সিনিয়র শিক্ষক
২৮ জুন, ২০২৬ ০৬:৫১ অপরাহ্ণ
এসএসসি পরবর্তী সময়: দক্ষতাই হোক ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
সময় মূল্যবান। সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ছাত্রজীবনের সময়কে বলা হয় সোনালি সময়। ছাত্রজীবন জ্ঞান অর্জন ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেকে গড়ার প্রস্তুতি। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শেষ হলো মাত্র। ফলাফল পেতে প্রায় দুই মাস লেগে যাবে। তাই এসএসসি-পরবর্তী অর্থাৎ রেজাল্ট পাওয়ার আগ পর্যন্ত ঘরে বসে, ঘুরেফিরে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করে সময় নষ্ট করা একদমই ঠিক হবে না। অনেকে মনে করেন, পরীক্ষা চলাকালীন সময় অনেক পরিশ্রম হয়েছে। এবার একটু বিশ্রামের পালা! এমন চিন্তা করা মানে প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে নিজেকে পিছিয়ে নেওয়ার শামিল। বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। দক্ষতার যুগ। কোনো শিক্ষার্থী যদি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে এগিয়ে না রাখে, তাহলে সে অবধারিতভাবে তুলনামূলক বিচারে পিছিয়ে যাবে। তাই দক্ষতা অর্জনের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে এখনই। একটু চেষ্টা করলেই ঘরে বসে কিংবা বাইরে বের হয়ে সময়োপযোগী দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। যে কোনো দক্ষতা জীবনের কোনো না কোনো সময় কাজে লাগবেই। এসএসসি-পরবর্তী সময়ে নিম্নলিখিত যে কোনো এক বা একাধিক দক্ষতা লাভের মাধ্যমে অন্যদের থেকে নিজেকে এগিয়ে রাখা যেতে পারে।
ইংরেজি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা: ইংরেজি ভাষা জানাটা এখন আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বিষয় বা বিভাগে পড়াশোনা হোক না কেন ইংরেজি ভাষা জানাটা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে হলে ইংরেজি ভাষা জানা দরকার। ইংরেজিতে স্পোকেন ও রাইটিং এর দুর্বলতা কাটিয়ে নেওয়া যেতে পারে এই সময়ে। মাধ্যমিকেই মূলত ইংরেজির মজবুদ ভিত্তি গড়ে ওঠে। ঘরে বসে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার অনলাইনে আউটসোর্সিংসহ দেশি-বিদেশি বায়ারদের বিভিন্ন কাজ পেতে ইংরেজি ভাষা জানাটা খুবই দরকার। অনলাইনে ইংরেজিতে স্পোকেন ও রাইটিংয়ের বিভিন্ন কোর্স করা যায়। এআই ব্যবহার করেও এখন ঘরে বসে অনায়সে ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া সম্ভব। এ ছাড়া উপজেলা ও জেলা শহরের অলি-গলিতে এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্পোকেন ও রাইটিং কোর্স অফার করে থাকে। প্রতিদিন ভোকাবুলারি জানা ও দৈনন্দিন চর্চার মাধ্যমেও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। ভবিষ্যতে যদি বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপের ইচ্ছা থাকে, তবে এখনই আইইএলটিএস পরীক্ষার প্রাথমিক প্রস্তুতি ও নিয়মনীতি এখনই জেনে রাখা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পড়ালেখা, চাকরি ও প্রযুক্তি ব্যবহারে ইংরেজি ভাষা জানা ও যোগাযোগ দক্ষতার বিকল্প নেই।
কম্পিউটার সাক্ষরতা: যে কোনো পেশা বা পড়ালেখার জন্য কম্পিউটার জ্ঞান থাকা এখন অত্যাবশ্যক। বেসিক কম্পিউটার স্কিল এখন সব পর্যায়ে পড়ালেখা ও কাজের জন্য চাওয়া হয়। মাইক্রাসফট অফিস (ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট) ছাড়া এখন কোন কাজ করা যায় না। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার টাইপিং স্পিড ও ইন্টারনেট ব্রাউজিং এখন অনেক বেশি দরকার। তাই কম্পিউটারের ওপর বেসিক কোর্স এখনই শুরু হোক। সর্বনিম্ন তিন মাসে কম্পিউটারের বেসিক কোর্স অফার করা হয়ে থাকে। আশপাশে একটু খোঁজ নিলেই ও চেষ্টা থাকলে এসব কোর্স অনায়সেই করা যায়। তবে ঘরে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার থাকলে কাজটি আরও সুবিধা হয়। বর্তমান সময়ে কম্পিউটারের মৌলিক দক্ষতা অর্জন অন্যসব দক্ষতার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ভিডিও এডিটিং: সৃজনশীল কাজ জানা মানুষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাকরির বাজারে ভিডিও এডিটিং ও গ্রাফিক্স ডিজাইন জানা দক্ষ মানুষদের চাহিদা তুঙ্গে। ছুটির এই সময়ে গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ভিডিও এডিটিংয়ের বেসিক কোর্স করা যেতে পারে। তবে এই দুটি কাজ করার আগে কম্পিটারের বেসিক দক্ষতা আবশ্যক। একটা সময় ছিল গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে কোর্স করতে হতো। এখন ঘরে বসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন টুলস ব্যবহার নিজেই বেসিক ধারণা নেওয়া যায়। ক্যানভা ব্যবহার করে সহজেই ব্যানার, লোগো পোস্টার ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য পোস্টার বানানো যায়। মোবাইল বা কম্পিউটারে ক্যাপকাট দিয়ে ভিডিও এডিট করা যায় অনায়াসেই। এআই ব্যবহার করে স্ক্রিপ্ট বা টেক্সট থেকে সরাসরি ইমেজ ও ভিডিও বানানো সম্ভব।
কোডিং ও প্রোগ্রামিংয়ের ধারণা: যাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়ার ঝোঁক রয়েছে তাদের জন্য কোডিং ও প্রোগ্রামিংয়ের জ্ঞান বাধ্যতামূলক। পৃথিবীর বহু দেশে প্রাথমিক লেবেল থেকেই কোডিং শেখানো হয়। পাইথন বা সি প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক বিষয়গুলো শেখা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রোগ্রামিংয়ের কাজে সমস্যা হলে ‘এআই’ থেকে সাহায্য নিয়ে ঘরে বসেই বেসিক অংশটুকু শিখে ফেলা সম্ভব। গুরুত্ব বিবেচনায় আমাদের দেশে প্রতি বছর কোডিং ও প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। কোডিং ও প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক ধারণা থাকলেই ভবিষ্যতের সফটওয়্যার নির্ভর পৃথিবীতে নিজেকে মেলে ধরা সম্ভব হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দক্ষতা: এখন এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং অনেক বেশি জনপ্রিয়। ChatGPT, Claude বা Google Gemini-এর মতো এআই টুল থেকে সঠিক প্রশ্ন বা কমান্ড (Prompt) লিখে সেরা ফলাফল বের করার দক্ষতা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ChatGPT-এর সাহায্য নিয়ে প্রাথমিক লেভেল থেকেই এটি শেখা শুরু করা যেতে পারে।
এআই বিভিন্ন টুলের ব্যবহার দিয়ে কীভাবে দ্রুত কাজ করা যায়- তা শেখা এখন অনেক বেশি সময়োপযোগী। এ খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। এআই পড়ালেখা সহজ করতে জটিল বিষয় সংক্ষেপে বোঝায়। গবেষণার তথ্য ও সূত্র দ্রুত খুঁজে দেয়। এটি লেখার ব্যাকরণ সংশোধন, আইডিয়া তৈরি ও কনটেন্ট সাজাতে সাহায্য করে। কাজের ক্ষেত্রে রুটিন ও জটিল হিসাব স্বয়ংক্রিয় করে কাজের গতি বাড়ায়। এভাবে এআই ব্যবহার করে মেধা, উৎপাদনশীলতা ও কাজের দক্ষতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
তৃতীয় একটি ভাষা জানা: এসএসসির পর বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা (যেমন: কোরিয়া, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানিজ, ফরাসি, ম্যান্ডারিন বা আরবি) শেখা আপনার ক্যারিয়ার এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বিশাল প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করবে। বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে দ্বৈত ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি) জানা খুবই সাধারণ বিষয়, সেখানে তৃতীয় একটি ভাষা আপনাকে ভিড়ের মাঝে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলবে। এমনকি ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারও শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের উপযোগী করতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম এবং বাজেট পরিকল্পনায় তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে। তৃতীয় ভাষা শেখার মাধ্যমে স্কলারশিপ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বৈশ্বিক ও দেশীয় চাকরি বাজারে অগ্রাধিকার, ব্রেইনের কার্যক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ, ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট জবের সুযোগ তৈরি হবে। এক্ষেত্রে মোবাইলের অ্যাপ, ইউটিউব বা অনলাইন কোর্স বা ভাষা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
সৃজনশীলতা ও লেখার দক্ষতা: এআই আপনার ব্যক্তিগত ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে এক অনন্য মেন্টর হিসেবে কাজ করে। গল্প, প্রতিবেদন, ব্লগ ও নতুন আইডিয়া তৈরিতে এটি সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়। বইয়ের সারসংক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণে এআই চমৎকার গাইড। নেতৃত্ব দান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এটি বিভিন্ন কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করে সঠিক পথ দেখায়। বাজেট তৈরি ও আর্থিক শিক্ষা অর্জনে এআই পারদর্শী। জীবনের কঠিন সমস্যা মোকাবিলা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা, ধৈর্য্য ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এআই আপনাকে বাস্তবমুখী পরামর্শ ও নিখুঁত পরিকল্পনা দিয়ে সাহায্য করতে পারে। তাই সৃজনশীলতা ও লেখার দক্ষতা কাজে বাড়াতে এআইকে কাজে লাগান।
সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে এখনই। ওপরে উল্লিখিত এক বা একাধিক দক্ষতা অর্জন এসএসসি পরবর্তী জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মানুষের চেয়ে দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের দাম অনেক বেশি!
১
১ মন্তব্য