যাতনা
শ্বেতী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে বেশি যেতে হয়। রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি, স্কুল-কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে একঘরে হয়ে পড়ার ভয়, কিংবা বিয়ের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা—এসব কিছুই তাঁদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। মেলানিনের অভাব হয়তো কেবল ত্বকের রং কেড়ে নেয়, কিন্তু সমাজের অবহেলা কেড়ে নেয় তাঁদের বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস। মাইকেল জ্যাকসনের মতো একজন বৈশ্বিক তারকাকেও যেখানে সারাজীবন এই রোগ নিয়ে ট্রল ও ভুল ধারণার শিকার হতে হয়েছিল, সেখানে সাধারণ মানুষের লড়াইটা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।
সহমর্মিতাই হোক আমাদের ভাষা
বিশ্ব ভিটিলিগো দিবসের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের মন থেকে এই রোগ নিয়ে থাকা সব ভুল ধারণা ও অন্ধবিশ্বাস দূর করা। শ্বেতী আক্রান্ত মানুষদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তাঁদের কোনো সহানুভূতির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল স্বাভাবিক সম্মান ও সমান সুযোগের। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির কল্যাণে এখন শ্বেতী রোগের চমৎকার সব থেরাপি ও চিকিৎসা রয়েছে, যার মাধ্যমে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আসুন, ২৫শে জুনের এই দিনে আমরা প্রতিজ্ঞা করি—বাহ্যিক চামড়ার রং দেখে নয়, মানুষকে বিচার করব তাঁর যোগ্যতা ও মন দিয়ে। কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করে ছড়িয়ে দিই সচেতনতার আলো।
১৩
১৮ মন্তব্য