Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জুন, ২০২৬ ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ

পড়তে পড়তেই আয়: আত্মনির্ভরশীলতার নতুন দিগন্ত

একসময় শিক্ষার লক্ষ্য ছিল শুধু ডিগ্রি অর্জন কিন্তু বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় তা ভিন্ন। এখন একজন শিক্ষার্থীর জন্য শুধু ভালো ফলাফলই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে নিজেদের খরচ বহন করছে, অর্জন করছে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশে বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছে সেই সম্ভাবনা। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা বইয়ের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারবে।

ফাহাদ বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা একজন শিক্ষার্থী। কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার জন্য ভর্তি হয়েছেন। মা-বাবা ফাহাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি সেমিস্টারের টিউশন ফি, থাকা খাওয়ার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ে অগ্রিম জমা দিয়েছেন। ফাহাদ কানাডায় গিয়ে এক সপ্তাহ পর একটি সেলফোন বিক্রির দোকানে কাজ পান। কানাডার আইন অনুযায়ী একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ক্যাম্পাসের বাহিরে সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ফাহাদ এভাবে কাজ করে তার পড়ালেখার খরচ এর ব্যবস্থা করতে থাকে। তার মা-বাবাকে পড়ালেখার খরচ পাঠাতে হয় না।

রীমা নামের আরেকজন শিক্ষার্থী লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করার জন্য ভর্তি হয়েছেন। তিনিও সেখানে ক্লাস চলাকালীন সময় সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা এবং অবকাশকালীন সময় ফুলটাইম কাজ করে তার পড়ালেখার খরচসহ নিজের খরচ জোগাড় করতে পারেন।

অনুরূপভাবে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়ালেখার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে ছাত্রছাত্রীরা কাজের সুযোগ পান। এতে করে তাদের লেখাপড়ার পাশাপাশি আয় রোজগার ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

সারা বিশ্বে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি নতুন বাস্তবতা, শিক্ষার্থীরা এখন শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না, তারা চান নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি আয় করতেন। ‘পড়তে পড়তেই আয়’ ধারণাটি তাই কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি নতুন শিক্ষা-ধারণা, যেখানে শেখা এবং উপার্জন একসঙ্গে এগিয়ে চলে। এই ধারণা শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলে, তাদের বাস্তবজীবনের জন্য প্রস্তুত করে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই ধারণার বাস্তবায়ন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সহজ হয়েছে। ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে শিক্ষার্থীরা এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ পাচ্ছে। যেমন কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, অনলাইন টিউটরিং, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট। অনেক শিক্ষার্থী তাদের একাডেমিক জ্ঞানকেই কাজে লাগিয়ে আয় করছে, আবার কেউ কেউ নতুন দক্ষতা শিখে নিজের জন্য একটি আয়ের পথ তৈরি করছে। এই প্রক্রিয়ায় তারা শুধু অর্থ উপার্জনই করছে না, তারা নিজের আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই ধারণা এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ওয়ার্ক-স্টাডি’ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে, যেখানে তারা ক্যাম্পাসের ভেতরে বা বাইরে পার্ট-টাইম কাজ করার সুযোগ পায়। এতে করে শিক্ষার্থীরা নিজের খরচের একটি অংশ নিজেই বহন করতে পারে এবং একই সঙ্গে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। ইউরোপের অনেক দেশেও শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এই অভিজ্ঞতা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এবং তাদের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এগিয়ে রাখে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘পড়তে পড়তেই আয়’ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়ে। যদি তারা পড়াশোনার পাশাপাশি আয় করার সুযোগ পায়, তাহলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং তারা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারবে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে, কারণ তারা ঘরে বসেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ করতে পারে এবং নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে।

তবে এই ধারণা শুধু আয়ের বা দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ নয়, কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময় ব্যবস্থাপনা। অনেক শিক্ষার্থী কাজের চাপের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ হারাতে পারে, যা তাদের একাডেমিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এটা বাস্তবায়নে প্রয়োজন একটি সুষম পরিকল্পনা, যেখানে শিক্ষার্থী তার পড়াশোনা এবং কাজ দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করবে। এ ছাড়া উপযুক্ত গাইডলাইন এবং প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা সঠিক কাজ নির্বাচন করতে পারে না বা প্রতারণার শিকার হয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানকেন্দ্রিক হলেও, চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের এই যুগে কেবল পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা আর পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য এখন প্রয়োজন এমন এক সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন এবং আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দক্ষতা ছাড়া শিক্ষা যেমন অপূর্ণ, তেমনি আয়মুখী অভিজ্ঞতা ছাড়া সেই দক্ষতা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষার্থী রয়েছে, যা দেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা,একই সঙ্গে এটি একটি চ্যালেঞ্জও। যদি এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে সময়োপযোগী দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তারা শুধু নিজেদের স্বাবলম্বী করতেই পারবে না, জাতীয় অর্থনীতির গতিশীলতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে বেকারত্ব ও দক্ষতার ঘাটতি একটি বড় সামাজিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

‘পড়তে পড়তে আয়’ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধারণা বাস্তবায়ন করতে প্রথমেই যেটা দরকার তা হচ্ছে কর্মসংসস্থান। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীদের কাজের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে শিল্প-কারখানা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ, ইন্টার্নশিপ, পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এসব পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং আর্থিক স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করবে।

লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আয় ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচিত সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষাক্রমে দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও ‘স্টাডি অ্যান্ড আর্ন’ কর্মসূচি চালু করা, জেলা পর্যায়ে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ ও সহায়তা প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সক্ষম হবে।

এ ধারণাকে আরও কার্যকর করতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রথমত, কারিকুলামে এমন কিছু কোর্স যুক্ত করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পেশাগত দক্ষতা অর্জন করবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে “স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার” স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন বা প্রযুক্তিভিত্তিক কাজ শিখতে পারবে। তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজের সুযোগ পাবে। এই উদ্যোগগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুসংগঠিত ও টেকসই আয়ের পথ তৈরি করতে পারে।

‘পড়তে পড়তেই আয়’ একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত ধারণা, যা শিক্ষার প্রচলিত কাঠামোকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি শিক্ষার্থীদের শুধু জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, তাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে এবং আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সফল হতে হলে শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস, আর এই তিনটি গুণই একসঙ্গে গড়ে তুলতে পারে এই নতুন পথ। তাই এখন সময় এসেছে এই ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করার, যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনকারী নয়, তারা সক্ষম, দক্ষ এবং স্বনির্ভর মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

লেখক: সাহেদ আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্র বিজ্ঞান), ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা কলেজ

সংগ্রহ: মোঃ হাবিবুল্লাহ্


মন্তব্য করুন