সহকারী শিক্ষক
০১ জুলাই, ২০২৬ ০৩:২৮ অপরাহ্ণ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলা রিডিং না পারার কারণ ও উত্তরণের সহজ উপায়
একটি শিশুর শিক্ষার মজবুত ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আর যেকোনো বিষয় শেখার প্রধান চাবিকাঠি হলো মাতৃভাষা ভালোভাবে পড়তে ও বুঝতে পারা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই বাংলা রিডিং পড়তে গিয়ে আটকে যায়, যুক্তবর্ণ দেখে ভয় পায় কিংবা রিডিংয়ের গতি অত্যন্ত ধীর হয়।
শিক্ষার্থীদের এই রিডিং না পারার পেছনে কারণগুলো কী এবং কীভাবে তাদের এই সমস্যা থেকে বের করে আনা যায়, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।
১. বাংলা রিডিং না পারার প্রধান কারণসমূহ
শিশুরা কেন বাংলা রিডিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে, তা জানতে হলে প্রথমে আমাদের গোড়ার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে:
- বর্ণমালা ও ধ্বনির অসচ্ছলতা: অনেক শিশু স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদাভাবে চিনলেও, শব্দের মধ্যে তাদের ব্যবহার বা উচ্চারণ সঠিকভাবে ধরতে পারে না। বিশেষ করে কার-চিহ্ন (আ-কার, ই-কার ইত্যাদি) ও ফলা (য-ফলা, র-ফলা) যুক্ত হলে তারা গুলিয়ে ফেলে।
- যুক্তবর্ণের ভীতি: বাংলা ভাষার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে যুক্তবর্ণ। ক্ষ ($\text{ক} + \text{ষ}$), জ্ঞ ($\text{জ} + \text{ঞ}$), বা চ্ছ-এর মতো জটিল যুক্তবর্ণগুলো দেখলে শিশুরা ভয় পেয়ে যায় এবং পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
- বানান করে পড়ার অভ্যাস (Spelling Habit): অনেক শিক্ষার্থী বড় ক্লাসে উঠেও প্রতিটি শব্দ আলাদাভাবে বানান করে পড়ে। ফলে তারা পুরো বাক্যের অর্থ বুঝতে পারে না এবং পড়ার স্বাভাবিক গতি (Fluency) তৈরি হয় না।
- আকর্ষণীয় ও সহজ পাঠ্য উপকরণের অভাব: ক্লাসরুমে শুধু পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকলে পড়াটা একঘেয়ে মনে হতে পারে। শিশুদের উপযোগী রঙিন ও বড় অক্ষরের গল্পের বইয়ের অভাবও এর জন্য দায়ী।
- পারিবারিক অনুশীলনের ঘাটতি: বিদ্যালয় থেকে ফেরার পর বাড়িতে যদি রিডিং পড়ার নিয়মিত অভ্যাস বা তদারকি না থাকে, তবে শিশুরা দ্রুত পড়া ভুলে যায়।
২. রিডিং সমস্যা থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায়
এই সমস্যাটি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের যৌথ প্রচেষ্টায় নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করলে দারুণ ফল পাওয়া সম্ভব:
ক) বর্ণ ও কার-চিহ্নের খেলা (Phonics & Cards)
ফ্ল্যাশ কার্ড বা ছবির মাধ্যমে বর্ণ এবং কার-চিহ্নের ব্যবহার শেখাতে হবে। যেমন: 'ক' এর সাথে 'আ-কার' দিলে 'কা' হয়—এই বিষয়টি মুখস্থ না করিয়ে ভিজ্যুয়ালি (দেখে দেখে) শেখাতে হবে।
খ) যুক্তবর্ণ ভেঙে সহজ করে উপস্থাপন
যুক্তবর্ণের ভীতি দূর করতে ক্লাসে বা বাড়িতে বর্ণগুলো ভেঙে দেখাতে হবে। যেমন:
"কৃষ্ণ" শব্দের ষ্ণ তৈরি হয়েছে ষ এবং ণ দিয়ে।
সহজ করে ভেঙে দিলে এবং এগুলো দিয়ে ছোট ছোট শব্দ তৈরি করা শেখালে শিশুদের ভয় কেটে যাবে।
গ) 'লুক অ্যান্ড সে' (Look and Say) পদ্ধতি
শিক্ষার্থীকে শব্দ ধরে বানান করার চেয়ে পুরো শব্দটা একবারে দেখে বলার অভ্যাস করাতে হবে। যেমন: "আম" শব্দটিকে 'আ-ম-আম' না পড়ে একবারে 'আম' বলতে উৎসাহিত করুন। এতে পড়ার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ঘ) সরব পাঠ বা জোরে জোরে পড়া (Loud Reading)
শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট শিক্ষার্থীদের দিয়ে সরব পাঠ বা জোরে জোরে রিডিং পড়ানো উচিত। শিক্ষক নিজে আদর্শ পাঠ দেবেন (সঠিক উচ্চারণ ও টোনে পড়ে শোনানো) এবং শিক্ষার্থীরা তা অনুকরণ করবে। ভুল হলে বকা না দিয়ে আদর করে শুধরে দিতে হবে।
ঙ) সহায়ক পঠন সামগ্রী ও গল্প বলা
পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিশুদের ক্লাসে বা বাড়িতে ছোট ছোট কমিকস, ছড়া ও রঙিন রূপকথার বই পড়তে দিন। যেখানে ছবি বেশি এবং লেখা কম থাকে। এতে পড়ার প্রতি তাদের প্রীতি জন্মাবে।
চ) নিয়মিত মূল্যায়ন ও 'রিডিং ক্লাব'
বিদ্যালয়ে প্রতি সপ্তাহে রিডিংয়ের ওপর ছোট প্রতিযোগিতা বা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যারা ভালো করবে তাদের জন্য ছোট পুরস্কার (যেমন: পেনসিল বা লজেন্স) রাখলে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ 'রিডিং ক্লাব' বা অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় দেওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা
প্রাথমিক স্তরের শিশুদের বাংলা রিডিং শেখানো কোনো কঠিন কাজ নয়, প্রয়োজন শুধু একটু ধৈর্য এবং সঠিক পদ্ধতির। রিডিং পড়তে না পারলে শিশু পরবর্তীতে অন্যান্য বিষয় যেমন—গণিত, বিজ্ঞান বা সমাজ বুঝতেও সমস্যায় পড়বে। তাই আসুন, শিক্ষক ও অভিভাবক মিলে শিশুর প্রারম্ভিক শিক্ষার এই ভিত্তিটিকে আনন্দময় ও মজবুত করে তুলি।
১
১ মন্তব্য