Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৫৮ অপরাহ্ণ

ঘাটতি শুধু প্রাথমিকে নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান

ঘাটতি শুধু প্রাথমিকে নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান

দীর্ঘ সময় থেকে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, দুর্নীতি, চরম অবহেলা বা উদাসীনতা চলে আসছে। ফলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক শিখন ঘাটতি বিদ্যমান। শিখন ঘাটতি বা রিডিং পড়তে না পারা দুর্বল শিক্ষার্থী শুধু সরকারি প্রাথমিকে নয়, অনার্স পড়ুয়াদের মধ্যেও বিদ্যমান। ধরে নিলাম প্রাথমিকে দুর্বলতা ছিল। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কমপক্ষে ১০টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসএসসিতে হতাশাব্যঞ্জক পাসের হার কেন? এসএসসি পাবলিক পরীক্ষায় পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে কেন ব্যাপক ফেল? এসএসসি, উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় কেনপাস নম্বর খুব নগণ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্যে ঘটে? যত দোষ সবই নন্দ ঘোষের মতো প্রাথমিক শিক্ষকদের নয়। তবে প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপর শিখন ঘাটতি দূরীকরণে প্রেসার সব সরকারই দিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিখন ঘাটতির দোহাই দিয়ে রমজান মাসেও ক্লাস চালু ছিল। বর্তমানে ১০টি শনিবার প্রাথমিক শিক্ষকদের শিখন ঘাটতি পূরণের জন্য ক্লাস করতে হয়েছিল।

প্রাথমিক শিক্ষা দেখভালের তৃণমূলের হরেক রকম কমিটি, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমনকি চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে চৌকিদারও দেখভাল করে চেয়ারম্যানকে অবহিত করে থাকেন। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, ইউএনওসহ উপজেলার সব কর্মকর্তাও প্রাথমিক দেখভাল করে থাকেন। বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত শিশু শিক্ষায় ট্রেনিংপ্রাপ্তরা শিক্ষকতা করে আসছেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, বর্তমান সরকার পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, স্কুল ড্রেস ব্যবস্থা করছেন। অন্যদিকে প্রাথমিকের সর্বস্তরের কর্মকর্তারা সরাসরি দেখভাল করছেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুসজ্জিত অবকাঠামো বিদ্যমান। এত সমৃদ্ধ প্রাথমিক শিক্ষায় শিখন ঘাটতি কেন? এ পরিপ্রেক্ষিতে শিখন ঘাটতি দূর করার প্রয়াসে কিছু পরামর্শ উপস্থাপন করছি—

প্রাথমিকের শিশুবান্ধব সময়সূচি: আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য উন্নত বিশ্বের বিদ্যালয়ের সময়সূচি কাম্য নয়। আমাদের অধিকাংশ পরিবারের সন্তানদের পরিবারের নানা কাজে সহযোগিতা করতে হয়ে থাকে। যেমন ছোট শিশুদের দেখভাল, বাবা-মায়ের কাজে ঘরে কিংবা বাইরে, ক্ষেত-খামারে, ছোট দোকানসহ নানা বিধ কর্মে। সরকারি ২০০-১০০ টাকা উপবৃত্তি, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, পোশাক, অবৈতনিক শিক্ষাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পারিবারিক কাজে সহযোগিতার চেয়ে নিতান্তই গৌণ। প্রাথমিকে নানা সুযোগ-সুবিধা উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময়ের কারণে পারিবারিক সহযোগিতা লাভের জন্য অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাসিক বেতনসহ টাকা খরচ করে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করে থাকেন। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বেলা ২টার মধ্যে সমাপ্ত হয়ে থাকে। শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ের এ সময়সূচি অত্যন্ত উপযোগী। তারা দুপুরে গোসল সেরে গরম খাবার খেতে পারে, বিশ্রাম বা ঘুমাতে পারে। বিকেলে ফুরফুরে মেজাজে খেলাধুলা, বিনোদন বা পারিবারিক কাজে সহযোগিতা করতে পারে। আমাদের কর্মকর্তারা গরিব মানুষের সন্তানদের জন্য উন্নত বিশ্বের কন্টাক্ট আওয়ার খোঁজেন। ফলে প্রাথমিকের শিশুরা পারিবারিক কাজে সহযোগিতার জন্য অধিক সময় স্কুল কামাই করে। এতে শিখন ঘাটতির ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। সময়সূচি শিশুবান্ধব হলে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি কম হবে, এতে শিখন ঘাটতি কমে আসবে।

শিক্ষক সংকটে নিমজ্জিত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা: শিক্ষক সংকটের মাঝে চলে আসছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা। এ সংকটে ব্যাপকভাবে শিখন ঘাটতি হয়ে থাকে। এ শিক্ষক সংকট জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অনভিজ্ঞ নীতিনির্ধারণী জনবল দ্বারা পরিচালিত: প্রাথমিক শিক্ষকরা শিশু শিক্ষায় অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের পদোন্নতি নেই বললেই চলে। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হলে অভিজ্ঞ জনবলে সমৃদ্ধ হবে প্রাথমিক শিক্ষা। এজন্য প্রয়োজন আলাদা প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস।

সর্বস্তরে প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহি: প্রাথমিক শিক্ষকসহ সমস্যা নিরসন করে সর্বস্তরে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ জবাবদিহি মন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালকসহ প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সবার থাকতে হবে। তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত শিখন ঘাটতি দূর হবে।

সব শিশুর জন্য অভিন্ন পাঠ্যপুস্তক, শিশুবান্ধব সময়সূচি, বার্ষিক ছুটির তালিকা, মূল্যায়ন, পরীক্ষা ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী প্রজন্মের নাগরিক বৈষম্যহীনভাবে গড়ে উঠবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অসংখ্য নিবেদিত শিক্ষক আছেন। সব স্কুলে শিখন ঘাটতি নেই। গুটিকয়েক স্কুলে নানা সমস্যায় জর্জরিত ও কোথাও কোথাও ফাঁকিবাজ শিক্ষক, কর্মকর্তা রয়েছেন। সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হলে শিখন ঘাটতি দূর হয়ে শিশু শিক্ষা সমৃদ্ধ হতে বাধ্য।

মন্তব্য করুন

ব্লগ