সহকারী শিক্ষক
২৮ জুন, ২০২৬ ০১:০৬ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ আসর 'ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬' উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় সফলভাবে আয়োজিত হচ্ছে। বর্ধিত কলেবরের ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে এশিয়ার পরাশক্তি ইরান তথা 'টিম মেল্লি' (Team Melli)-কে নিয়ে তাদের দেশের ফুটবলপ্রেমী ও এশীয় সমর্থকদের মাঝে ছিল ব্যাপক উদ্দীপনা। এশিয়ান কোয়ালিফায়ার্সে দারুণ পারফর্ম করে দ্রুততম দলগুলোর একটি হিসেবে মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া ইরানের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রাটি ছিল প্রত্যাশা ও নাটকীয় প্রাপ্তির এক মিশ্র কোলাজ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরানের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ হলেও তা একদিক থেকে হতাশার। ২০২৬ সালের আসরটি ছিল ইরানের সপ্তম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। এর আগের ছয়টি আসরে (১৯৭৮, ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২) তারা কখনই গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের মূল প্রত্যাশাই ছিল—ইতিহাসের ডেডলক ভেঙে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে (রাউন্ড অব ৩২) উন্নীত হওয়া।
৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে প্রতিটি গ্রুপে ৩টি করে দল থাকার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৪ দলের গ্রুপ বিন্যাস ও সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারীদের নকআউটে যাওয়ার সুযোগ ইরানের প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। দলের অভিজ্ঞ তারকা মেহদি তারেমি, আলিরেজা জাহানবখশ এবং অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দের ওপর ভরসা করে কোচ আমির ঘালেনোইর শিষ্যরা এবার ইতিহাস গড়তে বদ্ধপরিকর ছিল।
গ্রুপ পর্বের কঠিন সমীকরণ ও মাঠের লড়াই বিশ্বকাপে ইরান জায়গা পায় অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ 'গ্রুপ জি'-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি বেলজিয়াম, আফ্রিকার শক্তিশালী দল মিশর এবং ওশেনিয়ার প্রতিনিধি নিউজিল্যান্ড। মাঠের বাইরে রাজনৈতিক চাপ এবং নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরান মাঠের লড়াইয়ে অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়।
গ্রুপের তিনটি ম্যাচেই ইরান অপরাজিত থাকে, যা তাদের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা ও লড়াকু মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। তবে দুর্ভাগ্যবশত তারা কোনো ম্যাচেই পূর্ণ ৩ পয়েন্ট অর্জন করতে পারেনি।
· বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে লড়াই: শক্তিশালী বেলজিয়ামের আক্রমণভাগকে রুখে দিয়ে ইরান গোলশূন্য ড্র আদায় করে।
· নিউজিল্যান্ডের সাথে ম্যাচ: দ্বিতীয় ম্যাচেও ১-১ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে টিম মেল্লি।
· মিশরের সাথে নাটকীয়তা: গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হয় ইরান। ম্যাচটি রূপ নেয় চরম নাটকীয়তায়। শুরুর দিকে পিছিয়ে পড়েও রামিন রেজায়িয়ানের গোলে সমতায় ফেরে ইরান। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে (৯৩ মিনিটে) শুজা খলিলজাদেহর করা গোলটি অফসাইডের কারণে ভিএআর (VAR) প্রযুক্তিতে বাতিল হলে নিশ্চিত জয় থেকে বঞ্চিত হয় তারা। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়।
প্রাপ্তির খতিয়ান: ট্র্যাজিক বিদায় ও বাস্তবতা গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরে ৩ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে শেষ করে ইরান। নতুন নিয়মে ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি 'তৃতীয় স্থান অধিকারী' দল নকআউট পর্বে যাওয়ার নিয়ম ছিল। ফলে গ্রুপ পর্ব শেষ করে ইরানকে চরম উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে হয় অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের ওপর।
অবশেষে জুনের শেষ লগ্নে এসে ইরানের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে চরম হতাশায়। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার ম্যাচের শেষ মুহূর্তের সমীকরণ এবং সেনেগালের বড় ব্যবধানের জয়ের ফলে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ইরান। মাত্র এক গোলের ব্যবধান ও নাটকীয় সমীকরণে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ইরানও সেরা আটটি তৃতীয় দলের তালিকা থেকে ছিটকে যায়।
প্রাপ্তির শূন্যতা ও ইতিবাচক দিক: কাগজে-কলমে প্রাপ্তি বলতে ইরান এবারও গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। কিন্তু ইতিবাচক প্রাপ্তি হলো—বিশ্বমঞ্চে কোনো ম্যাচ না হেরে অপরাজিত থেকে বিদায় নেওয়া। মেহদি তারেমির নেতৃত্বাধীন দলটি দেখিয়েছে যে, বিশ্বের যেকোনো বড় দলের বিরুদ্ধে তারা সমানে সমানে লড়াই করতে সক্ষম।
ব্যর্থতার নেপথ্যে ও ভবিষ্যৎ শিক্ষা ইরানের এই ট্র্যাজিক বিদায়ের নেপথ্যে প্রধান কারণ ছিল আক্রমণভাগের ফিনিশিংয়ের অভাব। মিশরের বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস এবং শেষ মুহূর্তের অফসাইড গোল বাতিল হওয়া তাদের ভাগ্যকে ট্র্যাজেডিতে রূপ দেয়। এছাড়া টুর্নামেন্টের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বিতর্ক দলের ওপর কিছুটা মানসিক চাপ তৈরি করেছিল। তবে আমির ঘালেনোইর অধীনে দানিয়াল ইরির মতো উদীয়মান তরুণ ও অভিজ্ঞদের যে মিশ্রণ তৈরি হয়েছে, তা আগামী ২০২৭ এশিয়ান কাপ ও পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
উপসংহার ফুটবলকে বলা হয় চরম গৌরব ও নিষ্ঠুরতার খেলা; ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের ভাগ্য যেন তারই প্রমাণ। ইতিহাস গড়ার প্রত্যয়ে ইরানের অপেক্ষা ২০২৩ বিশ্বকাপ পর্যন্ত।
৭
৬ মন্তব্য