Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ জুন, ২০২৬ ০১:৪০ অপরাহ্ণ

শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী শিক্ষকের জন্য TPACK মডেলের গুরুত্ব

শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী শিক্ষকের জন্য TPACK মডেলের ভূমিকা  


মনিরুল হক,

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রূপকল্প (Vision) অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা এবং শ্রেণীকক্ষে আনন্দময় পরিবেশে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই চলে না, বরং প্রযুক্তিকে বিষয়ের সাথে কীভাবে মেলাতে হবে, তা জানা জরুরি। আর এই দক্ষতার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফ্রেমওয়ার্কই হলো **TPACK** মডেল।


TPACK মডেলটি আসলে কী?


TPACK-এর পূর্ণরূপ হলো **Technological Pedagogical Content Knowledge**। এটি তিনটি মূল উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত:


1. **Content Knowledge (CK - বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান):** শিক্ষক যে বিষয়টি পড়াচ্ছেন (যেমন: গণিত, বিজ্ঞান বা ইতিহাস) তার ওপর তার গভীর দখল।

2. **Pedagogical Knowledge (PK - শিক্ষণবিজ্ঞান বা পদ্ধতিগত জ্ঞান):** শিক্ষার্থীদের কীভাবে পড়াতে হবে, ক্লাসরুম কীভাবে ম্যানেজ করতে হবে এবং মূল্যায়ন কীভাবে হবে সেই কৌশল জানা।

3. **Technological Knowledge (TK - প্রযুক্তিগত জ্ঞান):** ডিজিটাল টুলস (যেমন: প্রজেক্টর, কম্পিউটার, শিক্ষামূলক অ্যাপ, ইন্টারনেট) ব্যবহার করার দক্ষতা।


যখন একজন শিক্ষক এই তিনটি জ্ঞানকে একসাথে মিলিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করেন, তখনই তাকে বলা হয় TPACK  অর্থাৎ, কোন বিষয়টি (CK) কোন পদ্ধতিতে (PK) কোন প্রযুক্তির (TK) সাহায্যে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝানো যাবে"**—তা নির্ধারণ করার ক্ষমতাই হলো TPACK



শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে TPACK ফলো করা কেন জরুরি?


শিক্ষানীতি ২০১০-এর সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনার আলোকেই TPACK মডেলটি শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে:


১. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার (আইসিটি ইন এডুকেশন)ঃ 


শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার এবং পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর কথা বলা হয়েছে। একজন শিক্ষকের যদি শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান (TK) থাকে কিন্তু সেটি কীভাবে পড়ানোর কাজে (PK) লাগাতে হবে তা না জানেন, তবে দামি প্রজেক্টর বা ল্যাপটপ ক্লাসরুমে অকেজো পড়ে থাকবে। TPACK মডেল শিক্ষককে শেখায় প্রযুক্তির অর্থপূর্ণ ব্যবহার।


২. মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীল ও আনন্দময় শিখনঃ 


শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে চিন্তন দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। TPACK মডেল অনুসরণ করে একজন শিক্ষক কঠিন কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা ভৌগোলিক ঘটনা (যেমন: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা মানবদেহের রক্তসঞ্চালন) অ্যানিমেশন বা ভিডিওর মাধ্যমে সহজে দেখাতে পারেন। এতে পড়া আনন্দদায়ক হয় এবং শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে বিষয়টি বুঝতে পারে।


৩. জীবনমুখী ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাঃ 


শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাকে জীবনের সাথে যুক্ত করা। TPACK মডেলের মাধ্যমে শিক্ষকরা ইন্টারনেটের বিভিন্ন বাস্তব উদাহরণ, সিমুলেশন বা কেস স্টাডি সরাসরি ক্লাসরুমে নিয়ে আসতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান পায় না, বরং এর বাস্তব প্রয়োগও দেখতে পায়।


৪. অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা (Inclusive Education) নিশ্চিতকরণঃ 


শ্রেণীকক্ষে সব শিক্ষার্থী এক রকম হয় না; কেউ শুনে ভালো শেখে, কেউ দেখে ভালো শেখে। শিক্ষানীতিতে সবার জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। TPACK মডেল ব্যবহার করে একজন শিক্ষক একই সাথে অডিও, ভিডিও এবং টেক্সট ব্যবহার করতে পারেন, যা ধীরগতির বা ভিন্নভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীদের (Special Needs) শিখনে দারুণ সাহায্য করে।


শিক্ষকদের জন্য চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়ঃ 


বাংলাদেশে TPACK মডেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:


* পর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব।

* শিক্ষকদের আইসিটি বা প্রযুক্তিতে ভীতি।

* সনাতন পদ্ধতিতে পড়ানোর মানসিকতা।


**উত্তরণের উপায়:**

 শিক্ষানীতির সফল বাস্তবায়নে শিক্ষকদের নিয়মিত **Continuous Professional Development (CPD)** বা পেশাগত উন্নয়নের আওতায় এনে TPACK-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শিক্ষকদের শুধু কম্পিউটার চালানো শেখালে হবে না, বরং তাদের নিজ নিজ বিষয়ে (যেমন: বাংলার শিক্ষককে বাংলা টাইপিং ও ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি) প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।


জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর স্বপ্ন—একটি দক্ষ, নৈতিক ও ডিজিটাল প্রজন্ম গড়ে তোলা। এই স্বপ্ন পূরণের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। বর্তমান যুগের শিক্ষককে কেবল 'জ্ঞানের উৎস' হলে চলে না, তাকে হতে হবে একজন 'সহজতরকারী' (Facilitator)। আর এই রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো TPACK মডেল। তাই শিক্ষানীতির লক্ষ্য অর্জন এবং শ্রেণীকক্ষকে বিশ্বমানের করে তুলতে প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য TPACK মডেল অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি, বলা চলে বাধ্যতামূলক।



মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া

০১৭২২ ২৭৩২৭২

[email protected]

মন্তব্য করুন